
রিচিতা খন্দকার রিফাত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে গিয়েছিলেন। সেই স্বপ্ন পূরণও হয়েছে- এখন তিনি গুগলে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গাজী মোহাইমিন ইকবাল কাজ করছেন মেটায়। একইভাবে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের আল আমিন হোসেন অ্যামাজনে, ব্র্যাকের আনামিকা আহমেদ মাইক্রোসফটে।
বিশ্বের সেরা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো আলোকিত হচ্ছে বাংলাদেশের মেধায়। কিন্তু সেই আলো দেশে ফিরছে না। চট্টগ্রামের মতো শহর থেকে যে মেধাবী ছেলেমেয়েটি একদিন বিদেশে পাড়ি দিয়েছিল, সে আর ফেরেনি- এই গল্প এখন হাজারো পরিবারের।
বছরে ৮ হাজার কোটি টাকা খরচ, কিন্তু ফিরছে কজন?
ইউনেস্কোর তথ্য বলছে, ২০১৩ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বিদেশে উচ্চশিক্ষায় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৫২ হাজার ছাড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে শুধু বিদেশে শিক্ষা খাতে বাংলাদেশিদের ব্যয় হয়েছে প্রায় ৮ হাজার ৭৯ কোটি টাকা- যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ।
কিন্তু এই বিশাল বিনিয়োগের ফল দেশে আসছে কতটুকু? সরকারি কোনো কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান নেই। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যারা নিজ উদ্যোগে বা স্কলারশিপে বিদেশে যান, তাদের ৬০ শতাংশের বেশি আর ফেরেন না। সরকারি শিক্ষক ও কর্মকর্তারা শিক্ষা ছুটিতে গেলেও ফেরার বাধ্যবাধকতা থাকে, তবু তাদের মধ্যে প্রায় ২০ শতাংশ থেকে যান বিদেশে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩২ জন শিক্ষক পিএইচডির জন্য বিদেশে গিয়েছিলেন, ফেরেননি ২৮ জন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ থেকে মেধাবী শিক্ষার্থীরা প্রতি বছর বের হচ্ছেন। তাদের একটি বড় অংশ স্কলারশিপ নিয়ে যাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য বা অস্ট্রেলিয়ায়। ফেরার সংখ্যাটা গোনার মতো নয়।
বেতন নয়, ফিরতে না চাওয়ার কারণ আরও গভীর
যুক্তরাজ্যে কর্মরত সাইদুর রহমান ২০২২ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য গিয়েছিলেন। পড়াশোনা শেষে সেখানেই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি নিয়েছেন। তিনি বলেন, “পেশাগত উন্নয়ন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, সামাজিক নিরাপত্তা— সব দিক থেকে আপাতত যুক্তরাজ্যই বেশি সম্ভাবনাময়।”
যুক্তরাষ্ট্রে ডেটা সায়েন্সে উচ্চশিক্ষা নেওয়া মো. ইউসুফও একই কথা বলেন। “বাংলাদেশে যোগ্যতা অনুযায়ী কাজের পরিবেশ নেই, বেতনও মানসম্মত নয়। তবে পেশাগত নিরাপত্তা ও কাজের পরিবেশ তৈরি হলে দেশে ফেরার বিষয়টি বিবেচনা করব।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু বেতনের জন্য নয়, গবেষণার সুযোগ না থাকা, মেধার মূল্যায়ন না হওয়া, স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবে নিয়োগ-পদোন্নতি— এই কারণগুলোই মেধাবীদের দূরে ঠেলছে। অর্থনীতির ভাষায় এটি ‘হিউম্যান ক্যাপিটাল লস’— রাষ্ট্রের বিনিয়োগে তৈরি মানবসম্পদের সুফল ভোগ করছে অন্য দেশ।
ভারত-চীন পেরেছে, বাংলাদেশ পারবে কি?
এই সংকট নতুন নয়। ভারত, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া- সবাই একসময় একই সমস্যায় ছিল। ভারত গবেষণা পার্ক, বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ক্যাম্পাস ও স্টার্টআপ ইন্ডিয়া কর্মসূচির মাধ্যমে মেধাবীদের ফেরাতে সফল হয়েছে। চীন বিশেষ ট্যালেন্ট প্রোগ্রাম ও প্রতিযোগিতামূলক বেতনের মাধ্যমে গবেষকদের ফিরিয়ে এনেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু দেশপ্রেমের আহ্বানে কাজ হয় না- দরকার উন্নত গবেষণার পরিবেশ ও দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদ বলেন, “দেশে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণার পরিবেশ তৈরি হলে বিদেশমুখী হওয়ার প্রবণতা কমানো সম্ভব। নিয়োগে স্বচ্ছতা, গবেষণার স্বাধীনতা এবং স্টার্টআপ উদ্যোক্তাদের জন্য সহায়তা জরুরি।”
সরকার এখন ‘ব্রেন ড্রেন’ নয়, ‘ব্রেন সার্কুলেশন’-এর কথা বলছে। শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছেন, দেশে ফেরার পরিবেশ তৈরি করা হবে। প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন জানিয়েছেন, যৌথ গবেষণা ও শর্ট কোর্সের মাধ্যমে প্রবাসী গবেষকদের দেশের সঙ্গে যুক্ত করা হবে।
প্রতিশ্রুতি আছে। কিন্তু চট্টগ্রামের যে মেধাবী তরুণটি আজ অ্যামাজন বা গুগলে কাজ করছেন, তিনি ফিরবেন কিনা- সেটা নির্ভর করছে কথার চেয়ে কাজে।