
চট্টগ্রামের হালিশহরের গৃহিণী রাহেলা বেগম গত সপ্তাহে তাঁর সাত বছরের ছেলেকে নিয়ে হাসপাতালে ছুটেছেন। তিন দিন ধরে জ্বর, সঙ্গে গায়ে র্যাশ। পরীক্ষায় ধরা পড়ল ডেঙ্গু। রাহেলা বললেন, “বাচ্চাটা সারাদিন ঘরেই থাকে, বাইরে যায় না বললেই চলে। তবুও ডেঙ্গু হলো কীভাবে?” উত্তরটা সহজ— মশা ঘরেই আছে, বাইরে যাওয়ার দরকার নেই। চট্টগ্রাম এখন ডেঙ্গুর উচ্চঝুঁকির জেলার তালিকায়। আর শুধু চট্টগ্রাম নয়, সারাদেশেই ছড়িয়ে পড়েছে এই আতঙ্ক।
দেড় মাসে ৯ হাজারের বেশি আক্রান্ত, মৃত্যু ৩২
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছর এ পর্যন্ত সারাদেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ৯ হাজার ৭৭০ জন, মারা গেছেন ৩২ জন। দেড় মাস ধরে সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৯৪ জন।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্যটি হলো শিশুদের নিয়ে। মোট আক্রান্তের প্রায় ১৯ শতাংশ ১৫ বছরের কম বয়সী। এর মধ্যে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু আক্রান্ত ৫৮৪ জন। ছয় থেকে দশ বছর বয়সীদের মধ্যে আক্রান্ত ৫৭১ জন, আর ১১ থেকে ১৫ বছর বয়সীদের মধ্যে ৬৬৩ জন। অর্থাৎ প্রতি পাঁচজন শিশু রোগীর মধ্যে একজন পাঁচ বছরেরও কম বয়সী।
কর্মক্ষম তরুণ জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত — ১৬ থেকে ৫০ বছর বয়সীদের মধ্যে আক্রান্ত ৬ হাজার ৭৯৯ জন, যা মোট রোগীর ৭০ শতাংশ। আক্রান্তদের ৬১ শতাংশ পুরুষ, ৩৯ শতাংশ নারী।
চট্টগ্রাম ঝুঁকির তালিকায়, আগস্টে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার সরাসরি সতর্ক করে বলেছেন, আগামী আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গুর প্রকোপ ভয়াবহ হতে পারে। এখনই কার্যকরভাবে মশা নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা আছে।
তিনি এই বছর সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ জেলার তালিকায় চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের নাম উল্লেখ করেছেন। পাশাপাশি বরিশাল, বরগুনা, খুলনা, ঢাকা, গাজীপুরসহ আরও কয়েকটি জেলা রয়েছে এই তালিকায়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, কর্মক্ষম মানুষ কাজের কারণে বিভিন্ন জায়গায় যান, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে থাকেন। শিশুরা ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় থেকে ঝুঁকিতে পড়ছে। পরিচ্ছন্নতা অভিযান আরও জোরালো করা এবং জ্বরের শুরুতেই বিনামূল্যে পরীক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।
ঢাকা ছেড়ে এখন সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে ডেঙ্গু
একসময় ডেঙ্গু ছিল ঢাকার রোগ। সেই চিত্র এখন সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে। চলতি বছর মোট আক্রান্তের ৭৬ শতাংশ ঢাকার বাইরের। ২০২১ সালে এই হার ছিল মাত্র ১৬ শতাংশ। চার বছরে এই পরিবর্তন রীতিমতো চমকে দেওয়ার মতো।
এখন সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত বরিশাল বিভাগে— ২ হাজার ৪৪৩ জন, মোট রোগীর ২৫ শতাংশ। প্রতি চারজন রোগীর একজন বরিশালের। ঢাকা মহানগরে আক্রান্ত ২ হাজার ৩৪১ জন।
জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, গত ২৫ বছরেও ঢাকায় এডিস মশা কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। ঢাকার বাইরের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা আরও সীমিত। ভবিষ্যতে পরিস্থিতি সামলানো কঠিন হবে।
সরকার বলছে, সারাদেশে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চলছে। সব সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষা চালু, বেসরকারি হাসপাতালে পরীক্ষার সর্বোচ্চ ফি নির্ধারণ করা হয়েছে। হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু কর্নার চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু রাহেলা বেগমের সাত বছরের ছেলে এখনো হাসপাতালে। ঘরে থেকেও ডেঙ্গু হয়েছে তার। চট্টগ্রামের হাজারো পরিবার এখন একই আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। মশার ওষুধ ছিটানো, পানি জমতে না দেওয়া— এটুকু করা যাবে। কিন্তু সরকারি উদ্যোগ মাঠে না নামলে আগস্টের ভয়াবহতা ঠেকানো কঠিন।