
অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে দেশের সাতটি জেলায় ব্যাপক ফসলহানি ঘটেছে, যেখানে আমনের বীজতলা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কৃষকদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে নতুন আমনের চারা উৎপাদনকে সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিনুর রশীদ।
গত মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য বিশেষ বীজতলা তৈরি এবং ধানের চারা বিতরণ করা হবে।
পাশাপাশি গবাদিপশুর শুকনো খাবার সরবরাহ এবং ক্ষুরা রোগ প্রতিরোধে টিকাদান কর্মসূচিও জরুরি ভিত্তিতে হাতে নেওয়া হয়েছে বলে কৃষিমন্ত্রী উল্লেখ করেন।
কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিনুর রশীদ আরও জানান, ইউনিয়ন ও ব্লক পর্যায়ের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা সার্বক্ষণিকভাবে মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ করছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ৬ থেকে ১৪ জুলাইয়ের মধ্যে অতিবৃষ্টি ও ঢলে দেশের সাত জেলায় ২৭ হাজার ১১ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে।
চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার ২ লাখ ৪১৫ হেক্টর আবাদি জমির মধ্যে এই ক্ষয়ক্ষতি হয়।
এর ফলে এই সাত জেলার ২ লাখ ১১ হাজারেরও বেশি কৃষক সরাসরি ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নতুন লঘুচাপের কারণে গত বৃহস্পতিবার দক্ষিণাঞ্চলের নয়টি নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র নতুন এক সতর্কবার্তায় জানিয়েছে, ১৯ থেকে ২৩ জুলাইয়ের মধ্যে উত্তরাঞ্চলের পাঁচ জেলায় ৩৫০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত এবং বন্যা হতে পারে।
সবচেয়ে বেশি কৃষি ক্ষতি হয়েছে চট্টগ্রামে, যেখানে ৫০ হাজার ৪২৩ হেক্টর জমির মধ্যে ১৫ হাজার ৯৮৬ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে।
এর মধ্যে ৯ হাজার ১১৮ হেক্টর আউশ ধান, ৫ হাজার ৯০৭ হেক্টর গ্রীষ্মকালীন সবজি এবং ৯৬১ হেক্টর আমনের বীজতলা রয়েছে।
চট্টগ্রামে মোট ১ লাখ ২২ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা কৃষি কর্মকর্তা অপ্রু মারমা জানান, জেলার ১৭টি উপজেলার ফসলি জমি প্লাবিত হয়েছে।
এর মধ্যে বাঁশখালী, চন্দনাইশ, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া এবং সীতাকুণ্ডে সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে অপ্রু মারমা উল্লেখ করেন।
তিনি জানান, বন্যার পানি নামতে শুরু করেছে এবং কর্মকর্তারা ফসলের ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করছেন।
কক্সবাজারে ৯ হাজার ৯২০ হেক্টর জমির মধ্যে ৪ হাজার ২১১ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে।
এর মধ্যে ২ হাজার ৬২০ হেক্টর আউশ ধান, ৯৫৫ হেক্টর গ্রীষ্মকালীন সবজি, ৪৭০ হেক্টর আমনের বীজতলা এবং ১৬৬ হেক্টর পানের বরজ রয়েছে।
কক্সবাজারে মোট ৪৩ হাজার ২১০ জন কৃষক ক্ষতির শিকার হয়েছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক বিমল কুমার প্রামাণিক জানান, কৃষি বিভাগ ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দ্রুত বীজ, সার ও অন্যান্য সহায়তা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
কুতুবদিয়ার কৃষক নুরুল আলম জানান, ইজারা নেওয়া এক একর জমিতে তার পানের বরজ ও ধানের খেত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
নুরুল আলম বলেন, পান চাষে প্রায় ৮ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন এবং তার পরিবারের জীবিকা এই ফসলের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় দ্রুত সরকারি সহায়তা প্রয়োজন।
চকরিয়ার কৃষক মো. জসিম উদ্দিন জানান, তার আউশ ধান ও আমনের বীজতলা সম্পূর্ণ তলিয়ে গেছে।
মো. জসিম উদ্দিন বলেন, দ্রুত বীজ ও সার পেলে তারা অন্তত ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাবেন।
পাহাড়ি ঢলে রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানেও ব্যাপক ফসলের ক্ষতি হয়েছে।
রাঙামাটিতে ৫৩ হাজার ৭৬৬ হেক্টর আবাদি জমির মধ্যে ৩ হাজার ৪৯৫ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে।
এর ফলে গ্রীষ্মকালীন সবজি, আদা, হলুদ ও আউশ ধান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় জেলার ১৩ হাজার ৭২২ জন কৃষক বিপাকে পড়েছেন।
খাগড়াছড়িতে ১ হাজার ৩১ হেক্টর কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে ৫৪৮ হেক্টর পেঁপে বাগান, ২০২ হেক্টর আমনের বীজতলা, ১৪৩ হেক্টর গ্রীষ্মকালীন সবজি এবং ১৩৮ হেক্টর আউশ ধানের খেত রয়েছে।
খাগড়াছড়িতে মোট ৭ হাজার ৩৪৪ জন কৃষক ক্ষতির শিকার হয়েছেন।
বান্দরবানে ১৮০ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হওয়ায় ১ হাজার ৭৭৯ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
সেখানে মূলত গ্রীষ্মকালীন সবজি, ফলের বাগান, জুম আউশ, আদা এবং হলুদের চাষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, আমনের বীজতলা নষ্ট হওয়ায় আগামী আমন মৌসুমে সংকট তৈরি হতে পারে এবং গ্রীষ্মকালীন সবজি নষ্ট হওয়ায় স্থানীয় বাজারে দাম বেড়ে যেতে পারে।