সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

বাছুর রেখে গর্ভবতী গাভী জবাই করল দুর্বৃত্তরা

এম মোয়াজ্জেম হোসেন কায়সার | প্রকাশিতঃ ২১ জুলাই ২০২৬ | ২:৩২ অপরাহ্ন


গোয়ালঘরের কোণে চুপচাপ বসে আছে ছোট্ট বাছুরটি। বারবার তাকাচ্ছে দরজার দিকে, যেন অপেক্ষা করছে মায়ের ফিরে আসার। কিন্তু যে মা প্রতি রাতে তাকে আগলে রাখত, সেই মা আর কখনো ফিরবে না। রাতের অন্ধকারে দুর্বৃত্তরা কেড়ে নিয়েছে তার মাকে- আর তার সঙ্গে কেড়ে নিয়েছে আরেকটি প্রাণও, যে প্রাণ তখনো পৃথিবীর আলো দেখেনি।

চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় এক দিনমজুরের গোয়ালঘর থেকে পাঁচ মাসের গর্ভবতী একটি গাভী চুরি করে নিয়ে জবাই করেছে দুর্বৃত্তরা। একটি নয়, দুটি প্রাণ কেড়ে নেওয়া এই নিষ্ঠুরতার সবচেয়ে করুণ দিক হলো- গাভীটির পেটে তখন বেড়ে উঠছিল আরেকটি নতুন প্রাণ, যে কখনো পৃথিবীর মুখ দেখার সুযোগই পেল না। আর গোয়ালঘরে ফেলে রাখা হয়েছে তারই আরেক সন্তান, সদ্য দুধ ছাড়া এক বাছুরকে- যে এখন মাতৃহারা, দিশাহারা।

মঙ্গলবার (২১ জুলাই) উপজেলার লালানগর ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ঘাগড়া খিল মোগল ডাবাইয়াপাড়া এলাকায় এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে।

ভুক্তভোগী দিনমজুর মো. মাহবুব (৪০) ওই এলাকার বাসিন্দা আবদুল খালেক ওরফে খালেক হাজীর ছেলে। তিনি জানান, সোমবার রাত ৯টার দিকে সর্বশেষ গোয়ালঘরে গাভী আর তার বাছুরকে একসঙ্গে দেখেছিলেন তিনি—মা যেমন করে জিভ দিয়ে চেটে দিচ্ছিল বাছুরের গা, সেই দৃশ্যটাই ছিল শেষ স্বাভাবিক রাত। পরদিন ভোরে গোয়ালঘরে গিয়ে তিনি দেখেন এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য- বাছুরটি একা দাঁড়িয়ে, ভীত-সন্ত্রস্ত, মা গাভীর কোনো চিহ্ন নেই কোথাও।

খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে স্থানীয়দের মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন, কাছাকাছি এক নির্জন সড়কে একটি গাভী জবাই করে মাংস নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ঘটনাস্থলটি লালানগর ইউনিয়নের সিকদারপাড়া থেকে ইউনিয়ন পরিষদে যাওয়ার বিকল্প সড়ক এবং দক্ষিণ রাজানগর ও লালানগর ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী চতুজ্জেপাড়ার মুখে অবস্থিত।

সেখানে ছুটে গিয়ে মাহবুব দেখতে পান, দুর্বৃত্তরা ফেলে রেখে গেছে গাভীর লেজ, নাড়িভুঁড়ি ও শরীরের কিছু অবশিষ্টাংশ। এই চিহ্নগুলো দেখেই বুকটা ধক করে ওঠে তাঁর- নিশ্চিত হন, এটাই তাঁর সেই আদরের গাভী, যাকে তিনি নিজের সন্তানের মতো লালন করেছিলেন।

মো. মাহবুব জানান, কৃষিকাজ ও দিনমজুরের কাজ করেই তাঁর সংসার চলে। অনেক যত্নে পালা গাভীটির আনুমানিক মূল্য ছিল ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা। কিন্তু শুধু টাকার অঙ্কে এই ক্ষতি মাপা যায় না- আসছে কয়েক মাসেই যে নতুন বাছুরটি জন্ম নেওয়ার কথা ছিল, সেই সম্ভাবনাও এক রাতেই নিভে গেছে চিরতরে। কারও সঙ্গে তাঁর কোনো শত্রুতা নেই বলেও জানান তিনি, তাই কে বা কারা এই নির্মম কাজ করল, তা এখনো তাঁর কাছে এক অমীমাংসিত প্রশ্ন।

মাহবুবের স্ত্রী কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, সংসার চালাতে গিয়ে তাঁদের প্রায়ই ধারদেনা করতে হয়। কিছুটা স্বাবলম্বী হওয়ার আশায় এবং সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ জোগাতেই তাঁরা গাভীটি পালছিলেন- আসন্ন বাছুরটিকে ঘিরে বুনেছিলেন নতুন স্বপ্নও। তাঁদের ১০, ১২ ও ১৫ বছর বয়সী তিন ছেলে রয়েছে, যাদের দুজন স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় এবং বড় ছেলে অন্য একটি মাদ্রাসায় পড়াশোনা করছে। এখন গোয়ালঘরে যে ছোট্ট বাছুরটি একা দাঁড়িয়ে ডেকে চলেছে মায়ের খোঁজে, তাকে সামলানোই এখন পরিবারটির জন্য নতুন এক দুশ্চিন্তা।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, মো. মাহবুব অত্যন্ত অসহায় একজন মানুষ, যিনি যা কাজ পান তা করেই কোনোরকমে জীবিকা নির্বাহ করেন। স্থানীয় ইউপি সদস্য আবুল কালাম তালুকদার ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ঘটনাটি খুবই মর্মান্তিক এবং মো. মাহবুব একজন অসহায় দিনমজুর।

একটি গাভী শুধু পশু নয়- এই পরিবারের কাছে ছিল ভবিষ্যতের ভরসা, সন্তানদের স্বপ্নপূরণের সঙ্গী, আর আসছে দিনের নতুন এক প্রাণের প্রতীক্ষা। এক রাতের নিষ্ঠুরতায় সেই ভরসা, সেই প্রতীক্ষা- সবই এখন শুধুই স্মৃতি। আর গোয়ালঘরের কোণে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট, মাতৃহারা বাছুরটি যেন নীরবে বলে যাচ্ছে সেই না-বলা কষ্টের কথা।