সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

মানবপাচারের শিকার ফরিদ ২৫ বছর পর স্বজনদের কাছে

একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ২০ অগাস্ট ২০২৬ | ৮:০৭ অপরাহ্ন


মাত্র ১০ বছর বয়সে বাবার সঙ্গে বিদেশে গিয়ে দুই পা হারিয়ে মানবপাচারের শিকার হওয়া মোহাম্মদ ফরিদ দীর্ঘ ২৫ বছর পর পরিবারের কাছে ফিরেছেন।

বৃহস্পতিবার ২০ আগস্ট ঢাকার আশকোনায় ব্র্যাক মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাঁকে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

ফরিদের ছোট ভাই ও স্থানীয় একটি মসজিদের ইমাম সৈয়দ আলম জানান, তাঁরা ধরে নিয়েছিলেন ফরিদ আর বেঁচে নেই।

এত বছর পর ভাইকে ফিরে পেয়ে আবেগাপ্লুত হওয়ার কথা জানিয়ে তিনি আরও বলেন, কক্সবাজারে তাঁদের বৃদ্ধ মা নূরজাহান বেগম বড় ছেলের অপেক্ষায় আছেন।

ফরিদকে পরিবারের কাছে হস্তান্তরের সময় ওয়েজ আর্নার্স ওয়েলফেয়ার বোর্ডের পরিচালক ও রেইজ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক এবং সরকারের যুগ্ম সচিব এ টি এম মাহবুবুল করিম উপস্থিত ছিলেন।

একই সঙ্গে ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন অ্যান্ড ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম) শরিফুল ইসলাম হাসান এবং প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের উপপরিচালক শরিফুল ইসলাম সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

পাশাপাশি সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তা এ কে এম রাসেল এবং ব্র্যাক মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারের কর্মকর্তারাও এই হস্তান্তর প্রক্রিয়ায় অংশ নেন।

ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম জানায়, প্রায় ২৫ বছর আগে ফরিদ তাঁর বাবা আয়ুব আলীর সঙ্গে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে যান।

পরে তাঁরা পাকিস্তানে পৌঁছান এবং সেখানে জীবিকার সন্ধানে কাজ করার সময় চলন্ত ট্রেন থেকে পড়ে গুরুতর আহত হলে চিকিৎসকেরা ফরিদের দুই পা কেটে ফেলতে বাধ্য হন।

শারীরিক প্রতিবন্ধকতার শিকার হওয়ার পর এক মানবপাচারকারী তাঁকে ইউরোপে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে পাকিস্তান থেকে ইরান হয়ে তুরস্কে নিয়ে যায়।

তবে ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্ন পূরণ না হওয়ায় তুরস্কের সমুদ্রতীরে পানি বিক্রি করে প্রায় ১৪ বছর কাটান তিনি।

সেখানে অনিয়মিত অভিবাসী হিসেবে বসবাসের কারণে তুরস্কের পুলিশ তাঁকে তিনবার আটক করে ক্যাম্পে রাখে এবং সর্বশেষ গ্রেপ্তারের পর তাঁকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়।

গত ১৮ আগস্ট ভোর সোয়া ৫টার দিকে টিকে-৭১২ ফ্লাইটে তুরস্ক থেকে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান ফরিদ।

দীর্ঘদিন বিদেশে থাকার কারণে স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে না পারলেও নিজের ও বাবা-মায়ের নাম এবং ‘উখিয়া, কক্সবাজার’ ছাড়া আর কোনো তথ্য তিনি দিতে পারছিলেন না।

বিমানবন্দরের এভসেক সিকিউরিটি ফরিদকে পাওয়ার পর প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের মাধ্যমে তাঁকে ব্র্যাকের আশকোনা মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারে হস্তান্তর করে।

এরপর ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের কর্মীরা স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণমাধ্যমকর্মীদের সহায়তায় মাত্র ১২ ঘণ্টার মধ্যে কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার মরিচ্যা পালং ইউনিয়নের নাছির পাড়ায় ফরিদের পরিবারের সন্ধান পান।

পরিবারের সন্ধান পাওয়ার পর গত বুধবার বিকেলে ভিডিও কলে ফরিদের সঙ্গে তাঁর ছোট ভাই সৈয়দ আলমের কথা বলিয়ে দেওয়া হয়।

কথোপকথনের একপর্যায়ে ফরিদের হাতে ছয়টি আঙুল থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেন সৈয়দ আলম, যা দুই ভাইয়ের পরিচয় নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হয়ে ওঠে।

পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ফরিদের বাবা আয়ুব আলী এখনো পাকিস্তানে রয়েছেন।

ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক শরিফুল ইসলাম হাসান জানান, গত আট বছরে বিমানবন্দরে তাঁরা ৪১ হাজার প্রবাসীকে সহায়তা দিতে পেরেছেন, যার মধ্যে ফরিদের মতো ১৬৪ জনকে তাঁদের পরিবারের কাছে নিরাপদে হস্তান্তর করা সম্ভব হয়েছে।

১৭ কোটি মানুষের দেশে কাউকে খুঁজে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া কঠিন কাজ হলেও সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ, প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক এবং ব্র্যাকের সমন্বিত উদ্যোগে এই অসম্ভবকে সম্ভব করা গেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

ফরিদের দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনে ব্র্যাক সহায়তা করবে বলেও তিনি আশ্বাস দেন।

প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের উপপরিচালক শরিফুল ইসলাম জানান, প্রবাসীদের নানা সমস্যায় তাঁদের ডেস্ক পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে এবং ফরিদের মতো জটিল ও মানবিক ঘটনায় ব্র্যাকের সহায়তায় এমন পুনর্মিলন সম্ভব হয়েছে।

সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তা এ কে এম রাসেল জানান, দুই বছর ধরে বিমানবন্দরে কাজ করার অভিজ্ঞতায় এমন একটি মানবিক প্রক্রিয়ার অংশীদার হতে পেরে তিনি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করছেন।

অন্যদিকে ওয়েজ আর্নার্স ওয়েলফেয়ার বোর্ডের রেইজ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ও সরকারের যুগ্ম সচিব এ টি এম মাহবুবুল করিম মানবপাচার প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে আরও সতর্ক ও সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।