
রাত তখন প্রায় ১টা। জামালখান লেনের বাসিন্দা শাহিদা আক্তার জেগে আছেন চুলার পাশে, অপেক্ষায়—কখন গ্যাসের চাপ একটু বাড়বে, কখন রান্না করে রাখা যাবে পরদিনের নাশতা। কিন্তু ভাগ্য সহায় হয় না প্রতিদিন। তিনি বলেন, “গত এক সপ্তাহ ধরে সকাল ১০টার পর থেকে গ্যাস থাকছে না। কিন্তু আজ সকাল ৭টাতেই গ্যাস চলে গেছে। নাশতা না খাইয়ে সন্তানকে কীভাবে স্কুলে পাঠাব? একবার সকালে গ্যাস গেলে বিকেল ৩টার আগে আর আসে না। আবার ৫টায় গিয়ে রাত ১২টার দিকে টিমটিম করে জ্বলে।” শাহিদার এই রাত জাগার গল্প আসলে একার নয়- চট্টগ্রাম নগরীর লক্ষ লক্ষ পরিবারের দৈনন্দিন বাস্তবতা এখন এমনই বিপর্যস্ত।
সিএনজি লাইনে রাত কাটছে চালক-যাত্রীদের
সোমবার নগরের অক্সিজেন, বহদ্দারহাট, আগ্রাবাদ, কর্ণফুলী, হালিশহর, বাকলিয়া, চান্দগাঁও, পতেঙ্গাসহ বিভিন্ন এলাকার সিএনজি ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ পাম্পে গভীর রাত থেকেই গাড়ির দীর্ঘ সারি। অনেক চালক সকাল কিংবা দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা করেও গ্যাস পাচ্ছেন না। রাতভর লাইনে দাঁড়িয়ে সিএনজি ফিলিং স্টেশন থেকে মিলছে মাত্র ২০০-৩০০ টাকার গ্যাস।
সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালক সুমন বলেন, “অক্সিজেনের একটি ফিলিং স্টেশনে সারারাত লাইনে দাঁড়িয়ে সকালে মাত্র ৩০০ টাকার গ্যাস পেয়েছি। এই গ্যাস দিয়ে গাড়ি চালিয়ে মালিকের জমাও উঠানো যাবে না।”
এই সংকটের প্রভাব পড়েছে সড়কেও। গ্যাস সংকটের কারণে সড়কে অর্ধেকেরও বেশি সিএনজিচালিত যানবাহন নামতে পারেনি বলে দাবি পরিবহন সংশ্লিষ্টদের। ফলে সকাল থেকেই নগরের বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ড ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে যাত্রীদের দীর্ঘ অপেক্ষা করতে দেখা যায়। অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী ও রোগীদের দুর্ভোগ ছিল সবচেয়ে বেশি। যানবাহন সংকটের এই সুযোগে নগরীতে গণপরিবহনে দ্বিগুণ-তিনগুণ ভাড়া আদায়ের অভিযোগও উঠেছে।
ষোলশহর ২ নম্বর গেইট থেকে নিউমার্কেটগামী যাত্রী, বেসরকারি স্কুলের শিক্ষক ফাতেমা বেগম বলেন, “এক ঘণ্টার বেশি অপেক্ষা করেও কোনো খালি সিএনজি অটোরিকশা পাইনি। শেষ পর্যন্ত কিছুদূর টেম্পুতে, কিছুদূর রিকশায় করে এসেছি। অফিসে দেরি হয়ে গেছে।”
আগ্রাবাদ মোড়ে কথা হয় শিক্ষার্থী রইসুলের সঙ্গে। বাসে অতিরিক্ত ভিড় থাকায় জাকির হোসেন সড়কের এমইএস কলেজে যাওয়ার জন্য শেষ পর্যন্ত ১৫০ টাকা ভাড়া দিয়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় উঠতে হয় তাকে।
রান্নাঘরে অন্ধকার, ভরসা এখন হোটেলের খাবার
গ্যাস সংকটের ধাক্কা সবচেয়ে বেশি লেগেছে আবাসিক এলাকায়। নগরীর অসংখ্য বাসাবাড়িতে দিনের বেশিরভাগ সময় গ্যাস না থাকায় বন্ধ রান্না। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে হোটেলের খাবারের ওপর নির্ভর করছে।
বহদ্দারহাটের বাসিন্দা রহিমা বেগম বলেন, “দুই দিন ধরে বাসায় গ্যাস নেই। বাচ্চাদের নিয়ে খুব কষ্টে আছি। হোটেল থেকে খাবার কিনে খেতে হচ্ছে।” আসকার দিঘির পাড় এলাকার বাসিন্দা নাজনীন সুলতানার অভিজ্ঞতাও একই রকম। তিনি বলেন, “রাত ১২টার আগে আমরা রান্না করতে পারি না। দুপুরের খাবার রেস্তোরাঁ থেকে কিনে আনতে হচ্ছে।”
এই সংকটে অবশ্য লাভবান হচ্ছে কিছু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। হালিশহর বড়পোল এলাকার এক রেস্টুরেন্ট কর্মী বলেন, “গ্যাস সংকটের কারণে বাসাবাড়িতে রান্না কম হচ্ছে, তাতে আমাদের দোকানে বিক্রি বেড়ে গেছে।” আগ্রাবাদ, হালিশহর, পতেঙ্গা, চান্দগাঁও, পাঁচলাইশ, মুরাদপুর, বাকলিয়া, চকবাজার, বহদ্দারহাট, অক্সিজেন ও ষোলশহরসহ নগরীর অন্যান্য এলাকার বাসিন্দাদেরও একই দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। শুধু আবাসিক নয়, ছোট ব্যবসা ও শিল্পকারখানার কার্যক্রমও গ্যাস সংকটে ব্যাহত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (কেজিডিসিএল) তথ্য অনুযায়ী, দৈনিক প্রায় ৩৫ কোটি ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে রোববার সরবরাহ পাওয়া গেছে মাত্র ১৯ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ চাহিদার প্রায় অর্ধেকেরও কম গ্যাস পাচ্ছে নগরী, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে আবাসিক, শিল্প ও সিএনজি খাতে। সরবরাহ কমে যাওয়ায় আবাসিক, ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং শিল্প খাতে গ্যাসের চাপ কমাতে বাধ্য হয়েছে কেজিডিসিএল।
মহেশখালীর অগ্নিকাণ্ডই কি এই সংকটের মূল কারণ
জানা যায়, কক্সবাজারের মহেশখালীতে গত ২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত একটি এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়। কেজিডিসিএলের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে (এফএসআরইউ) আগুন লাগার পর থেকেই এই সংকট শুরু হয়। ওই ঘটনার পর গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে। বর্তমানে বিকল্প টার্মিনাল থেকে সরবরাহ অব্যাহত থাকলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে কেজিডিসিএলের উপমহাব্যবস্থাপক (ডিস্ট্রিবিউশন) রফিক খান জানান, গত ১০ দিন ধরেই এই সংকট চলছে, তবে ছুটির দিনে পরিস্থিতি আরও খারাপ আকার ধারণ করেছে। তিনি বলেন, “শনিবার রাত থেকে গ্যাসের চাপ অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়ায় চট্টগ্রামের প্রায় সব অংশেই সংকট তীব্র হয়েছে। পরিস্থিতি দ্রুত সমাধানের জন্য আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি।”
তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—একটি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের কারণে পুরো একটি বন্দরনগরীর জনজীবন কতদিন এভাবে অচল থাকবে? বিকল্প ব্যবস্থাপনায় কেন এই ঘাটতি এতটা দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে, আর কর্তৃপক্ষের “ঊর্ধ্বতন মহলের সঙ্গে যোগাযোগ” শেষ পর্যন্ত কবে নাগাদ বাস্তব সমাধানে রূপ নেবে- শাহিদার মতো লক্ষ চট্টগ্রামবাসী এখন সেই উত্তরেরই অপেক্ষায়।