[নারীর জন্য সরকারি কেনাকাটায় একটি হিস্যা লিখে দিয়েছে পিপিআর ২০২৫- পরিচালন বাজেটের অন্তত ২৫ শতাংশ। বিধির ভাষা আদেশের: “পারিবে” নয়, “রাখিবে”। সংজ্ঞা আছে, পরিমাণ আছে, ফি-ছাড় আছে, অভিজ্ঞতার শর্তে ছাড়ও আছে। তবু অধিকারটি আটকে আছে একটি তালিকার অপেক্ষায়- যে তালিকাকে বিধিমালা নিজেই ঐচ্ছিক বলেছে, আর যে অপেক্ষার নির্দেশ এসেছে মৌখিকভাবে, লিখিত কোনো পরিপত্র ছাড়াই। কয়েকটি জেলা অপেক্ষা করেনি; দেড় মাসে তালিকা করে ফেলেছে। অর্থ বিভাগও জানুয়ারিতে লিখিত পরিপত্রে এই বিধির অধীন ক্রয়ের আর্থিক ক্ষমতা অর্পণ করে সেটিকে “অবিলম্বে কার্যকর” ঘোষণা করেছে। চট্টগ্রামের তিন মাসের ২ হাজার ১৮৫টি চুক্তির নথি বলছে, পরিচালন বাজেটের ৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ গেছে নারী-মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে- যার প্রায় অর্ধেকই একজনের হাতে, যিনি এই সংরক্ষণ ব্যবহারই করেন না।]
চট্টগ্রামের বহদ্দারহাটের নাহিদা সুলতানা ২০২৪ সালে নিজের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি খোলেন। বেসরকারি খাতে ততদিনে তাঁর প্রতিষ্ঠান ১২টি কাজ শেষ করেছে- নির্মাণ ও সংস্কারের কাজ, প্রতিটির নকশা, দরদাম আর শ্রমিক ব্যবস্থাপনা তাঁর নিজের হাতে।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে তিনি প্রথমবার একটি সরকারি দরপত্রে অংশ নিতে যান। শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ওই দরপত্রটি তাঁর প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতার সঙ্গে মিলে যাচ্ছিল। কিন্তু যোগ্যতার শর্তে চাওয়া হয়েছিল আগের কাজের অভিজ্ঞতার সনদ- সরকারি কাজের। সেটি তাঁর ছিল না। আবেদন করার আগেই তিনি সরে দাঁড়ান।
“আমার কাজ করার সক্ষমতা আছে, কিন্তু সরকারি কাজ না পাওয়ায় সরকারি কাজের অভিজ্ঞতার সনদ নেই। আবার ওই সনদ না থাকায় সরকারি কাজেও ঢুকতে পারছি না- এটা একটা চক্রের মতো হয়ে গেছে,” বলেন নাহিদা সুলতানা।
এই চক্রটি ভাঙার জন্যই গত বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর দেশের সরকারি কেনাকাটার আইনে একটি পরিবর্তন এসেছিল। নাহিদা সুলতানা সেটির কথা জানতেন না। যে দপ্তরে তিনি দরপত্র জমা দিতে গিয়েছিলেন, সেই দপ্তরও সেটি প্রয়োগ করছিল না।
এক নীরব পরিবর্তন, এক নীরব স্থগিতাদেশ
২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ কার্যকর হয় পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর) ২০২৫। ১৫৪টি বিধি ও ২১টি তফসিল নিয়ে গড়া নতুন এই বিধিমালা প্রতিস্থাপন করে ১৭ বছরের পুরোনো পিপিআর ২০০৮-কে।
আর তাতে যুক্ত হয় এমন একটি শর্ত, যা আগের বিধিমালায় ছিল না- সরকারি ক্রয়ের একটি নির্দিষ্ট অংশ কেবল অতিক্ষুদ্র ও ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান, নারী-মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান এবং নতুন প্রতিষ্ঠানের জন্য সংরক্ষিত রাখতে হবে।
২০০৮ সালের ক্রয়বিধিমালায় “নারী” শব্দটি ব্যবসায়িক শ্রেণি হিসেবে একবারও আসেনি। ১৭ বছর পর সেটি এল।
কিন্তু চট্টগ্রামের তিন মাসের ২ হাজার ১৮৫টি সরকারি চুক্তির নথি বলছে, বিধিটি কার্যকর হয়নি। আর কেন হয়নি, তার ব্যাখ্যা পাওয়া গেছে ব্যবস্থাটির ভেতর থেকেই- বিধিটি স্থগিত রাখা হয়েছে মৌখিক নির্দেশে, লিখিত কোনো পরিপত্র ছাড়াই। যুক্তিটি একটি তালিকা: কোন প্রতিষ্ঠান নারী-মালিকানাধীন, তার তালিকাভুক্তি ই-জিপিতে সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা।
অথচ বিধিমালা বলছে তালিকাটি ঐচ্ছিক।
বিধিতে ঠিক কী লেখা আছে
পিপিআর ২০২৫-এর বিধি ৮০(১)(ঘ)-এর শর্তাংশ বলছে, “টেকসই সরকারি ক্রয়ের সামাজিক উপাদানের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিতকল্পে” একজন ক্রয়কারী তার পরিচালন খাতের বার্ষিক বাজেটের একটি নির্দিষ্ট অংশের ক্রয় “কেবল অতিক্ষুদ্র ও ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান, নারী-মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান এবং নূতন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমিত রাখিবে”।
পরিমাণটি তফসিল-২-এ নির্ধারিত: পরিচালন বাজেটে বার্ষিক বরাদ্দের ন্যূনতম ২৫ শতাংশ, বিশেষায়িত ক্রয় ছাড়া। সংরক্ষিত এই ক্রয় হবে সীমিত দরপত্র পদ্ধতিতে, পণ্য ও ভৌতসেবায় সর্বোচ্চ ৫০ লাখ এবং কার্যে সর্বোচ্চ ৫ কোটি টাকার প্যাকেজে। বিধিমালা চূড়ান্ত হওয়ার আগে খসড়ায় প্রস্তাব ছিল ২০ শতাংশ; গেজেটে সেটি বেড়ে দাঁড়ায় ২৫-এ।
ভাষাটি লক্ষ করার মতো। “পারিবে” নয়, “রাখিবে”।
তিন শ্রেণির সংজ্ঞাও একই তফসিলে লেখা, তিন লাইনে:
– অতিক্ষুদ্র ও ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান: দরপত্র আহ্বানের আগের তিন বছরে যারা সব মিলিয়ে সর্বোচ্চ এক কোটি টাকার সরকারি চুক্তি পেয়েছে।
– নারী-মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান: “যেই সকল একক মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী একজন নারী।”
– নূতন প্রতিষ্ঠান: দরপত্র আহ্বানের আগের দুই বছরে যারা প্রথম ব্যবসা নিবন্ধন নিয়েছে।
তিনটি সংজ্ঞার একটিও এমন নয়, যা যাচাই করতে কোনো কেন্দ্রীয় নিবন্ধন লাগে। ট্রেড লাইসেন্সের তারিখ, টিন আর চুক্তির রেকর্ড- এই তিনটিই যথেষ্ট। তালিকাভুক্তি ও নবায়ন ফিতেও নারী স্বত্বাধিকারীর জন্য আলাদা ছাড় রাখা হয়েছে।
বিধিমালায় আরেকটি শর্তও আছে, যা নাহিদা সুলতানার আটকে যাওয়ার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। বিধি ৬৫(৬) বলছে, সীমিত দরপত্র পদ্ধতিতে তফসিল-২-এ বর্ণিত মূল্যসীমা পর্যন্ত, অর্থাৎ পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ কার্য ক্রয়ে, দরদাতার যোগ্যতা নির্ধারণে “অতীতে সম্পাদিত ক্রয়কার্যের অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হইবে না।”
অর্থাৎ যে সনদটি না থাকায় তিনি সরে দাঁড়িয়েছিলেন, সীমিত দরপত্রে ছোট আকারের কাজে সেটি চাওয়ারই কথা নয়।
কাগজে ব্যবস্থাটি তাই সম্পূর্ণ। অধিকার আছে, সংজ্ঞা আছে, পরিমাণ আছে, অভিজ্ঞতার শর্তে ছাড় আছে, এমনকি ফি-ছাড়ও আছে।
শুধু বাস্তবে নেই।
পরিচালন বাজেটে অংশ সাড়ে তিন শতাংশ
চট্টগ্রামের মার্চ, এপ্রিল ও মে- এই তিন মাসে ই-জিপিতে প্রকাশিত ২ হাজার ১৮৫টি চুক্তির মোট মূল্য ১ হাজার ৮৪ কোটি ৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে যেসব প্রতিষ্ঠানের একমাত্র সুবিধাভোগী মালিক একজন নারী, তাঁদের হাতে গেছে ৯৮টি চুক্তি, ২১ কোটি ৫১ লাখ টাকা- মোট চুক্তিমূল্যের ১ দশমিক ৯৮ শতাংশ।
কিন্তু এই সংখ্যাটি দিয়েই বিধি লঙ্ঘনের সিদ্ধান্তে যাওয়া যায় না। কারণ ২৫ শতাংশের হিসাব কেবল পরিচালন (রাজস্ব) বাজেটের ক্রয়ের, উন্নয়ন বাজেট বা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব তহবিলের নয়। আর সংরক্ষণটি তিন শ্রেণির সম্মিলিত।
চুক্তিগুলোকে বাজেটের উৎস ধরে আলাদা করলে ছবিটি স্পষ্ট হয়।
যে খাতটির ওপর বিধিটি সরাসরি প্রযোজ্য- পরিচালন বাজেট, সেখানে তিন মাসে নারী-মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের অংশ ৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ। চুক্তির সংখ্যা ধরলে ৫ দশমিক ২২ শতাংশ।
ওই ১ হাজার ৩৭৮টি পরিচালন-চুক্তির মূল্য ছিল ৪৮৩ কোটি টাকা। বিধি অনুযায়ী এর ২৫ শতাংশ, প্রায় ১২১ কোটি টাকা, সংরক্ষিত থাকার কথা তিন শ্রেণির প্রতিষ্ঠানের জন্য। তিন শ্রেণি মিলিয়েও যদি ওই ১২১ কোটি টাকা সংরক্ষিত থাকত, নারীদের হাতে যাওয়া ১৭ কোটি ১২ লাখ টাকা তার ১৪ শতাংশ মাত্র।
একটি সতর্কতা এখানে জরুরি: বিধির ২৫ শতাংশ হিসাব হয় প্রতিটি দপ্তরের বার্ষিক বরাদ্দের ভিত্তিতে, তিন মাসের চুক্তিমূল্যের ভিত্তিতে নয়। তুলনাটি তাই ইঙ্গিতবাহী, চূড়ান্ত নয়- আর সেই বার্ষিক হিসাবটিই কোথাও রাখা হচ্ছে না।
৫৪ জন নারী, প্রায় এক হাজার পুরুষ
তথ্যগুলো একটি প্রচলিত ধারণাকেও প্রশ্নে ফেলে।
সাধারণভাবে ধরে নেওয়া হয়, নারী উদ্যোক্তারা কেবল ছোট কাজেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু পরিচালন বাজেটের চুক্তিতে নারী-মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের গড় চুক্তিমূল্য ২৩ লাখ ৭৮ হাজার টাকা, আর একই খাতে পুরুষ একক-মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের গড় ২৬ লাখ ৩১ হাজার টাকা। পার্থক্য সামান্য।
অর্থাৎ যাঁরা ভেতরে ঢুকতে পেরেছেন, তাঁরা তুলনামূলক একই আকারের কাজই পাচ্ছেন এবং শেষ করছেন। ঘাটতিটা কাজের আকারে নয়, কাজের সংখ্যায়। একই খাতে পুরুষ একক-মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান পেয়েছে ১ হাজার ১৯৯টি চুক্তি, নারী-মালিকানাধীন ৭২টি।
সংখ্যাটি মানুষের হিসাবে আরও স্পষ্ট। তিন মাসে চট্টগ্রামের সব সরকারি চুক্তির পেছনে একক সুবিধাভোগী মালিক প্রায় এক হাজার জন। তার মধ্যে নারী ৫৪ জন।
সমস্যাটি তাই সক্ষমতার নয়, প্রবেশের।
আর এই ৫৪ জনের মধ্যেও কেন্দ্রীভবন তীব্র। শীর্ষ পাঁচজনের হাতে গেছে নারী-মালিকানাধীন মোট চুক্তিমূল্যের ৬৫ দশমিক ৭ শতাংশ। মূল্যের হিসাবে সবচেয়ে এগিয়ে চট্টগ্রামের অন্যতম সক্রিয় ঠিকাদার রুম্মান সুলতানা; তাঁর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো ৬টি চুক্তিতে পেয়েছে ৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা, যা তিন মাসে নারী-মালিকানাধীন সব চুক্তিমূল্যের ৩৫ শতাংশের বেশি। চুক্তিগুলোর সবই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীন চট্টগ্রাম ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের ওষুধ, রি-এজেন্ট ও অন্যান্য সরঞ্জাম কেনার, এবং সবই উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে (ওটিএম)। অর্থাৎ সংরক্ষিত কোনো সুবিধা ব্যবহার করে নয়।
একজনকে বাদ দিলে হিসাবটি বদলে যায়। রুম্মান সুলতানার ছয়টি চুক্তি বাদ দিলে পরিচালন বাজেটে নারীদের অংশ ৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ থেকে নেমে দাঁড়ায় ১ দশমিক ৯৭ শতাংশে। অর্থাৎ যিনি সংরক্ষণ ব্যবহার করেন না, তিনিই সংরক্ষণের পরিসংখ্যানটি প্রায় একা ধরে রেখেছেন।
গড়ের বদলে মধ্যক দেখলে সাধারণ নারী উদ্যোক্তার প্রকৃত চিত্রটি বেরিয়ে আসে। পরিচালন খাতে নারীদের চুক্তির গড় ২৩ লাখ ৭৮ হাজার টাকা হলেও মধ্যক মাত্র ৬ লাখ ৮১ হাজার টাকা। ৯৮টি চুক্তির সবগুলো ধরলে মধ্যক ৮ লাখ ৯৩ হাজার। ৫৪ জনের মধ্যে ৪৯ জনের প্রত্যেকের তিন মাসের মোট চুক্তিমূল্য এক কোটি টাকারও কম, আর ২৪ জনের ক্ষেত্রে তা ১০ লাখ টাকার নিচে। সবচেয়ে ছোট চুক্তিটি ৮৯ হাজার ৫৮৫ টাকার।
দপ্তরের হিসাবেও চিত্রটি একই। চট্টগ্রামের ক্রয়কারী দপ্তরের সংখ্যা ২৭০-এর বেশি; তার মধ্যে মাত্র ৪৬টির চুক্তি তিন মাসে কোনো নারী-মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে গেছে। মূল্যের হিসাবে শীর্ষে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (৬টি চুক্তি, ৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা), যার পুরোটাই একজনের। চুক্তির সংখ্যায় এগিয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তর (১৯টি) ও স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (১৫টি); তবে দুটি দপ্তর মিলিয়ে নারীদের হাতে গেছে ২ কোটি ৬৬ লাখ টাকার কাজ, অর্থাৎ ছোট ছোট মেরামত-সংস্কার।
একটি সংরক্ষণ ব্যবস্থার যুক্তি হলো নতুন উদ্যোক্তার প্রবেশ। তিন মাসের এই খাতা বলছে, প্রবেশ ঘটছে খুব কম মানুষের, আর যা ঘটছে তাও কয়েকজনের হাতেই জমা হচ্ছে।
তালিকার অপেক্ষা, আর তার লিখিত চিহ্ন
বিধিটি কেন কার্যকর হচ্ছে না, তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের প্রজেক্ট ম্যানেজার ও বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটির (বিপিপিএ) তালিকাভুক্ত জাতীয় ক্রয়-প্রশিক্ষক শাহানা ফেরদৌস।
তাঁর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বিধিটি কার্যকর করতে হলে আগে জানতে হবে কোন প্রতিষ্ঠান নারী-মালিকানাধীন, কোনটি নতুন। সেই তালিকাটিই তৈরি হয়নি। দপ্তরগুলোকে জানানো হয়েছে মৌখিকভাবে।
“এটার জন্য আলাদা কোনো পরিপত্র নাই,” বলেন তিনি। “কিন্তু এটা আমাদের ডিপার্টমেন্টগুলোতে বিপিপিএ থেকে মৌখিকভাবে জানাই দেওয়া হয়েছিল।”
এখানেই ফাঁকটি। বিধির ভাষা বাধ্যতামূলক, অথচ বাধ্যবাধকতাটি স্থগিত রাখা হয়েছে মৌখিক নির্দেশে। কেউ বিধি ভাঙছেন না, কেউ মানছেনও না।
আর তালিকার যুক্তিটি বিধিমালার পাঠের সঙ্গে মেলে না। বিধি ৮০(১)(ঘ)-এর যে শর্তাংশটি সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করেছে, তালিকার কথাটিও আছে ঠিক সেই একই বাক্যে এবং সম্পূর্ণ ভিন্ন সুরে। বাক্যটি বলছে, ক্রয়কারী ক্রয় কার্যক্রম তিন শ্রেণির মধ্যে “সীমিত রাখিবে এবং সেই লক্ষ্যে … সামাজিক ক্রয় ক্যাটেগরি শিরোনামে পৃথক তালিকা সংরক্ষণ করিতে পারিবে”। একই বাক্যে দুটি ভিন্ন ক্রিয়া- সংরক্ষণটি বাধ্যতামূলক, তালিকাটি ঐচ্ছিক। বিধি ৬৮(৪)-এও একই কথা আলাদা করে বলা আছে।
পরিপত্র না থাকলেও নির্দেশটি একেবারে অলিখিত থাকেনি।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের কন্ট্রাক্ট অ্যান্ড প্রকিউরমেন্ট সেল গত বছরের ২৯ অক্টোবর তার সব ক্রয়কারী দপ্তরের উদ্দেশে একটি সার্কুলার জারি করে। তাতে বিধি ৮০(১)(ঘ)-এর শর্তটি হুবহু তুলে ধরে বলা হয়, কীভাবে দরপত্র দলিলের তথ্যপত্রে (টেন্ডার ডেটা শিট) ও ই-জিপির নোটিশে সেটি উল্লেখ করতে হবে। সঙ্গের ছকে তিন শ্রেণির যোগ্যতার মানদণ্ডের পাশে লেখা আছে কী কাগজ লাগবে। নারী-মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের ঘরে: “নারী মালিকের একক স্বত্বাধিকার এর প্রমাণ সম্বলিত তথ্যাদি দিতে হবে।”
অর্থাৎ সার্কুলারটি নিজেই ধরে নিয়েছে, প্রমাণটি আসবে দরদাতার কাছ থেকে- কোনো কেন্দ্রীয় তালিকা থেকে নয়। এবং এর শেষ অনুচ্ছেদে লেখা, মহাপরিচালকের অনুমোদনক্রমে জারি করা সার্কুলারটি “অবিলম্বে কার্যকর হবে”।
কিন্তু সার্কুলারটির সঙ্গে যে নির্দেশনাটি দপ্তরগুলোর কাছে পৌঁছেছে, তাতে যুক্ত ছিল একটি বাড়তি লাইন: “উল্লেখ্য যে, যখন এনলিস্টমেন্ট প্রক্রিয়া ই-জিপিতে সম্পন্ন হবে তখন এই ক্যাটেগরির দরপত্র আহ্বান করা শ্রেয় মর্মে বিপিপিএ হতে জানা গিয়েছে।”
অর্থাৎ বিধিটি এখনই প্রয়োগ না করার পরামর্শটি বিপিপিএ থেকেই এসেছে, আর একটি সংস্থার নিজস্ব নির্দেশনায় তা লিখিত আকারে নেমেও এসেছে। শাহানা ফেরদৌসের ভাষ্য এখানে স্বাধীনভাবে সমর্থিত।
ভাষাটিও লক্ষ করার মতো। বিপিপিএ বলেনি বিধিটি স্থগিত; বলেছে তালিকাভুক্তি সম্পন্ন হলে দরপত্র আহ্বান করা “শ্রেয়”। অর্থাৎ পরামর্শ, নিষেধাজ্ঞা নয়। একটি পরামর্শ কীভাবে একটি বাধ্যতামূলক বিধিকে কার্যত স্থগিত করে দিতে পারে, সেই প্রশ্নের উত্তর কারও কাছে নেই।
অর্থ বিভাগ উল্টো দিকে
লিখিত নির্দেশ যে একেবারেই নেই, তা নয়। আছে এবং সেটি বিপরীত দিকে যায়।
চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ একটি পরিপত্র জারি করে, যার বিষয় গণখাতে কর্পোরেশন, স্বায়ত্তশাসিত ও আধা-স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলোর পূর্তকাজ, পণ্য ক্রয় ও পরামর্শক সেবা গ্রহণে আর্থিক ক্ষমতা অর্পণ। অর্থ সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার স্বাক্ষরিত পরিপত্রটির সঙ্গে আছে একটি বিস্তারিত সংযোজনী- উন্নয়ন ও পরিচালন খাতের জন্য আলাদা দুটি ছক।
ওই দুই ছকেই একটি ক্রমিকের শিরোনাম হুবহু এই প্রতিবেদনের বিধিটি: “তালিকাভুক্ত সরবরাহকারী/ঠিকাদারের নিকট থেকে সীমিত দরপত্র (এলটিএম) পদ্ধতি মাধ্যমে ক্রয়, পিপিআর, ২০২৫ এর বিধি ৮০ ১(ঘ)”। অর্পিত ক্ষমতাও বসানো আছে সংখ্যাসহ- পণ্য, ভৌত সেবা ও একক সেবাদান চুক্তিতে অনধিক ৫০ লাখ টাকা, অভ্যন্তরীণ কার্যে অনধিক ৫ কোটি টাকা। সংখ্যা দুটি তফসিল-২-এ সংরক্ষিত ক্রয়ের জন্য নির্ধারিত সীমার সঙ্গে হুবহু মেলে।
পরিপত্রটির অষ্টম অনুচ্ছেদে লেখা, এটি “অবিলম্বে কার্যকর হবে এবং পুনরাদেশ না দেওয়া পর্যন্ত বলবৎ থাকবে”। সপ্তম অনুচ্ছেদে সংস্থাগুলোকে বলা হয়েছে, প্রতি অর্থবছরের শুরুতেই বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। আর বিতরণ তালিকার ছয় নম্বরে আছেন চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি।
দুটি কথা এখানে স্পষ্ট করা দরকার। পরিপত্রটি আর্থিক ক্ষমতা অর্পণের, ২৫ শতাংশ সংরক্ষণ বাস্তবায়নের নির্দেশনা নয়; এতে “সামাজিক ক্রয় ক্যাটেগরি” বা নারী-মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের কথা আলাদা করে বলা নেই। আর এটি প্রযোজ্য কর্পোরেশন, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে- সব মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরে নয়। চট্টগ্রামে এর আওতায় পড়ে বন্দর কর্তৃপক্ষ ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড।
তবু তাৎপর্যটি ছোট নয়। সরকারি অর্থ ব্যয়ের সবচেয়ে মৌলিক শর্ত হলো আর্থিক ক্ষমতা- কে কত টাকা পর্যন্ত অনুমোদন করতে পারবেন। জানুয়ারির ওই পরিপত্র বলছে, বিধি ৮০(১)(ঘ)-এর অধীনে ক্রয়ের জন্য সেই ক্ষমতা অর্পিত হয়ে গেছে, সংখ্যাসহ, এবং তা অবিলম্বে কার্যকর।
অর্থাৎ যে সময়টিতে দপ্তরগুলোকে মৌখিকভাবে অপেক্ষা করতে বলা হচ্ছিল, ঠিক সেই সময়েই অর্থ বিভাগ লিখিতভাবে ওই বিধির অধীনে ব্যয়ের যন্ত্রপাতি চালু করে দিয়েছে এবং বিতরণ তালিকায় রেখেছে বিপিপিএকেই। এই প্রতিবেদনের তথ্যগুলো মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসের, অর্থাৎ পরিপত্র জারির পরের।
কেউ কেউ অপেক্ষা করেননি
তালিকার অপেক্ষা যে বাধ্যতামূলক নয়, তার প্রমাণ আছে সরকারি দপ্তরেই। এবং একটির নয়, একাধিকের।
বিধিমালা কার্যকর হওয়ার দেড় মাসের মাথায়, গত বছরের ১৬ নভেম্বর, বগুড়ায় শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয় তিনটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে, তিনটিরই শিরোনাম “এলটিএম দরপত্রে অংশগ্রহণের জন্য পিপিআর-২০২৫ বিধি-৮০(১)(ঘ) অনুসারে সামাজিক ক্রয় ক্যাটাগরীর দরদাতাদের তালিকা”। নারী-মালিকানাধীন তালিকায় নাম উঠেছে ৩১টি প্রতিষ্ঠানের- প্রতিটির পাশে স্বত্বাধিকারীর নাম, ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর।
দেড় মাস পর, ৩০ ডিসেম্বর, পাবনার একই অধিদপ্তর একই তিনটি তালিকা প্রকাশ করে। নারী-মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান সেখানে ৪৫টি।
নওগাঁয় প্রক্রিয়াটি আরেক ধাপ আগের। গত ১ ডিসেম্বর সেখানকার নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয় তালিকাভুক্ত সব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সাত কর্মদিবসের মধ্যে এক পাতার একটি ছক পূরণ করে জমা দিতে বলে; যেখানে প্রতিষ্ঠানের নাম, স্বত্বাধিকারীর নাম, স্বত্বাধিকারীর ধরন (মহিলা/পুরুষ), ই-জিপি আইডি, লাইসেন্স তালিকাভুক্তির তারিখ এবং গত তিন বছরে পাওয়া সরকারি কাজের মোট মূল্য চাওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ বিধিটি কার্যকর করতে যে তথ্য দরকার, তা সংগ্রহ করতে একটি দপ্তরের লেগেছে এক পাতার একটি ছক আর সাত কর্মদিবস।
বিজ্ঞপ্তিগুলোর পাদটীকা আরও তাৎপর্যপূর্ণ। বগুড়া ও পাবনা দুই জায়গাতেই প্রায় একই ভাষায় লেখা: “এই তালিকায় নাম নেই কিন্তু যে সকল একক মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী একজন নারী, সে সকল প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশগ্রহণ করিতে পারিবে।”
দপ্তর দুটি তাই তালিকাটিকে প্রবেশের শর্ত বানায়নি, বানিয়েছে সুবিধা- বিধিমালার পাঠ যেমনটি বলে। তালিকা তৈরি করা সম্ভব ছিল, এবং দ্রুতই সম্ভব ছিল। সবাই করেননি, আর না করার পক্ষে কোনো লিখিত ভিত্তিও কেউ দেখাতে পারেননি।
ব্যবস্থাটি নারীদের গোনে না
বিধিটি কার্যকর হলেও তার অগ্রগতি মাপা যেত কি না, সেটিও একটি প্রশ্ন।
২০২৫ সালের সংস্কারে ঠিকাদারের প্রকৃত সুবিধাভোগী মালিকের নাম প্রকাশ বাধ্যতামূলক হয়েছে, যার উদ্দেশ্য ছদ্ম-দরদাতা বা একজনের একাধিক লাইসেন্স ব্যবহার ঠেকানো। কিন্তু কোন প্রতিষ্ঠান নারী-মালিকানাধীন, তা আলাদা করে চিহ্নিত করার কোনো ঘর নেই। ই-জিপি পোর্টালে নিবন্ধনের সময় প্রতিষ্ঠানের নাম, ট্রেড লাইসেন্স, টিআইএন, ভ্যাট এবং মালিকের এনআইডি নেওয়া হয়- মালিকের লিঙ্গ নির্বাচনের কোনো ঘর সেখানে নেই। লিঙ্গভিত্তিক কোনো পরিসংখ্যান বা ড্যাশবোর্ডও নেই।
ফলে এই প্রতিবেদনের ৯৮টি চুক্তির হিসাবও করতে হয়েছে হাতে, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের সুবিধাভোগী মালিকের নাম ধরে ধরে।
সরকারিভাবে প্রকাশিত একটিমাত্র সংখ্যা পাওয়া যায়, আর সেটিও আড়াই বছরের বেশি পুরোনো। ২০২৩ সালের ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত ই-জিপিতে নিবন্ধিত নারী দরদাতার সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৩৮৮ জন, তখন মোট নিবন্ধিত দরদাতা ছিলেন প্রায় ১ লাখ ১১ হাজার- প্রায় ৩ শতাংশ।
অথচ সংখ্যাটি যে বের করা সম্ভব ছিল, তার প্রমাণ আছে বিশ্বব্যাংকের নথিতেই। ই-জিপি উন্নয়নে অর্থায়নকারী বিশ্বব্যাংকের প্রকল্প ডিআইএমএপিপিপি-এর সমাপনী প্রতিবেদনে (জুন ২০২৪) একটি সূচক আছে- “নারী-নেতৃত্বাধীন বা নারী-মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের ক্রয়-কার্যক্রম শনাক্ত ও পরিবীক্ষণের ব্যবস্থা তৈরি”। লক্ষ্যমাত্রা ছিল “হ্যাঁ”; অর্জন দেখানো হয়েছে “হ্যাঁ”, তারিখ ২০ এপ্রিল ২০২৩।
কিন্তু তিন বছর পরে এসে দেখা যাচ্ছে, প্রকাশ্য নিবন্ধন-প্রক্রিয়ায় লিঙ্গের ঘরটি নেই, হালনাগাদ সংখ্যা প্রকাশিত হয় না, আর দপ্তরগুলোকে বলা হচ্ছে তালিকাভুক্তি সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে। দাতা সংস্থাকে যে ব্যবস্থাটি “তৈরি হয়ে গেছে” বলে জানানো হয়েছিল, সেটি এখন কোন অবস্থায়- এই প্রশ্নের উত্তর প্রতিবেদন প্রকাশ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
যা মাপা হয় না, তার অগ্রগতিও দাবি করা যায় না। বিপিপিএর হিসাবে দেশের বার্ষিক সরকারি ক্রয়ের আকার এখন প্রায় ৩ হাজার কোটি ডলার, যা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির প্রায় ৮০ শতাংশ।
প্রবেশের চার ধাপ
আন্দরকিল্লার উদ্যোক্তা কাশফিয়া নাহরিন (ছদ্মনাম) পাঁচ বছর ধরে একটি সরবরাহ ও সেবা প্রতিষ্ঠান চালাচ্ছেন, ২০২২ সালে ই-জিপিতে নিবন্ধিতও হয়েছেন। তবু কোটেশন পদ্ধতির (আরএফকিউ) একটি কাজে তিনি অংশ নেওয়ারই সুযোগ পাননি। এপ্রিলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে কোটেশনের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে; তাঁর প্রতিষ্ঠান ওই তালিকায় ছিল না। কীভাবে তালিকাটি তৈরি হয়েছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য তিনি পাননি।
“ই-জিপিতে আমার নিবন্ধন আছে, কাগজপত্রও ঠিক আছে। কিন্তু যে কাজগুলোতে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে বেছে নিয়ে কোটেশন চাওয়া হয়, সেখানে আমার নামই যদি না থাকে, তাহলে আমি প্রতিযোগিতা করব কীভাবে?” বলেন তিনি।
প্রশ্নটি ছোট নয়। এই প্রতিবেদনের হিসাবে নারী-মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৭৬ শতাংশ চুক্তিই এসেছে সীমিত দরপত্র (এলটিএম) বা কোটেশন পদ্ধতিতে, যেখানে দপ্তরের বাছাই করা তালিকায় নাম থাকাই প্রথম শর্ত; আর সেই বাছাইটি অনলাইনে হয় না।
দ্বিতীয় ধাপটি ব্যাংকের। চট্টগ্রামের ঠিকাদার রওশন আক্তারের ট্রেড লাইসেন্স নিতে সমস্যা হয়নি; আটকে গিয়েছিলেন ব্যাংক গ্যারান্টিতে। “দরপত্রে অংশ নিতে যে পরিমাণ টেন্ডার সিকিউরিটি দরকার ছিল, সেটা দেওয়ার মতো টাকা আমার প্রতিষ্ঠানের ছিল। কিন্তু ব্যাংক গ্যারান্টি দিতে গিয়ে ব্যাংক অতিরিক্ত কাগজপত্র চেয়েছে, জামানতের বিষয়েও প্রশ্ন করেছে,” বলেন তিনি। একবার সময়মতো গ্যারান্টি না পাওয়ায় দরপত্রই জমা দিতে পারেননি। প্রথম কাজটি পেতে তাঁকে অংশ নিতে হয়েছে প্রায় আটটি দরপত্রে।
বাধাটি ব্যক্তিগত নয়, কাঠামোগত। নারীর সম্পত্তি-অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করা মহিলা পরিষদের আন্তর্জাতিক উপপরিষদের সদস্য লুনা নূর বলেন, “প্রথাগত ব্যাংকিং ঋণ সুরক্ষার জন্য মূলত বন্ধকের ওপর নির্ভর করে। আমাদের উত্তরাধিকার ও আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার কারণে নারীর নামে জমি, বাড়ি বা ফ্ল্যাটের মতো স্থাবর সম্পত্তির মালিকানা পুরুষের তুলনায় অনেক কম থাকে। বড় অঙ্কের গ্যারান্টি দিতে গেলে ব্যাংক সমমূল্যের বন্ধক চায়, আর তা না থাকায় ব্যাংক অনিরাপদ বোধ করে। অনেক ক্ষেত্রে নারীর নামে সম্পত্তি থাকলেও তার ওপর তাঁর একক ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ থাকে না।”
তৃতীয় ধাপটি দপ্তরের ভেতরের। “ই-জিপিতে দরপত্র অনলাইনে হলেও পুরো প্রক্রিয়াটা অনলাইনে শেষ হয় না। দরপত্র-পূর্ব সভা, কাগজপত্রের বিষয় বা কাজের জায়গা বুঝতে দপ্তরে যেতে হয়,” বলেন রওশন আক্তার। সেখানে পুরুষ ঠিকাদারদের সঙ্গে কর্মকর্তাদের আগে থেকেই পরিচয় থাকে- এমন পরিবেশ তিনি দেখেছেন।
“কেউ আমাকে বাধা দিয়েছে- এমন অভিযোগ করছি না,” বলেন তিনি। “কিন্তু নিয়ম সবার জন্য একই হলেও সেই নিয়মের ভেতরে ঢোকার সক্ষমতা সবার সমান নয়।”
চতুর্থ ধাপটি কোনো নথিতে লেখা নেই। সেটি সময়।
চট্টগ্রামের আরেকজন নারী ঠিকাদার কয়েক বছর সরকারি কাজ পাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। এখন আর করেন না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, “একজন নারী হিসেবে পরিবারের দায়িত্বও সামলাতে হয়। সন্তান, স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়ি- সবকিছু সামলে প্রতিদিন দপ্তরে দপ্তরে যাওয়া, কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা, দরপত্রের খোঁজ নেওয়া- সবসময় সম্ভব হয় না।”
ধাপটি সবার জন্য সমান নয় বলেই তাঁর পর্যবেক্ষণ। “একজন পুরুষ ঠিকাদার হয়তো যখন-তখন অফিসে যেতে পারেন, কিন্তু একজন নারীর জন্য বিষয়টি এত সহজ নয়। পরিবারের দায়িত্বের কারণে অনেক সময় চাইলেও যেতে পারি না।”
প্রশ্নটি তিনি নিজেই তোলেন: “একজন নারী ঠিকাদারকে যদি তাঁর কাজের দক্ষতা ও যোগ্যতা দিয়ে মূল্যায়ন করা হয়, তাহলে তাঁকে কেন এত বেশি সময় দপ্তরমুখী হতে হবে?”
বারবার চেষ্টা করে কাজ না পাওয়ার পর তিনি হাল ছেড়ে দিয়েছেন। “ব্যবসা হিসেবে এটা চালিয়ে যাওয়ার জন্য যে সময়, যোগাযোগ ও উপস্থিতি দরকার, সেটা আমার পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়। শেষ পর্যন্ত কাজ পাওয়ার চেষ্টা করাই ছেড়ে দিয়েছি।”
তাঁর মতে সমাধানও কেবল আলাদা নীতিমালায় নয়। “পুরো প্রক্রিয়াটাই এমন হতে হবে, যাতে একজন নারী তাঁর পারিবারিক দায়িত্বের কারণে পিছিয়ে না পড়েন। যোগ্যতা ও দর যেন মূল বিবেচনা হয়- কার সঙ্গে কার পরিচয় আছে বা কে কত বেশি দপ্তরে যেতে পারছে, সেটা নয়।”
অভিজ্ঞতার শর্ত, ব্যাংকের গ্যারান্টি, দপ্তরের তালিকা আর দপ্তরে হাজিরার সময়- চারটি ধাপের কোনোটিই নারীদের জন্য আলাদাভাবে তৈরি নয়। কিন্তু চারটিই এমনভাবে তৈরি যে আগে থেকে ভেতরে থাকা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সেগুলো পার হওয়া সহজ। আর শেষটির দাম সবচেয়ে বেশি দিতে হয় তাঁকে, যাঁর দিনের একটি বড় অংশ আগে থেকেই বরাদ্দ হয়ে আছে অন্য কারও জন্য। সংরক্ষিত কোটার কাজই ছিল ঠিক এই জায়গাটিতে একটি ফাটল তৈরি করা।
কোটা আছে, অর্জন নেই
সরকারি ক্রয়ে নারীর অংশ কম- সমস্যাটি বাংলাদেশের একার নয়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কেন্দ্রের (আইটিসি) হিসাবে বিশ্বজুড়ে সরকারি ক্রয়ের মাত্র ১ শতাংশ যায় নারী-মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে, অথচ বিশ্বের প্রতি তিনটি প্রতিষ্ঠানের একটির মালিক নারী।
ভারতে ক্ষুদ্র ও অতিক্ষুদ্র শিল্পের জন্য সরকারি ক্রয়ের ২৫ শতাংশ সংরক্ষিত, তার মধ্যে ৩ শতাংশ নারী-মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের জন্য নির্দিষ্ট। কিন্তু ২০২৩-২৪ অর্থবছরে নারী-মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান পেয়েছে চুক্তির প্রায় ১ দশমিক ২৪ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রে নারী-মালিকানাধীন ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য ফেডারেল লক্ষ্যমাত্রা ৫ শতাংশ, যা ১৯৯৪ সালে নির্ধারিত হওয়ার পর তিন দশকে মাত্র দুবার অর্জিত হয়েছে; ২০২৪ অর্থবছরে অর্জন ছিল ৩ দশমিক ৪৪ শতাংশ।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবস্থাটির একটি দিক বাংলাদেশের বর্তমান অচলাবস্থার সঙ্গে সরাসরি প্রাসঙ্গিক: সেখানে নারী-মালিকানার শর্ত (অন্তত ৫১ শতাংশ) যাচাইয়ের জন্য একটি সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা আছে- কেন্দ্রীয় তালিকার জন্য অপেক্ষা করতে হয় না, প্রতিষ্ঠান নিজেই সনদ নেয়।
কোটা আর অর্জনের এই ফারাকের অভিজ্ঞতা দেশেও আছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১০ সালে এসএমই ক্রেডিট পলিসিজ অ্যান্ড প্রোগ্রামস প্রকাশ করে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বরাদ্দের লক্ষ্যমাত্রা ধরে, পরে যা ২০২৪ সালের মধ্যে অন্তত ১৫ শতাংশে উন্নীত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। লক্ষ্যমাত্রাটি আজও অধরা- ২০২৬ সালের মার্চ শেষে নারী উদ্যোক্তাদের বকেয়া ঋণ ২১ হাজার ৬৯২ কোটি টাকা, মোট সিএমএসএমই ঋণের ৭ দশমিক ২৮ শতাংশ। কারণ হিসেবে সেখানে বলা হয়েছে জামানতের শর্ত, ব্যবসার সীমিত আকার ও ব্যাংকিং সেবায় সীমিত প্রবেশাধিকার- ঠিক সেই বাধাগুলো, যেগুলোর কথা রওশন আক্তার ও লুনা নূর বলছিলেন।
তুলনাটি প্রাসঙ্গিক আরেকটি কারণে। ঋণের ক্ষেত্রে অন্তত হিসাবটি রাখা হয়- প্রতি প্রান্তিকে কত শতাংশ গেল, তা প্রকাশিত হয়। সরকারি ক্রয়ে সেই হিসাবটিই নেই।
আর বাংলাদেশের বিধিমালার একটি ফাঁকও চোখে পড়ে। সামাজিক ক্রয় ক্যাটেগরিতে শ্রেণি তিনটি- অতিক্ষুদ্র ও ক্ষুদ্র, নারী-মালিকানাধীন ও নতুন প্রতিষ্ঠান। প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বা আদিবাসী উদ্যোক্তার মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের জন্য আলাদা কোনো উল্লেখ নেই। কেনিয়ায় ২০১৩ সাল থেকে সরকারি ক্রয়ের ৩০ শতাংশ সংরক্ষিত নারী, তরুণ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রতিষ্ঠানের জন্য। ফলে যাঁদের জন্য প্রবেশের বাধা সবচেয়ে বেশি, তাঁদের একটি অংশ বাংলাদেশের এই ব্যবস্থার বাইরেই থেকে যান।
নামের আড়ালের প্রশ্ন
সংরক্ষিত কোটা নিয়ে সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্নটি এসেছে একজন ঠিকাদারের কাছ থেকেই।
রুম্মান সুলতানা এই কোটা ব্যবহার করেন না। “আমি কেন এমনি প্রিভিলেজ নিব?” বলেন তিনি। কিন্তু নারী-মালিকানার অংশ দুই শতাংশেরও কম- এই তথ্য তুলতেই তিনি একটি পর্যবেক্ষণ জানান: “১ পার্সেন্ট নারীর ভিতরে নারীর হাজবেন্ডরাই কাজ করে।”
এটি একজন অভিজ্ঞ ব্যবসায়ীর পর্যবেক্ষণ, নথিভিত্তিক প্রমাণ নয়। এই প্রতিবেদনে কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির দিকে এমন কোনো ইঙ্গিত করা হচ্ছে না এবং এই তিন মাসের ৯৮টি চুক্তির কোনোটির ক্ষেত্রেই ছদ্ম-মালিকানার কোনো প্রমাণ এই অনুসন্ধানে পাওয়া যায়নি।
তবে ব্যবসায়িক নিবন্ধনে এই প্রবণতার একটি পরিমাপ আছে। মাইক্রোসেভ কনসাল্টিংয়ের আট জেলার একটি জরিপে দেখা গেছে, নারীর নামে ট্রেড লাইসেন্স আছে এমন প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৩৩ শতাংশের প্রকৃত মালিক ওই নারী নন; পুরুষের নামে লাইসেন্স থাকা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই হার ১৪ শতাংশ। একই গবেষণা আরেকটি সংখ্যা দেয়, যা এই প্রতিবেদনের ১ দশমিক ৯৮ শতাংশকে প্রেক্ষাপটে বসায়: বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানের মাত্র ১ দশমিক ৭ শতাংশে নারীর সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকানা আছে, যেখানে বৈশ্বিক গড় ১৪ দশমিক ৫ ও দক্ষিণ এশীয় গড় ৯ দশমিক ৬ শতাংশ।
অর্থাৎ সরকারি চুক্তিতে নারীদের অংশ কম হওয়ার একটি বড় কারণ ব্যবসার নিবন্ধনেই নারীর উপস্থিতি কম। কিন্তু সংরক্ষণ ব্যবস্থাটি তৈরিই হয়েছিল এই ভারসাম্যহীনতা ভাঙার জন্য, টিকিয়ে রাখার জন্য নয়।
আর ছদ্ম-মালিকানার প্রশ্নটি সত্যি হলেও তার দায় নারী উদ্যোক্তাদের নয়। কেনিয়ার সংরক্ষণ ব্যবস্থার পর্যালোচনায় দেখা গেছে, প্রভাবশালীরা নারী বা তরুণদের নামে প্রতিষ্ঠান নিবন্ধন করিয়ে সংরক্ষিত কাজ নিয়ে নিয়েছেন, আর যাচাই ব্যবস্থাটি তা ধরতে পারেনি। বাংলাদেশে পিপিআর ২০২৫ প্রকৃত সুবিধাভোগী মালিকের নাম প্রকাশ বাধ্যতামূলক করেছে ঠিক এই কারণেই। কিন্তু নাম প্রকাশ আর নাম যাচাই এক নয়।
বিষয়টি কর্তৃপক্ষের অজানা নয়। খুলনায় নারী ঠিকাদারদের মতামত শুনতে গিয়ে তাঁরা যা শুনেছেন, তা তাৎপর্যপূর্ণ বলে জানান বিপিপিএর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সচিব এস এম মঈন উদ্দীন আহম্মেদ। “কর্মশালায় উপস্থিত কিছু নারী দরদাতা জানান, তাঁরা শুধু স্বামীর নির্দেশে দরপত্রে স্বাক্ষর করতে চান না; বরং নিজেরাই প্রকিউরমেন্ট কার্যক্রম পরিচালনা করতে চান,” বলেন তিনি।
কথাটির দুটি দিক আছে। এক, ছদ্ম-স্বাক্ষরের চর্চা যে আছে, সরকারের ক্রয় কর্তৃপক্ষের কাছেও তার তথ্য আছে। দুই, এবং এটিই বড়- সেই চর্চা থেকে বেরোনোর দাবিটি এসেছে নারীদের কাছ থেকেই। তাঁরা নাম সরিয়ে নিতে চাননি; কাজটি নিজের হাতে চাইছেন।
সংরক্ষিত ক্রয় ঠিক এই দাবিটিকেই ধরার কথা ছিল। কারণ যত দিন প্রকৃত নারী উদ্যোক্তার নিজের নামে কাজ পাওয়ার পথ সরু থাকে, তত দিন নামটি অন্য কারও কাজে লাগানোর প্রণোদনাও টিকে থাকে।
ছদ্ম-মালিকানার চর্চা থাকলে তার সবচেয়ে বড় ক্ষতি প্রকৃত নারী উদ্যোক্তাদেরই। প্রতিটি সন্দেহ শেষ পর্যন্ত এসে পড়ে সেই নারীর ওপর, যিনি নিজের কাজ নিজে করেন- আর যাচাই না করে সন্দেহটি চালু রাখার দায় ব্যবস্থার।
নাহিদা সুলতানার ভাষায়, “আমার সাইটে আমি নিজে দাঁড়াই। তারপরও প্রথম প্রশ্নটা হয়, আপনার হাজব্যান্ড কী করেন।”
কর্তৃপক্ষ যা বলছে
বিপিপিএকে জানতে চাওয়া হয়েছিল চারটি প্রশ্ন: বিধি ৮০(১)(ঘ) প্রয়োগ স্থগিত রাখার কোনো লিখিত সিদ্ধান্ত আছে কি না; সামাজিক ক্রয় ক্যাটেগরির তালিকাভুক্তি ই-জিপিতে কবে নাগাদ শেষ হবে; বিশ্বব্যাংককে ২০২৩ সালে যে পরিবীক্ষণ-ব্যবস্থাটি “তৈরি হয়েছে” বলে জানানো হয়েছিল, সেটি এখন কোন অবস্থায়; এবং অর্থ বিভাগ যে পরিপত্রে ওই বিধির অধীন ক্রয়ের আর্থিক ক্ষমতা অর্পণ করেছে, তার পরও তালিকাভুক্তির অপেক্ষা কেন।
সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সচিব এস এম মঈন উদ্দীন আহম্মেদ বলেন, দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকই নারী, তাই তাঁদের ক্ষমতায়ন ছাড়া সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব নয়; নারীদের সুবিধার্থে পিপিআর ২০২৫-এ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান যুক্ত করা হয়েছে। ই-জিপি নারী উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে বলেও তিনি জানান- দরপত্রে অংশ নিতে এখন আর কোনো অফিসে যেতে হয় না। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের কর্মশালায় নারী দরদাতারা জামানত ছাড়ে বিলম্ব, দলিলের ফি ও ব্যাংক সেবার জটিলতার কথা তুলেছিলেন; বিষয়গুলো বিপিপিএ খতিয়ে দেখবে বলে তিনি তখন আশ্বাস দেন।
চারটি প্রশ্নের সরাসরি উত্তর মেলেনি। তিনি বলেন, “নারী উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি অংশ রাখার কথা নতুন পিপিআরে বলা হয়েছে, এটা পুরোপুরি কার্যকর করার জন্য আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি।”
দাবিটির একটি অংশ এই প্রতিবেদনের তথ্যের সঙ্গে মেলে না। অনলাইনে দরপত্র জমা দেওয়া যায় ঠিকই। কিন্তু যে দুটি পদ্ধতিতে নারী-মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের ৭৬ শতাংশ চুক্তি এসেছে- সীমিত দরপত্র ও কোটেশন- সেখানে অনলাইনে যাওয়ার আগেই দপ্তরের বাছাই করা তালিকায় নাম থাকতে হয়।
আর জামানত, ফি বা হেল্পডেস্ক- এগুলো প্রবেশপথ সহজ করার উপায়। বিধি ৮০(১)(ঘ) কেবল পথ সহজ করেনি, একটি অংশ সংরক্ষিতই করে দিয়েছে। সেই অংশটি নিয়েই প্রশ্নগুলোর উত্তর মেলেনি।
কী করলে বদলাবে
এক, নিবন্ধনের সময়ই মালিকের তথ্য থেকে স্বয়ংক্রিয় শ্রেণিবিন্যাস। সংজ্ঞা যেহেতু বিধিতেই আছে, কেন্দ্রীয় তালিকার অপেক্ষা না করে ই-জিপি নিজেই তা চিহ্নিত করতে পারে। এসএমই ফাউন্ডেশন ইতিমধ্যে বিপিপিএর সঙ্গে যৌথভাবে একটি অভিন্ন জাতীয় নিবন্ধন প্ল্যাটফর্ম তৈরির প্রস্তাব দিয়েছে।
দুই, প্রতিটি দপ্তরের বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনায় ২৫ শতাংশ সংরক্ষণের হিসাব বাধ্যতামূলক করা এবং তা প্রকাশ করা- যেমনটি ঋণের ক্ষেত্রে প্রতি প্রান্তিকে হয়। অর্থ বিভাগের জানুয়ারির পরিপত্রেই বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা বাধ্যতামূলক; সংরক্ষণের হিসাবটি ওই পরিকল্পনারই একটি ঘর হতে পারে।
তিন, কোটেশন ও সীমিত দরপত্রে দপ্তরের বেছে নেওয়া তালিকায় নারী-মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান অন্তর্ভুক্তির শর্ত। নারীদের চুক্তির সিংহভাগই এই দুই পদ্ধতির, অথচ তালিকায় ঢোকার পদ্ধতিটিই সবচেয়ে অস্বচ্ছ।
চার, মৌখিক নির্দেশে বিধি স্থগিত রাখার চর্চা বন্ধ। স্থগিত করতে হলে লিখিত পরিপত্র- কারণ ও সময়সীমাসহ। একই সঙ্গে বিধি ৬৫(৬)-এর প্রয়োগ পরিবীক্ষণ: সীমিত দরপত্রে পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত কার্য ক্রয়ে অতীত অভিজ্ঞতার শর্ত আরোপ করা বিধিমালাতেই বারণ, তবু ওই শর্তেই নতুন প্রতিষ্ঠানগুলো আটকাচ্ছে।
পাঁচ, সামাজিক ক্রয় ক্যাটেগরিতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও আদিবাসী উদ্যোক্তার প্রতিষ্ঠান যুক্ত করা এবং ক্রয়-প্রশিক্ষণে লিঙ্গ-ভারসাম্যের নীতি- বিপিপিএর প্রকাশিত জাতীয় ক্রয়-প্রশিক্ষক তালিকায় ৭৩ জনের মধ্যে নারী মাত্র ছয়জন, ৮ দশমিক ২ শতাংশ। অর্থাৎ যে বিধিমালা নারীদের জন্য অংশ সংরক্ষণ করেছে, ক্রয়কারী কর্মকর্তাদের যাঁরা সেটি বোঝান, তাঁদের ৯২ শতাংশই পুরুষ।
চট্টগ্রাম উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আবিদা সুলতানা বলেন, “২৫ শতাংশের কথা উল্লেখ থাকলেও তা তো হচ্ছে না। সব সরকারি ক্রয়ে শুধু নারী উদ্যোক্তারা বাস্তবে ন্যূনতম ১০ শতাংশ হলেও যেন পায়, সেটা কঠোরভাবে নিশ্চিত করা জরুরি। সরকারি টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার জন্য নারী উদ্যোক্তাদের বিশেষ প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা দেওয়া উচিত। নারীর ক্ষমতায়ন এবং দেশের অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
শেষ পর্যন্ত যা দাঁড়ায়
নাহিদা সুলতানা এখনো সরকারি কোনো কাজ পাননি। তাঁর প্রতিষ্ঠান বেসরকারি খাতেই কাজ করছে, আর তিনি পরের দরপত্রের অপেক্ষায় আছেন।
বিধিটি কার্যকর থাকলে তাঁর ক্ষেত্রে কী বদলাত, সেটি অনুমান নয়- বিধির পাঠেই লেখা আছে। তিনি একক মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের নারী স্বত্বাধিকারী, একই সঙ্গে নতুন প্রতিষ্ঠানও। সংরক্ষিত অংশে ঢোকার জন্য যে দুটি শর্তের যেকোনো একটি লাগত, তাঁর দুটিই আছে। আর যে শর্তটি তাঁকে আটকেছে- আগের সরকারি কাজের অভিজ্ঞতা- বিধি ৬৫(৬) সীমিত দরপত্রে পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত কার্য ক্রয়ে সেটি আরোপ করাই বারণ করেছে।
সংজ্ঞাটি বিধিমালায় লেখা আছে এক বাক্যে: “যেই সকল একক মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী একজন নারী।”
বগুড়ার নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয় ওই এক বাক্য পড়ে তালিকা করতে সময় নিয়েছে দেড় মাস। চট্টগ্রামে সেই তালিকার অপেক্ষা এখনো ফুরায়নি।
পদ্ধতি
এই প্রতিবেদনের সংখ্যাগুলো ই-জিপি পোর্টালে (eprocure.gov.bd) প্রকাশিত চুক্তির নথি থেকে সংগৃহীত। ২০২৬ সালের মার্চ, এপ্রিল ও মে- এই তিন মাসে চট্টগ্রামের ক্রয়কারী দপ্তরগুলোর ২ হাজার ১৮৫টি চুক্তি (মোট মূল্য ১ হাজার ৮৪ কোটি ৫ লাখ টাকা) সংগ্রহ করে একটি ডেটাবেজ তৈরি করা হয়েছে। প্রতিটি চুক্তির লিংক ও আর্কাইভ কপি সংরক্ষিত আছে।
এর মধ্যে যেসব চুক্তিতে প্রকাশিত সুবিধাভোগী মালিক একজন, সেই ১ হাজার ৯৮৫টি চুক্তির মালিকের নাম ধরে লিঙ্গ নির্ধারণ করা হয়েছে সম্মানসূচক উপসর্গ (Md./Mohammad = পুরুষ; Mst./Most./Mosammat/Mrs. = নারী), নাম-উপাদান (Begum, Khatun, Khanam, Nesa, Banu, Sultana, Akter) এবং প্রচলিত নারী-নামের ভিত্তিতে।
সীমাবদ্ধতা: এটি নামভিত্তিক নির্ধারণ, আরজেএসসি নথি বা ট্রেড লাইসেন্স দিয়ে সরাসরি যাচাই নয়। নামভিত্তিক পদ্ধতিতে লিঙ্গ-পরিচয়ের বৈচিত্র্য ধরা পড়ে না; বিধিমালার সংজ্ঞাটিও দ্বৈত কাঠামোতেই লেখা। ২১টি চুক্তির ক্ষেত্রে (২ কোটি ২৯ লাখ টাকা) নাম থেকে লিঙ্গ নির্ধারণ করা যায়নি এবং আরও ৯টির ক্ষেত্রে (৪ কোটি ৯৯ লাখ টাকা) প্রকাশিত সুবিধাভোগী মালিক কোনো ব্যক্তি নন; এই ৩০টি চুক্তি হিসাবের বাইরে রাখা হয়েছে। একাধিক সুবিধাভোগী মালিকের ২০০টি চুক্তিও (৪৪১ কোটি টাকা) বিশ্লেষণের বাইরে, কারণ বিধির সংজ্ঞা অনুযায়ী নারী-মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানকে একক মালিকানাধীন হতে হবে।
বিধির ২৫ শতাংশ সংরক্ষণ হিসাব করা হয় ক্রয়কারী দপ্তরের বার্ষিক পরিচালন বাজেট বরাদ্দের ভিত্তিতে। এই প্রতিবেদনের তিন মাসের চুক্তিমূল্যভিত্তিক তুলনা তাই ইঙ্গিতবাহী, চূড়ান্ত সম্মতি-যাচাই নয়।
বিধিমালার পাঠ যাচাই করা হয়েছে ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখের বাংলাদেশ গেজেটের (অতিরিক্ত) প্রকাশিত পিপিআর ২০২৫ থেকে; বিধি ৬৫(৬), ৬৮(৪), ৮০(১)(ঘ) ও তফসিল-২। সামাজিক ক্রয় ক্যাটেগরির তালিকাসংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তিগুলোর কপি প্রতিবেদকের সংগ্রহে আছে। অর্থ বিভাগের আর্থিক ক্ষমতা অর্পণ সংক্রান্ত পরিপত্র ও সংযোজনী দুটি ছকসহ যাচাই করা হয়েছে মূল পরিপত্রের অনুলিপি থেকে।
সাক্ষাৎকার দেওয়া উদ্যোক্তাদের প্রত্যেককে প্রতিবেদনের বিষয়বস্তু ও সম্ভাব্য ফলাফল জানিয়ে সম্মতি নেওয়া হয়েছে। ব্যবসায়িক ঝুঁকি ও পারিবারিক গোপনীয়তার কারণ বিবেচনায় দুজনের পরিচয় গোপন রাখা হয়েছে- একজনের ক্ষেত্রে ছদ্মনাম ব্যবহার করা হয়েছে, আরেকজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেছেন। দুজনের পরিচয়ই প্রতিবেদকের কাছে যাচাই করা আছে।