
এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে এবার চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে শুধু পাসের হারই কমেনি, কমেছে ভালো ফল করা শিক্ষার্থীর সংখ্যাও। পাস করা শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ জিপিএ ৩-এর নিচে থাকায় উচ্চ মাধ্যমিকে প্রবেশের আগে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
শিক্ষা বোর্ডের ফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চট্টগ্রামসহ দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডে এবার পাস করা শিক্ষার্থীদের অর্ধেকের বেশি জিপিএ ৩-এর নিচে পেয়েছে। শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর পেছনে গ্রাম-শহরের শিক্ষাবৈষম্য, মানসম্মত শিক্ষকের সংকট, ইংরেজি ও গণিতে দুর্বলতা এবং আর্থসামাজিক বাস্তবতার বড় প্রভাব রয়েছে।
গত সোমবার প্রকাশিত এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল অনুযায়ী, এবার ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়। এর মধ্যে পাস করেছে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন। ফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, পাস করা শিক্ষার্থীদের ৫০ দশমিক ৩৪ শতাংশ জিপিএ ৩-এর নিচে পেয়েছে।
অন্যদিকে, জিপিএ ৪-এর নিচে পেয়েছে ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৫২৩ জন শিক্ষার্থী। অর্থাৎ পাস করা শিক্ষার্থীদের প্রায় ৬০ শতাংশের ফল জিপিএ ৪-এর নিচে। জিপিএ ৪ বা তার বেশি পেয়েছে ৪ লাখ ৬০ হাজার ৩৫৪ জন।
চট্টগ্রামেও কমেছে জিপিএ-৫
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডেও এবার ভালো ফলের সূচকে নেতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। বোর্ডে পাসের হার নেমে এসেছে ৫৯ দশমিক ৪৮ শতাংশে, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে অন্যতম কম।
একই সঙ্গে জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমেছে। সারা দেশে এবার জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে পেয়েছে ১ লাখ ৬ হাজার ৯ জন।
গত চার বছরের হিসাবেও জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে কমছে। ২০২২ সালে যেখানে জিপিএ-৫ পেয়েছিল ২ লাখ ৬৯ হাজার ৬০২ জন, সেখানে ২০২৬ সালে তা নেমে এসেছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জনে।
শিক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, শুধু জিপিএ-৫ কমে যাওয়া নয়, পাস করা শিক্ষার্থীদের বড় অংশের কম জিপিএ পাওয়াও শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করছে।
ইংরেজি ও গণিতে দুর্বলতা বড় কারণ
শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, ইংরেজি ও গণিতে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতার বিষয়টি এবারের ফলাফলে স্পষ্ট হয়েছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা এসব বিষয়ে বেশি পিছিয়ে রয়েছে।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনেক শিক্ষার্থী ভালো বিদ্যালয়, দক্ষ শিক্ষক এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ফলে মাধ্যমিক পর্যায়ে তাদের ভিত্তি দুর্বল থেকে যাচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে পরীক্ষার ফলে।
মানবিক বিভাগে সবচেয়ে বড় বিপর্যয়
এবার সবচেয়ে খারাপ ফল করেছে মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীরা। ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে মানবিক বিভাগে পাসের হার মাত্র ৪৮ দশমিক ৭৪ শতাংশ।
অর্থাৎ এ বিভাগে অর্ধেকের বেশি শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হতে পারেনি। এর বিপরীতে বিজ্ঞান বিভাগে পাসের হার ৮০ দশমিক ৬৪ শতাংশ এবং ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ৬৪ দশমিক ২৯ শতাংশ।
শিক্ষাবিদরা বলছেন, মানবিক বিভাগে দীর্ঘদিন ধরে অবহেলা, দক্ষ শিক্ষক সংকট এবং শিক্ষার্থীদের অনাগ্রহের বিষয়টি এই ফলাফলে প্রতিফলিত হয়েছে।
শতভাগ ফেল প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে
এবার একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি—এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৩১২টি। গত বছরের তুলনায় এ সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি।
এর মধ্যে ২২৬টি প্রতিষ্ঠান মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীন। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোতে শিক্ষার্থী সংখ্যা কম হলেও শিক্ষক রয়েছেন তুলনামূলক বেশি। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর পাঠদানের মান ও ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শতভাগ ফেল করা প্রতিষ্ঠানগুলো আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করে সমস্যার কারণ খুঁজে বের করা প্রয়োজন।
বৈষম্যের প্রভাব ফলাফলে
শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, জিপিএ ২ থেকে ৩-এর মধ্যে থাকা শিক্ষার্থীদের বড় অংশ গ্রামীণ ও দরিদ্র এলাকার। এসব শিক্ষার্থী অনেক ক্ষেত্রে ভালো শিক্ষক, প্রযুক্তিগত সুবিধা, কোচিং বা বাড়তি শিক্ষাসহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়।
শিক্ষাবিদরা মনে করছেন, এবারের এসএসসির ফল শুধু পরীক্ষার ফল নয়; এটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার বিদ্যমান বৈষম্যেরও প্রতিচ্ছবি।
গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে. চৌধুরী বলেন, শিক্ষক সংকট দূর করা এবং গ্রাম-শহরের শিক্ষাবৈষম্য কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। শতভাগ ফেল করা প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে গবেষণা করে কারণ চিহ্নিত করা প্রয়োজন।
চট্টগ্রামের শিক্ষা সংশ্লিষ্টরাও বলছেন, শুধু ফল প্রকাশের পর আলোচনা নয়, এখন প্রয়োজন পিছিয়ে পড়া প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার্থীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। না হলে উচ্চ মাধ্যমিকেও বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী দুর্বল প্রস্তুতি নিয়ে প্রবেশ করবে।