সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

যে অনুপস্থিতি শুধু সংখ্যা নয়, সংকট

নজরুল কবির দীপু | প্রকাশিতঃ ১২ জুলাই ২০২৬ | ৮:৫০ অপরাহ্ন

নজরুল কবির দীপু
কল্পনা করুন একটি পরীক্ষার হল। বেঞ্চে বেঞ্চে সাজানো খাতা, হাজিরা খাতায় ডাক পড়ছে রোল নম্বর ধরে। কোনো একটি রোল নম্বরের জবাবে কেউ হাত তোলে না। আসনটি ফাঁকাই থেকে যায়, উত্তরপত্রটি ফেরত যায় একেবারে সাদা অবস্থায়। এবার এই ফাঁকা বেঞ্চের গল্পটা আর একজনের নয়। সারা দেশে প্রতি তিনজন নিবন্ধিত পরীক্ষার্থীর মধ্যে একজনের বেঞ্চ এবার ফাঁকা পড়ে আছে।

এই বছর উচ্চমাধ্যমিক ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নেননি ৩৬ শতাংশ নিবন্ধিত শিক্ষার্থী। সংখ্যাটা কাগজে-কলমে সাদামাটা দেখাতে পারে, কিন্তু পেছনের বাস্তবতা ভয়ংকর। দুই বছর আগে এসএসসি পাস করে একাদশ শ্রেণিতে নাম লিখিয়েছিলেন প্রায় ১৫ লাখ শিক্ষার্থী। তাঁদের মধ্যে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ এবার এইচএসসি পরীক্ষার ফরমই পূরণ করেননি। যাঁরা ফরম পূরণ করেছিলেন, তাঁদের মধ্যেও পরীক্ষার প্রথম দিনেই অনুপস্থিত ছিলেন ২৪ হাজার ৭৮৪ জন। এক বছরের ব্যবধানেই অনুপস্থিতির হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে- সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে ৩৩ শতাংশ, মাদ্রাসায় ৪৪ শতাংশ, আর কারিগরি শিক্ষায় অর্ধেকেরও বেশি, ৫৪ শতাংশ।

সংখ্যাটা বড় বলেই হয়তো এর ভার আমরা ঠিকঠাক অনুভব করতে পারি না। সাড়ে পাঁচ লাখ মানে দেশের একটি মাঝারি আকারের উপজেলার সমান জনসংখ্যা। এই তরুণ-তরুণীরা একযোগে শিক্ষাব্যবস্থার মূলধারা থেকে ছিটকে পড়েছে এক শিক্ষাবর্ষেই।

চট্টগ্রাম বোর্ডের হিসাবেও চিত্রটা উদ্বেগজনক। ৬ জুলাইয়ের ইংরেজি প্রথম পত্র পরীক্ষায় ৯১ হাজার ৪৮০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে অনুপস্থিত ছিলেন ২ হাজার ১১২ জন। চট্টগ্রাম জেলাতেই ১ হাজার ৩৩৪ জন, কক্সবাজারে ৩৪৫, রাঙামাটিতে ১৩৩, খাগড়াছড়িতে ১৮৩ ও বান্দরবানে ১১৭ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষার হলে যাননি। দুজন পরীক্ষার্থীকে বহিষ্কারও করা হয়েছে চট্টগ্রামে, দুজনকে কক্সবাজারে। পাহাড় আর সমতল মিলিয়ে এই সংখ্যাগুলো একটিমাত্র প্রশ্নের দিকে ইশারা করে- আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কি আসলে সবাইকে ধরে রাখতে পারছে?

এই ফাঁকা বেঞ্চগুলোর পেছনে যে মুখগুলো, তাদের প্রায় কাউকেই আমরা চিনি না। কোনো কিশোরী হয়তো পরীক্ষার আগের রাতেই কনে সেজেছে, পরিবারের সিদ্ধান্তে। কোনো কিশোর হয়তো বইখাতা রেখে দোকানে বসেছে, কারণ বাবার আয় বন্ধ হয়ে গেছে মাসছয়েক আগে। এদের কারও গল্প খবরের শিরোনাম হয় না, কারণ একজনের অনুপস্থিতি সংখ্যা তৈরি করে না। কিন্তু সাড়ে পাঁচ লাখ এমন গল্প একসঙ্গে জড়ো হলে সেটাই এবারের এইচএসসি পরীক্ষা।

এক দশক আগেও এসএসসি-এইচএসসি পরবর্তী ঝরে পড়ার হার ছিল ১০ থেকে ১৫ শতাংশের মধ্যে। এখন সেই সংখ্যা তিন-চার গুণ বেড়ে গেছে। ঢাকা বোর্ডের একটি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অনুপস্থিত ১ হাজার ৩৫০ শিক্ষার্থীর মধ্যে ৪১ শতাংশেরই ততদিনে বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। বাকিদের বড় অংশ পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে পারেননি অথবা দারিদ্র্যের কাছে হার মেনেছেন। কিন্তু এই সংখ্যাগুলো একটিমাত্র জেলা বোর্ডের সীমিত নমুনা মাত্র। সারা দেশের প্রকৃত চিত্র পেতে হলে চাই ব্যাপক, স্বাধীন গবেষণা, যা এখনো হয়নি।

কারণগুলো একটার সঙ্গে আরেকটা জড়িয়ে আছে, সুতোর মতো পেঁচিয়ে। জুলাই আন্দোলন ও পরবর্তী অন্তর্বর্তী সময়ে শিক্ষাঙ্গনে দীর্ঘ অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল। ক্লাস বন্ধ ছিল, পরীক্ষাও পিছিয়েছে বারবার। ২০২৫ সালে আন্দোলনের চাপে দেওয়া অটোপাস স্বল্পমেয়াদে সংকট সামলালেও দীর্ঘমেয়াদে শিখন-ঘাটতি রেখে গেছে বলে মনে করেন শিক্ষাবিদেরা। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরীর ভাষায়, সংকটটা আসলে করোনা-পরবর্তী সময় থেকেই চলছে—প্রায় পাঁচ বছর ধরে শিক্ষাব্যবস্থা একের পর এক ধাক্কা সামলাতে গিয়ে হাঁপিয়ে উঠেছে, বারবার বদলেছে শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যবই, আর সেই অস্থিরতার মূল্য শোধ করছে শিক্ষার্থীরাই।

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে অর্থনীতির চাপ। কলকারখানা বন্ধ হয়েছে, চাকরি হারিয়েছেন অনেকে। যে পরিবারে আয়ের সংকট, সেখানে সন্তানের পড়াশোনায় প্রথম কোপ পড়ে। শহর থেকে গ্রামে ফিরে যাওয়া পরিবারগুলোর সন্তানেরা প্রায়ই আর ফেরেন না শ্রেণিকক্ষে, ঠিকানা বদলের সঙ্গে বদলে যায় তাদের ভবিষ্যতের গল্পও। বাল্যবিয়ের প্রবণতা করোনাকাল থেকে শুরু হয়ে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক টানাপোড়েনে আরও আড়ালে চলে গেছে, অথচ থামেনি। আর কারিগরি শিক্ষা, যাকে একসময় ভাবা হয়েছিল প্রথাগত শিক্ষার বিকল্প, কর্মমুখী ও সহজ কর্মসংস্থানের পথ, সেখানেই এবার অনুপস্থিতির হার সবচেয়ে বেশি। এই প্যাটার্ন যা বলে দেয়, তা হলো: পড়াশোনার শেষে যে বিনিয়োগের প্রতিদান মেলে না, সেই বিশ্বাস তরুণদের মধ্যে দিন দিন জোরালো হচ্ছে।

এই না-বলা অনাস্থাটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক। যে শিক্ষার্থী ক্লাসরুম ছেড়ে দেয়, সে শূন্যে হারিয়ে যায় না। কেউ শ্রমবাজারে ঢোকে অপ্রস্তুত অবস্থায়, কম মজুরিতে, কেউ কিশোর গ্যাংয়ে যোগ দেয় আয়ের সহজ পথ খুঁজতে, কেউবা মাদকের কাছাকাছি চলে যায়। এই সাড়ে পাঁচ লাখ, কিংবা তারও বেশি তরুণ-তরুণী যদি অর্থনীতি ও সমাজের মূলধারা থেকে ছিটকে পড়ে, তার মূল্য শুধু তাদের একার নয়। জনসংখ্যার এই বিশাল তরুণ অংশটাকে দক্ষ কর্মশক্তিতে রূপান্তরের যে স্বপ্ন- জনমিতিক লভ্যাংশের যে হিসাব- এই ঝরে পড়া প্রতিবছর সেই হিসাবকেও দুর্বল করে দিচ্ছে।

সরকার বা নীতিনির্ধারকেরা প্রায়ই বড় সংখ্যাকে ছোট শব্দে ঢেকে দেন- ‘সাময়িক সমস্যা’, ‘বৈশ্বিক প্রবণতা’, কিংবা ‘আগামী বছর ঠিক হয়ে যাবে’। কিন্তু পরপর দুই বছর ধরে বাড়তে থাকা এই হার কোনো সাময়িক ঘটনা নয়; এটি একটি ব্যবস্থাগত ব্যর্থতার লক্ষণ। জনস্বার্থের প্রশ্নে যখন রাষ্ট্রীয় উদাসীনতা দেখা যায়, তখন সেটিকে আড়াল করার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো পরিসংখ্যানকে নিছক তথ্য বানিয়ে রাখা, তার পেছনের মানুষগুলোকে ভুলিয়ে দেওয়া।

এই সংখ্যাকে নিছক পরিসংখ্যান হিসেবে দেখলে ভুল হবে। প্রয়োজন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের গণ্ডির বাইরে গিয়ে শিক্ষাবিদ, অর্থনীতিবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীদের নিয়ে একটি স্বাধীন অনুসন্ধান কমিটি, যারা জেলাভিত্তিক ও প্রতিষ্ঠানভিত্তিক প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করবে, অনুমাননির্ভর বিশ্লেষণের বদলে তথ্যনির্ভর নীতি তৈরির পথ দেখাবে। প্রতিটি ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর পেছনে লুকিয়ে আছে একটি নির্দিষ্ট গল্প- কারও বিয়ে, কারও দারিদ্র্য, কারও হারিয়ে যাওয়া আত্মবিশ্বাস। এই গল্পগুলো আলাদা করে না জানলে কোনো নীতিই কার্যকর হবে না।

প্রশ্নটা তাই থেকেই যায়- আমরা কি অপেক্ষা করব পরের বছরের সংখ্যাটা আরও বড় হওয়া পর্যন্ত, নাকি এখনই খুঁজে বের করব, কোন ফাঁকা বেঞ্চের পেছনে লুকিয়ে আছে কোন শিক্ষার্থীর নীরব বিদায়ের গল্প।

লেখক: ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, একুশে পত্রিকা।