সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

আনোয়ারার রাত এখন আর ভয়ের নয়

জিন্নাত আয়ুব | প্রকাশিতঃ ২৩ অগাস্ট ২০২৬ | ১০:০৬ অপরাহ্ন


রাত তখন প্রায় ৮টা। কেইপিজেডের গেট দিয়ে বেরিয়ে আসছিলেন পোশাকশ্রমিক রাহেলা বেগম। দীর্ঘ ডাবল শিফটের পর শরীর ভেঙে পড়েছে, তবু বাড়ির পথ ধরতে হবে। কিছুদিন আগেও এই রাস্তায় একা হাঁটা মানে ছিল বুক কাঁপিয়ে চলা। ব্যাগ ধরে টান, গলার চেইন ছিঁড়ে নেওয়া- এসব ঘটনা ছিল নিত্যসঙ্গী।

কিন্তু সেদিন রাহেলা পুরো পথ হেঁটে বাড়ি ফিরলেন। থানার পেছনে একটি পুলিশের টহল গাড়ি তাঁকে দেখে একটু এগিয়ে এলো, নিরাপদ কিনা জিজ্ঞেস করল। রাহেলা অবাক হলেন। বললেন, “এইরকম কখনো হয়নি আগে।”

এই পরিবর্তন একরাতের নয়। আনোয়ারা থানায় ওসি হিসেবে যোগ দেওয়ার পর থেকে ধাপে ধাপে এই বদলটা এনেছেন মো. জুনায়েত চৌধুরী।

চট্টগ্রামের উপকূলীয় ও শিল্পসমৃদ্ধ উপজেলা আনোয়ারা। কোরিয়ান ইকোনমিক জোন কেইপিজেড আর পারকি সমুদ্র সৈকতের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকা নিয়ে গঠিত এই উপজেলায় একসময় মাদক, চুরি ও ছিনতাইয়ের দাপটে সাধারণ মানুষের মনে তীব্র উদ্বেগ ছিল। আজ সেখানে বইছে ভিন্ন হাওয়া।

ডাবল মার্ডারের জট খুললেন দ্রুততম সময়ে

ওসি জুনায়েত চৌধুরীর সক্ষমতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষাটি এলো একটি জোড়া হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে। উপজেলায় পরপর দুজনকে খুনের ঘটনায় এলাকাজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কোনো প্রত্যক্ষ সাক্ষী নেই, স্পষ্ট সূত্র নেই- বলতে গেলে ক্লুলেস একটি মামলা। কিন্তু ওসি জুনায়েত চৌধুরী দলকে একত্রিত করে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে তদন্ত শুরু করলেন।

ঘটনাস্থলের তথ্য বিশ্লেষণ, সম্ভাব্য সাক্ষীদের সঙ্গে গোপনে কথা, এলাকায় নজরদারি- একে একে জোড়া লাগতে থাকল সূত্রের টুকরোগুলো। অল্প সময়ের মধ্যেই মূল আসামিদের গ্রেপ্তার করা হলো। চট্টগ্রাম জেলা পুলিশে এই তদন্ত এখন পেশাদারিত্বের উদাহরণ হিসেবে আলোচিত হয়।

চট্টগ্রাম আদালতের আইনজীবী অ্যাডভোকেট নাজিম উদ্দীন বলেন, “ডাবল মার্ডার মামলার তদন্তে তিনি যেভাবে বৈজ্ঞানিক ও পেশাদারী পদ্ধতি ব্যবহার করে দ্রুত চার্জশিট প্রদানের ব্যবস্থা করেছেন, তা একজন আইনজীবী হিসেবে আমার দৃষ্টি কেড়েছে।”

কেইপিজেড থেকে চাতরী, ছিনতাইকারীরা এখন নেই

কেইপিজেড সংলগ্ন সড়ক আর চাতরী চৌমুহনী- এই দুটি এলাকা ছিল ছিনতাইকারী ও কিশোর গ্যাংয়ের অভয়ারণ্য। বিশেষত সন্ধ্যার পর শ্রমিকদের যাতায়াতের সময় মুহূর্তের মধ্যে ঘটে যেত ছিনতাই।

ওসি জুনায়েত চৌধুরী দায়িত্ব নেওয়ার পর এই পয়েন্টগুলোতে তৈরি করলেন বিশেষ নিরাপত্তা বলয়- নৈশকালীন টহল, চেকপোস্ট এবং ছদ্মবেশী নজরদারি। পাশাপাশি নারী শ্রমিকদের নিরাপদ চলাচলের জন্য আলাদা টিম মাঠে নামল।

চাতরী চৌমুহনীর বাসিন্দা শফিউল আলম বলেন, “আগে সন্ধ্যার পর পকেটে টাকা নিয়ে হাঁটতে ভয় পেতাম। এখন গভীর রাতেও মানুষ নিরাপদে বাড়ি ফিরছে। আমরা শান্তিতে ঘুমাতে পারছি।”

মানুষের দরজায় পৌঁছে গেছে থানার সেবা

শুধু অপরাধ দমন নয়, পুলিশকে মানুষের কাছের করে তোলাটাও ছিল ওসির লক্ষ্য। প্রতিটি ইউনিয়নে নিয়মিত বিট পুলিশিং এবং ওপেন হাউস ডে’র আয়োজন করা হচ্ছে। থানায় দালালের দৌরাত্ম্য বন্ধ হয়েছে, সাধারণ মানুষ হয়রানি ছাড়াই জিডি বা মামলা করতে পারছেন।

সমাজকর্মী মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীন বলেন, “ওসি জুনায়েত চৌধুরী যোগদানের পর আনোয়ারার সামাজিক পরিবেশ অনেক শান্ত হয়েছে। কেইপিজেডের নারী শ্রমিকরা এখন অনেক নিরাপদে যাতায়াত করতে পারছেন।”

এই কাজের স্বীকৃতি মিলেছে প্রাতিষ্ঠানিকভাবেও। চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের মাসিক কল্যাণ ও অপরাধ পর্যালোচনা সভায় ওসি মো. জুনায়েত চৌধুরীকে জেলার শ্রেষ্ঠ অফিসার ইনচার্জ হিসেবে পুরস্কৃত করা হয়েছে।

স্বীকৃতি প্রসঙ্গে ওসি নিজে বললেন, “আমি পুরস্কারের আশায় কাজ করি না, কাজ করি সাধারণ মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে। তবে এই স্বীকৃতি আমাদের দায়িত্ববোধ আরও বাড়িয়ে দেয়।”

রাহেলা বেগম সেদিন রাতে যে স্বস্তি নিয়ে বাড়ি ফিরেছিলেন, আনোয়ারার হাজারো মানুষের জন্য সেটুকুই এখন বড় প্রাপ্তি।