
গোঁফ কেটে ফেলেছিলেন। চেহারা বদলানোর চেষ্টা করেছিলেন। রাতের আঁধারে কালো প্রাইভেটকারে চেপে যশোর সীমান্তের দিকে ছুটছিলেন— লক্ষ্য ভারতে পালিয়ে যাওয়া। কিন্তু গোপন তথ্য আগেই পৌঁছে গিয়েছিল পুলিশের কাছে। মঙ্গলবার রাতে যশোর-নড়াইল মহাসড়কের ঝুমঝুমপুর এলাকায় সন্দেহজনক গাড়ি দেখে তল্লাশি চালায় পুলিশ। গোঁফ না থাকলেও জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে আর লুকানো গেল না। তিনি স্বীকার করেন, তিনি চট্টগ্রামের আলোচিত শীর্ষ সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমন। তাঁর বাবার নাম মো. মুসা, বাড়ি চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর এলাকায়।
যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মিরাজুল ইসলামের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল অভিযান চালিয়ে ইমনসহ তাঁর তিন সহযোগীকে গ্রেপ্তার করে। যশোরের পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম জানান, ডেভিড ইমন ভারতে পালানোর চেষ্টা করছেন— এমন তথ্যের ভিত্তিতে রাত তিনটার দিকে সন্দেহজনক প্রাইভেটকার তল্লাশি করে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। মূলত চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ ও যশোর পুলিশের সমন্বিত অভিযানে এই গ্রেপ্তার সম্পন্ন হয়।
জানা যায়, বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের অন্যতম সহযোগী এই ইমন। চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক নাজিমুল হক জানান, সন্ত্রাসী ইমন চার দিন আগে যশোর সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে দেশে ঢোকেন। পুলিশের অভিযানের তথ্য পেয়ে তিনি আবার ভারতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। নাজিমুল হক আরও উল্লেখ করেন যে ইমন প্রায়ই আসা-যাওয়া করেন এবং তাঁর কাছে দুটি দেশি-বিদেশি পাসপোর্ট রয়েছে।
পুলিশ সূত্র জানায়, সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদ বর্তমানে ভারতে রয়েছেন এবং ইমন সেখানে তাঁর সঙ্গেই থাকতেন। দেশে এই সন্ত্রাসী দলটির নেতৃত্ব দিতেন সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ। তিনি কারাগারে যাওয়ার পর থেকে ইমন এবং তাঁর আরেক সহযোগী মো. রায়হান চট্টগ্রামে বড় সাজ্জাদের হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ও চাঁদাবাজির চক্র সচল রাখার নেতৃত্ব দিচ্ছেন। পুলিশের দাবি, বড় সাজ্জাদের বাহিনীতে অন্তত ৫০ জন শুটার ও সহযোগী সক্রিয় রয়েছেন।
চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ডে মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমনের নাম মানেই আতঙ্ক। আগের রেকর্ডে সাতটি মামলা থাকলেও সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী তাঁর বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে অন্তত ১৫টি। ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ বাকলিয়া এলাকার জোড়া খুন এবং একই বছরের ২৩ মে রাতে নগরের পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকায় সন্ত্রাসী ঢাকাইয়া আকবর হত্যাসহ বিভিন্ন গুরুতর অভিযোগে এসব মামলা করা হয়েছে।
পুলিশের ভাষ্যমতে, ইমন ১৫ থেকে ২০টি আগ্নেয়াস্ত্র বহন করেছেন এবং অস্ত্র ব্যবহারে তিনি অত্যন্ত দক্ষ। বাকলিয়ার জোড়া খুনের ঘটনায় সন্ত্রাসী ও মোটরসাইকেল ভাড়া করার দায়িত্বও তাঁর ওপর ছিল। এছাড়া ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানে কোটি টাকা চাঁদা দাবির মামলাও তাঁর নামে ঝুলছে।
অন্যদিকে, সাজ্জাদ আলীর আরেক সহযোগী মো. রায়হানকে ধরতেও মঙ্গলবার রাতে নোয়াখালীতে অভিযান চালানো হয়েছে। চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলম জানান, নোয়াখালীর সেনবাগ এলাকার একটি বাড়িতে ওই অভিযান চালানো হয়। তবে পুলিশ যাওয়ার আগেই বাড়ির দেয়াল টপকে মো. রায়হান পালিয়ে যান। তাঁকে ধরতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
চট্টগ্রামের যে মানুষটি বছরের পর বছর আতঙ্ক ছড়িয়ে বেড়িয়েছেন, অবশেষে সীমান্ত পার হওয়ার আগেই তাঁকে থামানো গেছে। গোঁফ কাটলেই পরিচয় মেলে না— এটি মিথ্যা প্রমাণ হলো আরেকবার।