সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

খাদ্য-পানি-ওষুধ সংকটে বিপর্যস্ত সাতকানিয়াবাসী

মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন | প্রকাশিতঃ ১২ জুলাই ২০২৬ | ১১:৪২ অপরাহ্ন

কেঁওচিয়া ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের এক বৃদ্ধা পাঁচ দিন ধরে পানিবন্দি। বাড়িতে কোমরসমান পানি। চুলা জ্বালানোর উপায় নেই, শুকনো খাবারও শেষ হয়ে আসছে। অসুস্থ শরীরে একা ঘরে বসে অপেক্ষা করছিলেন কেউ আসবে বলে। শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় সেনাবাহিনী ও উপজেলা প্রশাসনের উদ্ধারকারী দল তাঁকে মুমূর্ষু অবস্থায় খুঁজে পায়। নৌকায় করে বের করে হাসপাতালে পাঠানো হয়। এই একটি ঘটনাই বলে দেয় সাতকানিয়ার পানিবন্দি মানুষেরা এই পাঁচ দিনে কতটা একা ছিলেন।

লাখো মানুষ পানিবন্দি, গ্রামের পর গ্রাম বিচ্ছিন্ন

ভারী বর্ষণ ও সাঙ্গু নদীর পানি বৃদ্ধিতে সাতকানিয়া উপজেলার ছদাহা, কেঁওচিয়া, বাজালিয়া, ধর্মপুর, কাঞ্চনা, ঢেমশা, সদর, খাগরিয়া, চরতী, সোনাকানিয়া, কালিয়াইশ, আমিলাইষ, নলুয়া ও পশ্চিম ঢেমশাসহ একাধিক ইউনিয়নের লাখো মানুষ পাঁচ দিন ধরে পানিবন্দি। অনেকের ঘরে এখনো কোমর থেকে বুকসমান পানি। স্কুল, মাদ্রাসা, আশ্রয়কেন্দ্র আর প্রতিবেশীর উঁচু ভবনে ঠাঁই নিয়েছেন হাজারো পরিবার।

পানি কিছুটা কমলেও বেশিরভাগ গ্রামীণ সড়ক এখনো তলিয়ে। নৌকাই একমাত্র ভরসা। চার দিন ধরে বান্দরবানের সঙ্গে সারা দেশের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। কেঁওচিয়ার সত্যপীর মাজার এলাকায় সড়ক তিন ফুট পানির নিচে। দুই পাশ থেকে মানুষ ভ্যানে পার হচ্ছেন, ভোগান্তির শেষ নেই।

চুলা জ্বলছে না, ওষুধ নেই, টিউবওয়েল ডুবে গেছে

সাতকানিয়ায় এখন সংকটের উপর সংকট। কোথাও চুলা জ্বালানোর জায়গা নেই, শুকনো খাবারই একমাত্র ভরসা। টিউবওয়েল ডুবে যাওয়ায় বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট। দূর-দূরান্ত থেকে খাবার পানি আনতে হচ্ছে। শিশুদের দুধ নেই, বয়স্কদের ওষুধ নেই, নারীদের প্রয়োজনীয় সামগ্রীও নেই।

বন্যায় ভেসে গেছে বছরের সঞ্চিত ধান-চাল, আসবাবপত্র, গবাদিপশুর খাদ্য। আমন চাষ ও সবজি ক্ষেতের ব্যাপক ক্ষতি। পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। মাটির ঘর ভেঙে পড়েছে একের পর এক। জীবিকা হারিয়ে দিশেহারা হাজারো পরিবার।

স্বাস্থ্য বিভাগ জানাচ্ছে, পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বেড়েছে। স্বাস্থ্যকর্মীরা আশ্রয়কেন্দ্রে প্রাথমিক চিকিৎসা দিচ্ছেন, বিশুদ্ধ পানি ফুটিয়ে পান করার পরামর্শ দিচ্ছেন।

ত্রাণ পৌঁছাচ্ছে, তবু চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খোন্দকার মাহমুদুল হাসান জানান, শুকনো খাবার, চাল ও নগদ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। উপজেলা প্রশাসন, সেনাবাহিনী ও স্বেচ্ছাসেবীরা নৌকায় করে প্রত্যন্ত এলাকায় ত্রাণ পৌঁছে দিচ্ছেন। চট্টগ্রাম-১৫ আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী সার্বক্ষণিক এলাকায় থেকে দুর্গত ইউনিয়নগুলো পরিদর্শন করছেন। চট্টগ্রাম-১৪ আসনের সংসদ সদস্য জসিম উদ্দিন আহমদ কেঁওচিয়া, ধর্মপুর ও বাজালিয়ায় ত্রাণ বিতরণ করেছেন।

কিন্তু কালিয়াইশের ইউপি সদস্য নবী হোসেন বলছেন ভিন্ন কথা। তিনি জানান, বরাদ্দ আসা চাল ইতোমধ্যে বিতরণ হয়ে গেছে। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যা এত বেশি যে বর্তমান বরাদ্দ চাহিদার তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল। সাবেক সদস্য শামসুল ইসলাম বাবুলও বলছেন, অনেক পরিবার নিরাপদ স্থানে গেলেও পর্যাপ্ত ত্রাণ পায়নি।

পানি নামতে শুরু করেছে। কিন্তু বন্যার ক্ষতচিহ্ন এখন স্পষ্ট হচ্ছে। ভাঙা সড়ক, ধসে পড়া ঘর, নষ্ট ফসল আর শূন্য গোলা নিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে আছে হাজারো পরিবার। দুর্গতরা বলছেন, জরুরি ত্রাণের পাশাপাশি পুনর্বাসন, কৃষিতে প্রণোদনা, সড়ক সংস্কার ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।