
ফলাফলের দিন সকালে পারজানা আক্তারের বুকে ছিল অদ্ভুত এক মিশ্র অনুভূতি। পাস করবে সে জানত, কিন্তু গোল্ডেন জিপিএ-৫ পাবে কিনা- সেই ভয়টা মাথায় ঘুরছিল। তারপর স্যারের পাঠানো রেজাল্ট শীট এলো ফোনে। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না সে। বারবার দেখল। হ্যাঁ, ঠিকই দেখছে। গোল্ডেন জিপিএ-৫।
চোখ ছলছল করে উঠল। তবে এবার কান্না দুঃখের নয়- এ কান্না বছরের পর বছরের পরিশ্রম, ত্যাগ আর স্বপ্নের সার্থকতার।
দারিদ্র্য ছিল সঙ্গী, কিন্তু হার মানেনি
সীতাকুণ্ডের একটি দরিদ্র কৃষক পরিবারের মেয়ে পারজানা। বাবা নুরুল ইসলামের কষ্টের সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরায়। স্কুলের মাসিক বেতন মেটাতেও প্রতিমাসে হিমশিম খেতে হতো তাঁকে। নামীদামি কোচিং বা প্রাইভেট পড়া- এসব পারজানার জন্য ছিল বিলাসিতা।
কিন্তু পারজানা থামেনি। ঝড় হোক বা ভারী বৃষ্টি- ক্লাস মিস হয়নি কখনো। ক্লাস শেষে পড়া লিখে নিয়ে পায়ে হেঁটে বাড়ি ফিরত। কঠিন কোনো বিষয় আটকে গেলে ছুটে যেত শিক্ষকের কাছে। কোচিংয়ের টাকা ছিল না, কিন্তু মনোযোগের কোনো ঘাটতি ছিল না।
নবম শ্রেণিতে উঠে বিজ্ঞান বিভাগ নিতে একটু ভয় পেয়েছিল সে। জটিল বিষয়গুলো সামলাতে পারবে কিনা- সেই দ্বিধা ছিল। কিন্তু বড় ভাই এম কে মনির পাশে দাঁড়ালেন। সাংবাদিক এই ভাইয়ের উৎসাহেই পারজানা বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হলো। সেই ভরসাটাই হয়ে উঠল তার সবচেয়ে বড় শক্তি।
শিক্ষকরা বলছেন অন্যদের জন্য উদাহরণ
সীতাকুণ্ড বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক গোলাম রাব্বানি বলেন, পারজানা ছিল ক্লাসের সবচেয়ে দায়িত্বশীল ও নিয়মিত শিক্ষার্থী। পড়ালেখায় আন্তরিকতা আর শিষ্টাচারের কারণে শিক্ষক-সহপাঠী সবার কাছেই সে ছিল প্রিয়।
প্রধান শিক্ষক দিদারুল আলম বললেন সহজ কথা, “ক্লাসে মনোযোগী হলে এবং শিক্ষকদের কথা শুনলে ভালো ফলাফল অনিবার্য- পারজানা তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ।”
এর আগে জেএসসিতেও পারজানা জিপিএ-৫ পেয়েছিল। বিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও সে ছিল সবার আগে। পড়ার বাইরেও এই মেয়েটি ছিল পরিপূর্ণ।
পারজানার বাবা-মা জানালেন, মেয়ের একটাই স্বপ্ন- এমবিবিএস ডাক্তার হয়ে সমাজের অবহেলিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো। বাবা-মায়ের ত্যাগকে সার্থক করা।
কোচিং ছাড়া, প্রাইভেট ছাড়া, কেবল পরিশ্রম আর মনোযোগ নিয়ে পারজানা যা করেছে- সেটা শুধু তার পরিবারের নয়, পুরো সীতাকুণ্ডের গর্বের গল্প। দারিদ্র্য যে স্বপ্নের পথ আটকাতে পারে না, পারজানা আরেকবার সেটা প্রমাণ করল।