সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

দুর্গম থানচি বদলে দেওয়া একজন ইউএনও

জোবায়েদ ইবনে শাহাদাত | প্রকাশিতঃ ৮ অগাস্ট ২০২৬ | ৩:১৫ অপরাহ্ন

বান্দরবানের থানচির তিন্দু নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বামং খিয়াং মিংলেন প্রতিদিন ভোরে বেরিয়ে পড়েন। গন্তব্য নদী। সেখানে নিজেই বোটের হ্যান্ডেল ধরেন। পর্যটক ও যাত্রী পরিবহন করেন। উপার্জিত সেই টাকাতেই চলে তাঁর বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন, চলে প্রতিষ্ঠানের খরচ। বিদ্যুৎ নেই, মোবাইল নেটওয়ার্ক নেই, পাকা রাস্তা নেই- তবু এই দুর্গম পাহাড়ে শিক্ষার আলো জ্বলছে। আর এই অভিনব উদ্যোগের নেপথ্যে রয়েছেন একজন মানুষ- থানচি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আব্দুল্লাহ আল ফয়সাল।

তিন্দু ও রেমাক্রি- দুটি ইউনিয়নের কথা অনেকেই জানতেন না। বিদ্যুৎ নেই, মোবাইল নেটওয়ার্ক নেই, সমতলের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ নেই। ঢাকা থেকে এখানে আসতে হলে প্রথমে বান্দরবান, তারপর থানচি, তারপর নদীপথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। এই দূরত্বই বলে দেয়, এখানে কাজ করা মানে শুধু চাকরি নয়- এটা একটা প্রতিশ্রুতি।

পোস্টিং নিজেই চেয়ে নিয়েছেন, দরজা সবার জন্য খোলা

অনেক সরকারি কর্মকর্তা অনুন্নত এলাকায় বদলি হতে চান না। ফয়সাল ব্যতিক্রম। খুলনা, হাইমচর, রাজশাহী পেরিয়ে পাহাড়ে আসার সুপ্ত বাসনা ছিল তাঁর। নিজেই আবেদন করে থানচিতে পোস্টিং নিয়েছেন। প্রায় দেড় বছর আগে যোগ দিয়েছেন। এই দেড় বছরে হেঁটেছেন মাইলের পর মাইল, ঢুকেছেন প্রতিটি পাড়ায়, শিখেছেন স্থানীয়দের ভাষা।

ম্রো, মারমা, বম- পাহাড়ের নানা জনগোষ্ঠীর নানা ভাষা। একজন সরকারি কর্মকর্তার জন্য এত ভাষা শেখা প্রায় অসম্ভব মনে হয়। কিন্তু ফয়সাল অন্তত কিছুটা হলেও প্রতিটি সম্প্রদায়ের ভাষার কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। একজন মানুষ যখন তার নিজের ভাষায় কথা শোনে, তখন দূরত্ব ঘুচে যায়, তৈরি হয় আস্থার সেতু। ফয়সাল সেই সেতুটাই গড়তে চেয়েছেন।

তাঁর কার্যালয় বা বাংলোতে যে কেউ সহজেই যেতে পারেন। সমস্যা নিয়ে এলেই সমাধান মেলে। স্থানীয়দের মাঝে একটি কথা প্রচলিত হয়ে গেছে- “সমস্যা হলেই ইউএনওর কাছে গিয়ে চা খেতে খেতে সমাধান হয়ে যায়।”

বোট দিলেন বিদ্যালয়কে, গাড়ি দিলেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে

তিন্দু নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বামং খিয়াং মিংলেন একদিন এলেন ইউএনওর কাছে। বেঞ্চের সংকট, হোস্টেল সংস্কার, শিক্ষকদের বেতন- সমস্যার তালিকা দীর্ঘ। ইউএনও তাৎক্ষণিক সমাধান করলেন, কিন্তু থামলেন না। ভাবলেন দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের কথা।

দুর্গম এসব এলাকায় যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম বোট। তিন্দু ও রেমাক্রি নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়কে চারটি করে বোট দিল উপজেলা প্রশাসন। পর্যটক ও যাত্রী পরিবহন করে সেই বোট থেকে আসা আয়েই চলে বিদ্যালয়ের খরচ। মাঝির বেতনে টাকা চলে যাচ্ছিল দেখে প্রধান শিক্ষক নিজেই বোট চালানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। এই দৃশ্য সবার নজর কাড়ল, পৌঁছাল প্রধানমন্ত্রীর কাছেও। বিদ্যালয়টি জাতীয়করণ হলো।

এই সাফল্যের পর রেমাক্রি নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ও একই পদ্ধতিতে চলছে। দুটি বিদ্যালয় মিলিয়ে এখন কয়েকশো শিক্ষার্থী পড়ছে, যাদের অনেকেই প্রথম প্রজন্মের শিক্ষার্থী। অর্থাৎ তাদের বাবা-মা কেউই স্কুলে যাননি। এই শিশুদের মুখে পড়ার আলো দেখলে বোঝা যায়, একটি বোট কতটা বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

শুধু বোট নয়, থানচি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও বলিপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের জন্য দুটি গাড়িও দিয়েছেন ইউএনও ফয়সাল। শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের দুর্ভোগ কমল, বিদ্যালয়ও আর্থিকভাবে শক্তিশালী হলো।

পর্যটনে শৃঙ্খলা, পানির সংকটে উদ্ভাবন

তিন্দু, রাজাপথর, রেমাক্রি, নাফাখুম- এই নামগুলো পর্যটকদের কাছে স্বপ্নের গন্তব্য। প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ আসেন। কিন্তু বোট মালিকদের সিন্ডিকেট, গাইডের অভাব, নেটওয়ার্ক না থাকায় ভোগান্তি- এই সমস্যাগুলো পর্যটকদের তাড়া করত। ফয়সাল একে একে সমাধান করলেন। দেড়শো অভিজ্ঞ গাইডকে ট্রেনিং দিয়ে নির্দিষ্ট পোশাক ও আইডি কার্ড দেওয়া হলো। বোটগুলো রেজিস্ট্রেশনের আওতায় আনা হলো, সিরিয়াল মেনে চলতে শুরু করল। বাড়তি ভাড়ার অভিযোগ বন্ধ হলো।

স্থানীয় গাইড মংসাথোয়াই মারমা জানান, আগে পর্যটকরা এলে অনেক ঝামেলায় পড়তেন। কে আসল গাইড, কে নয়- বোঝার উপায় ছিল না। এখন পোশাক ও আইডি কার্ড দেখেই পর্যটকরা বুঝতে পারেন। এই পরিবর্তনে আমাদের আয়ও বেড়েছে, সম্মানও বেড়েছে।

আগামীতে ঘাট ও গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় স্টারলিংক ইন্টারনেট, হেল্পডেস্ক এবং পর্যটকদের অনলাইন রেজিস্ট্রেশনের পরিকল্পনাও চলছে।

পাহাড়ের খাঁজে পানির সংকট মেটাতে চালু হয়েছে গ্র্যাভিটেশনাল ফ্লো সিস্টেম। উঁচু পাহাড় থেকে মাধ্যাকর্ষণ শক্তি ব্যবহার করে পানি নামিয়ে আনা হচ্ছে পাড়ায় পাড়ায়। কাজটা সহজ নয়- জুম চাষের আগে পাহাড় পোড়ানোয় লাইন কাটে, মেরামত করতে হয় বারবার। তবু থামেননি ফয়সাল।

এখন পর্যন্ত ১৫টিরও বেশি পাড়ায় জিএফএস লাইন পৌঁছে গেছে। যেসব পাড়ার মানুষ একসময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা হেঁটে পাহাড়ের ঝরনা থেকে পানি আনতেন, তারা এখন বাড়ির কাছেই পরিষ্কার পানি পাচ্ছেন। একটি ছোট পাইপলাইন কীভাবে একটি পরিবারের দৈনন্দিন জীবন বদলে দিতে পারে, তিন্দু-রেমাক্রি সেটার জীবন্ত উদাহরণ।

বুয়েট থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে ২০১৮ সালে প্রজাতন্ত্রের সেবায় যোগ দেওয়া এই মানুষটি সামাজিক মাধ্যমে নেই। ফেসবুক-ইনস্টাগ্রাম নয়, তাঁর সঙ্গী কয়েক হাজার বই। সমস্যা এলে বইয়ের মধ্যেই খোঁজেন সমাধান।

ফয়সাল বলেন, “আমি মনে করি সত্যিকারের উন্নয়ন মানে শুধু রাস্তা বা ব্রিজ নয়। উন্নয়ন মানে মানুষের জীবন বদলানো। এখানে প্রতিটি সমস্যা সমাধান করলে মানুষের চোখে যে কৃতজ্ঞতার আলো দেখা যায়, সেটাই আমার সবচেয়ে বড় পুরস্কার।” ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামে না থেকেও তিনি প্রমাণ করছেন, প্রচার ছাড়াও মানুষের মন জয় করা যায়- শুধু দরকার আন্তরিকতা আর সদিচ্ছা।

কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের ছেলে, বাবার কাছ থেকে পেয়েছেন সততা আর শৃঙ্খলার পাঠ। কর্মজীবনের শেষ দিন পর্যন্ত পিছিয়ে পড়া মানুষদের নিয়ে কাজ করতে চান তিনি।

তিন্দুর পাহাড়ে এখন একটু বেশি আলো। প্রধান শিক্ষক বোট চালান, শিশুরা স্কুলে যায়, পর্যটকরা নিরাপদে ঘোরেন, পাড়ায় পাড়ায় পানি পৌঁছায়। এই পরিবর্তনের গল্পটা একজন ইউএনওর- যিনি নিজেই চেয়ে এসেছেন দুর্গম এই পাহাড়ে।