
আনোয়ার হোসেন স্কুলশিক্ষক। কাথরিয়া-বাগমারা উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ান। সমাজে মানুষ তাঁকে সম্মান করে। কিন্তু বন্যা কাউকে সম্মান দেয় না। মধ্যম মানিকপাঠান গ্রামের তাঁর টিনশেড বাড়িটি গলাসমান পানিতে তলিয়ে গেল। পরিবারের ১২ জনকে নিয়ে দুই কিলোমিটার হেঁটে দুই বোনের বাড়িতে আশ্রয় নিলেন। বোনদের বাড়ি পাকা বলেই রক্ষা। সেখানে গাদাগাদি করে কাটল কয়েকটি রাত। একজন শিক্ষকের এই পরিণতিই বলে দেয়, বাঁশখালীর বন্যা কতটা নির্মম ছিল।
পানি নামছে, কিন্তু ফেরার পথ নেই
চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার কাথরিয়া ইউনিয়নের মধ্যম মানিকপাঠান গ্রামে বন্যার পানি ধীরে ধীরে নামছে। কিন্তু পানি সরে গিয়ে যা দেখাচ্ছে, তা আরও কষ্টের। ধসে পড়া মাটির দেয়াল, নরম হয়ে যাওয়া ঘরের গোড়া, ডুবে যাওয়া বীজাগার— এই ক্ষতচিহ্নগুলো বলছে, পানি গেলেই জীবন স্বাভাবিক হয় না।
মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে ৫ জুলাই শুরু হওয়া ভারী বর্ষণে দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ জনপদ বন্যাকবলিত হয়। ৬ জুলাই থেকে বাহারছড়া, শেখেরখীল, পুঁইছড়ি, খানখানাবাদ, গণ্ডামারা, কাথরিয়া, বৈলছড়ি ও ছনুয়া ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। কোথাও কোথাও ৮০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়। মানিকপাঠান সেই ভয়াবহতার একটি প্রতিচ্ছবি মাত্র।
ধসের আতঙ্কে ঘরে ঢুকতে পারছেন না উলা মিয়া
একই গ্রামের উলা মিয়া (৪৮) বন্যার সময় ছেলেমেয়েদের নিয়ে তিন কিলোমিটার দূরে বৈলছড়ি ইউনিয়নে শ্বশুরের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। পানি নামার খবরে নিজের বাড়ি দেখতে এসেছেন। দেখে মন ভারী হয়ে গেছে।
উলা মিয়া ও তাঁর ভাই আহমদ নবীসহ ছয় ভাইয়ের পরিবার থাকেন একটি লম্বা একচালা বাড়িতে। বন্যার পানিতে মাটির দেয়ালের গোড়া এতটাই নরম হয়ে গেছে যে যেকোনো মুহূর্তে ধসে পড়তে পারে। ভেতরে ঢোকার সাহস হচ্ছে না কারও। বিদ্যুৎ অফিসের কর্মীরা এসে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে গেছেন দুর্ঘটনা এড়াতে। উলা মিয়া ও আহমদ নবী বললেন, “আতঙ্কে ঘরের ভেতরে ঢুকতে পারছি না।”

পাঁচ দিন ভাইয়ের বাড়িতে, নিজের ঘরে ফেরার পথ বন্ধ
পারভিন আক্তার (৪২)-এর অবস্থা আরও করুণ। টিন ও মাটির তৈরি তাঁর ছোট্ট ঘরে বন্যার পানি ঢুকে দেয়াল ধসিয়ে দিয়েছে। পাঁচ সদস্যের পরিবার নিয়ে পাঁচ দিন বড় ভাইয়ের পাকা বাড়িতে আশ্রয় ছিলেন। পানি কমলেও নিজের ভিটায় ফেরার পরিস্থিতি নেই। যে ঘরে ফিরবেন, সেই ঘর আর নেই।
তিনজনের গল্প আসলে একটাই গল্প— মানিকপাঠানের মানুষ এখন পানির ভয়ে নয়, ধসের ভয়ে ঘরে ঢুকতে পারছেন না।
বীজাগার ডুবল, কৃষকের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত
বসতবাড়ির পাশাপাশি কৃষিতেও বড় ধাক্কা লেগেছে। মানিকপাঠান গ্রামে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) সীড ভিলেজ বা বীজাগারটি পুরোপুরি ডুবে গেছে। প্রকল্পের সাইনবোর্ড পর্যন্ত পানির নিচে চলে গিয়েছিল। বীজাগার ডুবে যাওয়ায় স্থানীয় কৃষকদের আগামী মৌসুম নিয়ে চরম শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বন্যার পানি নামছে। কিন্তু মানিকপাঠানের মানুষ জানেন না, পানি গেলেই কি সব ঠিক হয়ে যায়? ধসে পড়া ঘর আবার দাঁড়াতে সময় লাগে। বীজাগারের ক্ষতি পোষাতে লাগে আরেকটি মৌসুম। আর একজন শিক্ষকের সম্মানবোধের ক্ষত — সেটার হিসাব কেউ করে না।