সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

সাতকানিয়ায় বন্যার পানি নামতেই দৃশ্যমান শত কোটি টাকার ক্ষতি

মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন | প্রকাশিতঃ ১৫ জুলাই ২০২৬ | ১:৫৩ অপরাহ্ন


টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যার প্রায় ছয় দিন পর চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে পানি নামতে শুরু করেছে।

বন্যার পানি সরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কৃষি, মৎস্য ও অবকাঠামো খাতে শত কোটি টাকার বেশি ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র দৃশ্যমান হচ্ছে।

উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও পৌর এলাকায় সড়ক, কালভার্ট, স্লুইস গেট, কৃষিজমি, মাছের খামার ও বসতবাড়ির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

দীর্ঘদিন পানিবন্দি থাকা মানুষ এখন ঘরবাড়ি পরিষ্কার, কাদা সরানো এবং নতুন করে জীবিকা গড়ার কঠিন সংগ্রামে নেমেছেন।

এছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান শুরু করতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ চলছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, পৌরসভার উত্তর রামপুর, হাঙরমুখ, গাটিয়াডেঙ্গা ও সামিয়ারপাড়া এলাকায় ডলু নদীর ভয়াবহ ভাঙনে কয়েকশ মিটার সড়ক নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।

ভাঙা অংশ দিয়ে এখনও নদীর পানি লোকালয়ে ঢুকছে, ফলে এসব এলাকায় যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।

পাশাপাশি নলুয়া-চৌধুরীহাট সড়কের একটি অংশও ভেঙে গেছে।

অন্যদিকে সাঙ্গু নদীর ভাঙনে বাজালিয়া ইউনিয়নের চৌধুরীপাড়া এলাকায় কয়েকটি বসতঘর, একটি মসজিদ এবং সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ছদাহা-দস্তিদারহাট সড়কের প্রায় ২০০ মিটার অংশ বন্যার তোড়ে বিলীন হয়ে যাওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দারা ফকিরহাটের উত্তর পাশে সড়কের ওপর অস্থায়ী সাঁকো নির্মাণ করে চলাচল করছেন।

সামিয়ারপাড়া এলাকার বাসিন্দা মো. এনামুল হক জানান, পাহাড়ি ঢলের তীব্র স্রোতে ডলু নদীর পাশের সামিয়ারপাড়ার প্রধান সড়কটি একাধিক স্থানে ভেঙে গেছে।

এলাকায় যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকার পাশাপাশি বন্যার পানিতে একাধিক বসতবাড়ি সম্পূর্ণ ধসে পড়ায় মানুষ চরম দুর্ভোগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন বলে তিনি জানান।

ছমদারপাড়া এলাকার বাসিন্দা মো. হাসান জানান, বন্যায় গোলারঘাট সড়কের বড় একটি অংশ ভেঙে গেছে এবং এখনও ওই অংশ দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে।

পানির তীব্র স্রোতে অটোরিকশাচালক নাছির মৌলভীর বাড়িটিও ধসে গেছে এবং ভাঙন অব্যাহত থাকায় আশপাশের বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

বন্যার সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে কৃষি খাতে।

উপজেলা কৃষি অফিসের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ৬০ হেক্টর আমনের বীজতলা, ৯৯৫ হেক্টর আউশ ধান, ৭৪০ হেক্টর শাকসবজি, ৮ হেক্টর পান, ১৬ হেক্টর পেঁপে বাগান এবং ৮০ হেক্টর অন্যান্য ফসলসহ মোট এক হাজার ৮৯৯ হেক্টর কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এতে ২০ হাজারেরও বেশি কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছেন এবং কৃষি খাতে প্রাথমিকভাবে ৫০ থেকে ৬০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ছদাহার কৃষক আবুল হোসেন জানান, ১০ শতক জমিতে করলা, লাউ, শসা, ঝিঙে, ঢেঁড়স ও বেগুনের আবাদ করলেও বন্যার পানিতে একটি ফসলও তিনি রক্ষা করতে পারেননি।

নতুন করে চাষাবাদ শুরু করতে না পারলে পরিবার চালানো কঠিন হয়ে পড়বে বলে তিনি আক্ষেপ করেন।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান জানান, প্রাথমিকভাবে এক হাজার ৮৯৯ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।

ক্ষয়ক্ষতির প্রতিবেদন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রণোদনা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।

অবকাঠামো খাতেও ব্যাপক ক্ষতির চিত্র উঠে এসেছে।

উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) জানিয়েছে, বন্যায় ২৬টি সড়কের প্রায় ১৩ কিলোমিটার অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এছাড়া চারটি কালভার্ট ও একটি স্লুইস গেট ভেঙে গেছে, যার প্রাথমিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১০ কোটি টাকা।

এলজিইডির উপজেলা প্রকৌশলী সবুজ কুমার দে জানান, অনেক এলাকায় এখনও পানি পুরোপুরি নামেনি, ফলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।

পানি পুরোপুরি নেমে গেলে পূর্ণাঙ্গ জরিপের মাধ্যমে চূড়ান্ত হিসাব নির্ধারণ করা হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

মৎস্য খাতও বন্যার বড় ধাক্কা সামলাচ্ছে।

উপজেলা মৎস্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ৫৭৫ হেক্টর আয়তনের তিন হাজার ৫৫০টি পুকুর ও দিঘি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বন্যার পানিতে ৮০৬ মেট্রিক টন পিন ফিস, প্রায় ১০ লাখ মাছের পোনা এবং বিপুল পরিমাণ চাষের মাছ ভেসে গেছে।

এতে অবকাঠামো, মাছ ও পোনাসহ প্রায় ৩৭ কোটি ২৪ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।

ঢেমশা ইউনিয়নের মাছচাষি মো. হেলাল উদ্দিন জানান, মাহালিয়ায় তার প্রজেক্টের সব মাছ বন্যার পানিতে ভেসে গেছে।

সব মিলিয়ে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকারি সহায়তা না পেলে আবারও মাছ চাষ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়বে।

উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) তানবীর আহসান জানান, এটি প্রাথমিক হিসাব, পানি পুরোপুরি নেমে গেলে পুনরায় মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করা হবে।

এরপর চূড়ান্ত তালিকা প্রস্তুত করে ক্ষতিগ্রস্তদের সরকারি সহায়তার জন্য সুপারিশ করা হবে বলে তিনি জানান।

বিধ্বস্ত অবকাঠামো, কৃষি ও মৎস্য খাতের বিপুল ক্ষতির পাশাপাশি হাজারো পরিবার এখন ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াইয়ে নেমেছেন।

স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও অবকাঠামো সংস্কার এবং কৃষক ও মৎস্যচাষিদের জন্য জরুরি সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করা না হলে এ দুর্যোগের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব থেকে উত্তরণ কঠিন হবে।

এদিকে বন্যাকবলিত মানুষের পাশে দাঁড়াতে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ব্যক্তি, সামাজিক সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন মানবিক সংগঠনের সদস্যরা ত্রাণসামগ্রী নিয়ে সাতকানিয়ায় ছুটে আসছেন।

সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে উপজেলার বিভিন্ন ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় খাদ্যসামগ্রী, বিশুদ্ধ পানি, শুকনো খাবার ও প্রয়োজনীয় নিত্যসামগ্রী বিতরণ অব্যাহত রয়েছে।

তবে ক্ষতির ব্যাপকতার কারণে দুর্গত মানুষের চাহিদার তুলনায় সহায়তা আরও বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

বন্যাকবলিত মানুষের খোঁজখবর নিতে সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী এবং ভূমি প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন।

এ সময় তারা দুর্গত মানুষের মাঝে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেন এবং ক্ষতি পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তার আশ্বাস দেন।