সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

বেগম খালেদা জিয়ার অবিচল দেশপ্রেমের অমর গাঁথা

জহিরুল ইসলাম জহির | প্রকাশিতঃ ১৫ অগাস্ট ২০২৬ | ১:২৪ অপরাহ্ন


১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট ব্রিটিশ ভারতের বঙ্গ প্রদেশের জলপাইগুড়িতে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে খালেদা খানম পুতুল জন্মগ্রহণ করেন। সেই পুতুল বেগম খালেদা জিয়া নামেই ব্যাপকভাবে পরিচিত হন। তিনি বাংলাদেশের প্রথম ও মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী। বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া তিনবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের দায়িত্ব পালন করেন। দুবার বিরোধীদলীয় নেতা ছিলেন বেগম জিয়া।

ক্ষণজন্মা এই নারী ছিলেন তিন বোন এবং দুই ভাইয়ের মধ্যে তৃতীয়। বাবা ইস্কান্দার মজুমদার এবং মা বেগম তৈয়বা মজুমদার। আদি পৈতৃক নিবাস ফেনী জেলার ফুলগাজী উপজেলার শ্রীপুর গ্রামের মজুমদার বাড়ি। বাবা ইস্কান্দার মজুমদার ছিলেন একজন ব্যবসায়ী। তিনি ১৯১৯ সালে ফেনী থেকে জলপাইগুড়িতে যান। বোনের বাসায় থেকে মেট্রিক পাস করেন ও পরে চা-ব্যবসায়ে জড়িত হন। ১৯৩৭ সালে জলপাইগুড়িতে বিয়ে করেন তৈয়বা মজুমদারকে। মা বেগম তৈয়বা মজুমদার ছিলেন একজন গৃহিণী।

খালেদা জিয়া পাঁচ বছর বয়সে দিনাজপুরের মিশন স্কুলে ভর্তি হন। এরপর তিনি দিনাজপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৬০ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। একই বছর তিনি জিয়াউর রহমানকে বিয়ে করেন। এরপর থেকে তিনি খালেদা জিয়া বা বেগম খালেদা জিয়া নামে পরিচিতি লাভ করেন। তিনি স্বামীর সঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তানে বসবাসের পূর্বে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত দিনাজপুরের সুরেন্দ্রনাথ কলেজে পড়াশোনা করেন। স্বামী বাংলাদেশের সাবেক প্রেসিডেন্ট ও সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়াউর রহমান বীর উত্তম। জিয়াউর রহমানের সঙ্গে যখন তার বিয়ে হয়, তখন জিয়া ছিলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একজন ক্যাপ্টেন। ডিএফআইয়ের কর্মকর্তা রূপে তখন তিনি দিনাজপুরে কর্মরত ছিলেন।

১৯৬০ সালে তিনি জিয়াউর রহমানকে বিয়ে করেন। ১৯৭৭ সালে তাঁর স্বামী রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর খালেদা জিয়া বাংলাদেশের ফার্স্ট লেডি হিসেবে দেশব্যাপী পরিচিতি লাভ করেন।

১৯৮১ সালের ৩০ মে একদল বিপথগামী সেনাসদস্যের ব্যর্থ অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমান শাহাদাত বরণ করেন। এরপর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীদের আহ্বানে তিনি ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সেনাপ্রধান জেনারেল এরশাদ বিচারপতি আব্দুস সাত্তারকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। বেগম জিয়া এর তীব্র বিরোধিতা করেন। ১৯৮৩ সালের মার্চ মাসে তিনি বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হন। ১৯৮৩ সালের ১ এপ্রিল দলের বর্ধিত সভায় তিনি প্রথম বক্তৃতা করেন। বিচারপতি সাত্তার অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৪ সালের ১০ মে দলের চেয়ারপারসন নির্বাচনে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বেই মূলত বিএনপির পূর্ণ বিকাশ হয় এবং দেশজুড়ে রাজনৈতিক দল হিসেবে এটি শক্ত অবস্থান তৈরি করে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে বেগম খালেদা জিয়াকে আলাদা করে চেনা যায় তাঁর সিদ্ধান্তের দৃঢ়তায়। স্বৈরশাসক এইচ এম এরশাদের অধীন ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী শেখ হাসিনা অংশ নিলেও খালেদা জিয়া দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য সে পথে যাননি। আপসের বদলে সংগ্রামকেই হাসিমুখে বেছে নিয়েছিলেন তিনি। সময়ই তাঁর সিদ্ধান্তের যথার্থতা প্রমাণ করেছিল। ১৯৯০ সালে এরশাদের পতন ঘটে আর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বেগম খালেদা জিয়া দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন। পরবর্তী জীবনে কারাবরণ ও রাজনৈতিক নিপীড়ন তাঁকে বারবার পরীক্ষায় ফেলেছে; কিন্তু তিনি আপস করেননি, যা খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক চরিত্রের সঙ্গে ‘আপসহীন’ নেত্রীর অভিধা জুড়ে দেয়। তাঁর এই রাজনৈতিক দৃঢ়তার কাছে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা বারবার পরাজিত হয়েছেন, যদিও তিনি রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে রেখেছিলেন দীর্ঘ ১৭ বছর।

এক-এগারোর পরবর্তী সময়ে রাজনীতি পুনরুদ্ধারের পরও খালেদা জিয়া আপসের পথে হাঁটেননি। প্রবল চাপ থাকার পরও তিনি ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন করেন। কারণ, তিনি প্রকাশ্যেই বলতেন, শেখ হাসিনার অধীন সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। এ জন্য তিনি ওই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে সরকারের বৈধতা দিতে রাজি ছিলেন না।

চার দশকের বেশি সময়জুড়ে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে অনড় থাকার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন বেগম খালেদা জিয়া। এর জন্য ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও দল হিসেবে বিএনপিকে চরম মূল্যও দিতে হয়েছে। তবে শেষ বিচারে তাঁর দৃঢ়চেতা মনোভাব তাঁকে আপসহীন নেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে তিনি এমন এক নেত্রী, যাঁর জীবন ও রাজনীতি বারবার প্রমাণ করেছে—সব আপস রাজনৈতিক লাভ আনে না, আর সব অনমনীয়তাও পরাজয় নয়।

বেগম খালেদা জিয়া গৃহবধূ থেকে রাজনীতিতে এসে ৪৫ বছর পার করেছেন। ১৯৮৪ সালের ১০ মে কাউন্সিলের মাধ্যমে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন তিনি। এরপর থেকে মৃত্যুর দিন পর্যন্ত দলের চেয়ারপারসনের দায়িত্ব পালন করেছেন দেশনেত্রী।

বিএনপির চেয়ারপারসন, আপসহীন নেত্রী, দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের ধারক, তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী, সবচেয়ে বেশিসংখ্যক সংসদীয় আসনে একসময়কার বিজয়ী এবং আপসহীন সংগ্রামে স্বৈরশাসনকে বিদায় দেওয়ার অসামান্য কৃতিত্বের অধিকারী হলেন বেগম খালেদা জিয়া। সময়ের পরিক্রমায় সাধারণ গৃহবধূ থেকে তিনি আজ আপসহীন নেত্রী। বাংলাদেশের মানুষ তাঁকে ‘আপসহীন নেত্রী’র খেতাব দিয়েছে। কিন্তু কেন তাঁকে এই উপাধি দেওয়া হলো, তা হয়তো এখনকার প্রজন্ম জানে না। জানার কথাও নয়। বিগত ১৬ বছরে বাংলাদেশের ইতিহাস থেকে জিয়া পরিবারের ভূমিকা মুছে ফেলার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়েছিল।

কিন্তু তারা পারেনি, বরং খালেদা জিয়া এখন বিএনপির ঐক্যের প্রতীক থেকে জাতীয় ঐক্যের প্রতীকে রূপান্তরিত হয়েছেন। একসময়কার চার দেয়ালের মাঝখান থেকে বেরিয়ে বিএনপির মতো বড় দলের অভিযাত্রায় জেল, জুলুম ও চিকিৎসাবঞ্চনা সহ্য করে তিনি আপসহীন নেত্রীর তকমা পেয়েছেন। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে যখন অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়, ঠিক তখনই বেগম খালেদা জিয়া দলের নেতৃত্বে আসেন।

বহুদলীয় গণতান্ত্রিক রাজনীতির চর্চার যে পথ জিয়াউর রহমান সৃষ্টি করেছিলেন, বেগম খালেদা জিয়া সেই পথ ধরেই বিএনপিকে এগিয়ে নেন। তাঁর নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় ১৯৯০ সালে স্বৈরশাসক এরশাদের পতন হয়। ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিজয়ী হয় এবং তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। ২০০১ সালেও তিনি বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।

চার দশকের বেশি সময় ধরে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকার পাশাপাশি তাঁকে সইতে হয়েছে অচিন্তনীয় ও অমানবিক নির্যাতন। সশস্ত্র হুমকিতেও তিনি দেশ ছেড়ে যাননি, শুধু বাংলাদেশের মানুষের পাশে থাকার জন্য। কর্মগুণে ও সততায় তিনি হয়ে গেছেন বাংলাদেশের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে প্রমাণ করেছেন, ক্ষমতার প্রলোভন বা নিপীড়নের ভয়—কোনোটিই তাঁকে জনগণের স্বার্থ থেকে সরাতে পারেনি। “আপসহীন নেত্রী” উপাধি তিনি পেয়েছেন রাজপথে রক্ত, কারাবাস ও অটল অবস্থানের বিনিময়ে।

১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি একটি অবাধ ও সুষ্ঠু সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন বেগম জিয়া। তাঁর প্রধানমন্ত্রীত্বকালে বাংলাদেশ সংসদীয় গণতন্ত্রে পরিণত হয়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর মেয়াদে কিছু বড় অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল। এ সময় কর্মসংস্থানের হার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায় এবং শুধু তৈরি পোশাকশিল্প খাতেই পাঁচ বছরে কর্মসংস্থানের বৃদ্ধি ছিল ২৯ শতাংশ। প্রায় দুই লাখ নারী এ সময় তৈরি পোশাকশিল্প খাতে যোগ দেন।

তিনি জাতিসংঘে গঙ্গার পানিবণ্টনের সমস্যাটি উত্থাপন করেন, যাতে বাংলাদেশ গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা পায়। ১৯৯২ সালে তাঁকে হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ জানানো হলে সেখানে তিনি রোহিঙ্গা মুসলিম শরণার্থীদের সমস্যা উত্থাপন করেন। পরে মিয়ানমার সরকার ১৯৯০-এর দশকের প্রথম দিকে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গা মুসলিম শরণার্থীদের প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশের সাথে একটি চুক্তি করে।

স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনের পর ১৯৯১ সালে তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। এ পর্যন্ত তিন দফায় প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন খালেদা জিয়া। ১৯৯৩ সালে তিনি সার্কের প্রথম নারী চেয়ারপারসন হন।

১৯৯৬ সালে বিএনপির নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর খালেদা জিয়া টানা দ্বিতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হন। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর এবং পুনরায় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রতিশ্রুতির কারণে তিনি এক মাসের মধ্যে পদত্যাগ করেন। যদিও বিএনপি ১৯৯৬ সালের জুনের নতুন নির্বাচনে হেরে যায়, দলটি বাংলাদেশের ইতিহাসে সংসদে সবচেয়ে বড় বিরোধী দল হিসেবে ১১৬টি আসন পায়।

১৯৯৯ সালে বেগম জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামী এবং ইসলামী ঐক্যজোটের সাথে চারদলীয় জোট গঠন করে এবং ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি আন্দোলন কর্মসূচি শুরু করে। বেগম খালেদা জিয়া দুর্নীতি ও সন্ত্রাস নির্মূলের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ২০০১ সালের নির্বাচনে জয়ী হন। ফোর্বস ম্যাগাজিন নারীশিক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়নে তাঁর ভূমিকার জন্য ২০০৫ সালে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর নারীদের তালিকায় তাঁকে ২৯ নম্বরে স্থান দেয়। ২০০১ সালের ১ অক্টোবরের নির্বাচনে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট জয়লাভের পর তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠন করে।

২০০৬ সালে তিনি একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরে, তাঁকে ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নির্বাসনে পাঠানোর একাধিক প্রচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে দুর্নীতির তুচ্ছ এবং ভিত্তিহীন অভিযোগে স্বৈরাচারী সরকার তাঁকে গ্রেপ্তার করে।

ক্ষমতায় থাকাকালীন খালেদা জিয়ার সরকার বাধ্যতামূলক ও অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা, মেয়েদের জন্য দশম শ্রেণি পর্যন্ত বিনা বেতনে শিক্ষা, ছাত্রীদের জন্য শিক্ষা উপবৃত্তি এবং শিক্ষা কার্যক্রমের জন্য খাদ্যের বিনিময়ে শিক্ষা কর্মসূচি প্রবর্তন করে শিক্ষাক্ষেত্রে যথেষ্ট অগ্রগতি সাধন করেছিল। তাঁর সরকার সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ২৭ বছর থেকে বাড়িয়ে ৩০ বছর করে এবং শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ দেয়।

বেগম জিয়া কোনো আসনেই পরাজিত না হওয়ার অনন্য রেকর্ডের অধিকারী। তিনি ১৯৯১ থেকে ২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনগুলোতে পাঁচটি পৃথক সংসদীয় আসনে নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০০৮ সালেও তিনি যে তিনটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন, তার সব কটিতেই জয়লাভ করেন।

২০০৯ সাল থেকে, যখন শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার বাংলাদেশকে একটি কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রে পরিণত করে, তখন তিনি গণতন্ত্রের জন্য তাঁর লড়াই নতুন করে শুরু করেন। সরকার তাঁকে জোরপূর্বক তাঁর বাড়ি থেকে বের করে দেয় এবং গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন শুরু করায় তাঁকে দুবার গৃহবন্দী করা হয়। গণতন্ত্রের প্রতি তাঁর অবিচল ভূমিকার জন্য ২০১১ সালে নিউ জার্সির স্টেট সিনেট তাঁকে “গণতন্ত্রের জন্য যোদ্ধা” উপাধিতে সম্মানিত করে।

পলাতক ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত আক্রোশের শিকার হয়ে মিথ্যা ও বানোয়াট মামলায়—জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায়—২০১৮ সালে বেগম খালেদা জিয়াকে ১৭ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। মূলত আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তাই ছিল বেগম খালেদা জিয়ার একমাত্র অপরাধ।

“ভেবেছিলেন, আপস করবেন? দেশ ছেড়ে পালাবেন? না! ইতিহাস বলে, তিনি আপসহীন। ৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, আদালতের বারান্দায় দাঁড়িয়ে তিনি জানিয়ে দিলেন—গণতন্ত্রের লড়াইয়ে কারাবাসই যদি হয় তাঁর ভাগ্য, তবে তা তিনি মাথা পেতে নেবেন।”

২০২০ সালের কান্ট্রি রিপোর্টস অন হিউম্যান রাইটস প্র্যাকটিস প্রতিবেদনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট আন্তর্জাতিক এবং দেশীয় আইন বিশেষজ্ঞদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছে যে, মূলত নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য একটি রাজনৈতিক চক্রান্ত হিসেবেই তাঁকে এই সাজা দেওয়া হয়েছিল। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল যে তাঁর “ন্যায্য বিচারের অধিকারকে সম্মান করা হচ্ছে না।”

“আমি কোনো অন্যায় করিনি। আমি জনগণের জন্য রাজনীতি করি। আমার ওপর যে রায় দেওয়া হয়েছে, তা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। কিন্তু আমি মাথা নত করব না।”

দেশত্যাগ অথবা কারাগার—আওয়ামী লীগ সরকারের এমন শর্তের সামনে দাঁড়িয়ে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া কারাগারকেই বেছে নিয়েছিলেন। বিনা অপরাধে তাঁকে বন্দী করা হয়। শেখ হাসিনার রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বাস্তবায়ন করতে এক-এগারোর সেনাসমর্থিত সরকারের দায়ের করা মিথ্যা মামলায় ফরমায়েশি রায় ঘোষণা করা হয়।

নির্জন কারাগারে একাকী তিন বছর কাটান তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। অসুস্থতা তাঁকে কাবু করলেও, নত করতে পারেনি। তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে বিদেশে চিকিৎসার আবেদন বারবার নাকচ করে দেয় ফ্যাসিস্ট হাসিনার সরকার।

হাসিনার সাজানো মিথ্যা দুর্নীতির মামলায় দণ্ডিত হয়ে ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি কারাগারে যান খালেদা জিয়া। দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হলে ছয় মাসের জন্য সাজা স্থগিত করে ২০২০ সালের ২৫ মার্চ খালেদা জিয়াকে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি দেয় সরকার। তিনি বাসায় থেকে চিকিৎসা নেবেন এবং বিদেশে যেতে পারবেন না—এমন শর্তেই সাজা স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেই থেকে বাসায় থেকেই চিকিৎসা নেন তিনি। এর মধ্যে লিভার সিরোসিস, হার্টের জটিলতাসহ নানা রোগে কয়েক দফায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসা নেন তিনি।

মেডিকেল বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী উন্নত চিকিৎসার জন্য বেগম জিয়াকে লন্ডন নিয়ে যাওয়া হয়। দীর্ঘদিন চিকিৎসাবঞ্চনার কারণে নানাবিধ জটিল রোগে আক্রান্ত ১৮ কোটি মানুষের প্রিয় নেত্রী উন্নত চিকিৎসার জন্য লন্ডনের ডাক্তারদের অধীন চিকিৎসা নিয়েছিলেন। হাসিনার ব্যক্তিগত আক্রোশের শিকার হয়ে বিনা চিকিৎসায় জেলে বন্দী রেখে তিলে তিলে কষ্ট দিয়ে বেগম খালেদা জিয়াকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছিল পলাতক ফ্যাসিস্ট হাসিনা।

“২৫ মার্চ ২০২১, সরকারের নির্বাহী আদেশে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পান দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। কিন্তু এটি ছিল একধরনের গৃহবন্দিত্ব। চিকিৎসার জন্য বিদেশ যেতে চাইলেও ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার শর্ত দেয়—রাজনীতি ছাড়তে হবে! কিন্তু আপসহীন বেগম খালেদা জিয়া তাতে রাজি হননি।”

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নতুন সকাল। ফ্যাসিবাদের পতন চূড়ান্ত হয়। নির্যাতন ও গৃহবন্দিত্বের অবসান ঘটে, মুক্তি পান নিরপরাধ খালেদা জিয়া। গণ-অভ্যুত্থানের প্রথম দিনেই বাংলাদেশের জনগণ তাদের নেত্রীকে স্বাগত জানায়, ফিরে আসে ন্যায়বিচার ও গণতন্ত্রের স্বপ্ন।

৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। ৬ আগস্ট হাসিনার কোর্টের দেওয়া সাজা মওকুফ করেন রাষ্ট্রপতি। তিন বছরের গৃহবন্দিত্ব শেষে মুক্ত হয়ে তিনি ফিরে আসেন জনতার মাঝে, আর বাংলাদেশের রাজপথ ফিরে পায় তার অদম্য নেত্রীকে।

আজ বেগম খালেদা জিয়া কেবল একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী নন; তিনি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক চেতনার এক জীবন্ত প্রতীক। ক্ষমতার লোভ, কারাবাস, নির্যাতন—কোনো কিছুই তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাসকে নড়াতে পারেনি। তাঁর এই মৃত্যুতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন স্বীকার করে—এ দেশে গণতন্ত্রের পথ যতবার বিপন্ন হয়েছে, ততবার তিনি ছিলেন লড়াইয়ের সম্মুখসারিতে।

রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে ৩৭ দিন দেশ-বিদেশের ডাক্তার-নার্সদের নিরলস পরিশ্রম আর দেশবাসীসহ বিশ্বের অগণিত মানুষের দোয়া—সবকিছু বিফলে ফেলে ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর মহান আল্লাহর ডাকে চলে গেছেন এই দুনিয়ার মায়া ছেড়ে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীর উত্তমের অজস্র সৈনিকের রাজনৈতিক মা, প্রিয় নেত্রী, এ দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

বাংলাদেশ যতদিন থাকবে, ততদিন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক হিসেবে আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল। তিনি শুধু শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণীই নন, বরং নিজ গুণে ও নেতৃত্বে নিজেকে একজন শক্তিশালী ও শ্রদ্ধেয় জাতীয় নেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। গণতন্ত্রের জন্য তাঁর সংগ্রাম, আপসহীন মনোভাব এবং দেশপ্রেম ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণা। গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের জন্য ‘গণতন্ত্রের মাতা’ ও জাতীয় নেত্রী হিসেবে জনগণের ভালোবাসায় তিনি সম্মানিত হন। জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যবৃন্দ, তিন বাহিনীর প্রধান, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ ও লাখ লাখ নেতাকর্মী জানাজায় অংশ নেন।

এ ছাড়া বিদেশি কূটনীতিকরা এই জানাজায় অংশগ্রহণ করেন। জানাজায় ইমামতি করেন বায়তুল মোকাররমের খতিব। ধারণা করা হচ্ছে, এটি ইতিহাসে কোনো মুসলিম নারীর সর্ববৃহৎ জানাজা। এটি শুধু বাংলাদেশ নয়, বরং মুসলিম বিশ্বের স্মরণকালের বড় জানাজা। বেগম খালেদা জিয়াকে তাঁর স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়।

১৫ আগস্ট ২০২৬ বেগম খালেদা জিয়ার ৮১তম জন্মবার্ষিকীতে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা। মা, মাটি ও মানুষের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এ দেশের জনগণের হৃদয়ে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তিনি গণতন্ত্রের প্রশ্নে আপসহীন ও অবিস্মরণীয় এক নেত্রী হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দরবারে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রুহের মাগফিরাত কামনা করছি এবং বিনীত ফরিয়াদ জানাই—মহান আল্লাহ যেন তাঁকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মাকাম দান করেন, আমিন।

লেখক: সাবেক সহ-দপ্তর সম্পাদক, চট্টগ্রাম মহানগর যুবদল।