সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

এলএনজি সংকটে এক কার্গোতেই বাড়তি ব্যয় ১৬৫ কোটি টাকা

একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ২৪ অগাস্ট ২০২৬ | ৯:১৩ পূর্বাহ্ন


একটি সংকটের শুরু হয়েছিল একটি সিদ্ধান্তে। চাহিদার চেয়ে কম দামে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে (ডিপিএম) এলএনজি কেনার ক্রয়াদেশ দেওয়া হলো। কিন্তু সেই কার্গো এলো না। আগস্টে চারটি আসার কথা ছিল, একটিও দেশের মাটিতে পৌঁছায়নি। এদিকে বিশ্ববাজারে দাম দ্বিগুণ হয়ে গেছে।

জানুয়ারিতে প্রতি ইউনিট এলএনজির দাম ছিল ১০-১১ ডলার, জুলাইয়ের শেষে তা ছুঁয়েছে ২২ ডলার। ফলে এখন বেশি দামে কিনতে হচ্ছে, আর একটি কার্গোতেই বাড়তি খরচ হচ্ছে অন্তত ১৬৫ কোটি টাকা। দেশজুড়ে গ্যাস-সংকট তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। এটি কোনো আকস্মিক দুর্যোগ নয়- এটি একটি সিদ্ধান্তের মাশুল।

ডিপিএমের ফাঁদে সরকার, কার্গো এলো না একটিও

সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি দরপত্রের মাধ্যমে নির্বাচিত তিনটি এলএনজি কার্গো অনুমোদন দেয়নি। ওই তিনটির দাম ছিল ২০ থেকে সাড়ে ২১ ডলারের মধ্যে। আরও কম দামে কেনার যুক্তিতে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে (ডিপিএম) বেশ কিছু কার্গো কেনার ক্রয়াদেশ অনুমোদন করা হয়। কিন্তু বাস্তবে সেই কার্গোগুলো এলোই না।

এলএনজি সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তারা বলছেন, আগে দরপত্র ডাকা হলে কম দামেই এলএনজি পাওয়া যেত। কিন্তু দেরিতে দরপত্র ডাকায় এবং ডিপিএমে কার্গো না আসায় পরিস্থিতি এখন হাতের বাইরে চলে গেছে। তিন দফায় দরপত্র ডেকে আগস্টের তিন কার্গোর বিপরীতে মিলেছে মাত্র দুটি। আর প্রতি দরপত্রে দাম বাড়ছেই—১৭ আগস্টে ২২ ডলার, ১৮ আগস্টে ২৪ ডলার, ১৯ আগস্টে ২৫ দশমিক ৩১ ডলার।

মহেশখালীতে আগুন, বিশ্ববাজারে ঝড়, দেশে গ্যাস-সংকটের দ্বিমুখী চাপ

সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে দুটি কারণে—একটি দেশীয়, আরেকটি আন্তর্জাতিক। গত ২১ জুলাই মহেশখালীতে অগ্নিদুর্ঘটনায় মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যায়। এই টার্মিনালের দৈনিক সক্ষমতা ছিল ৬০ কোটি ঘনফুট। সামিটের টার্মিনালের ৫০ কোটি ঘনফুট মিলিয়ে দুটো থেকে মোট সর্বোচ্চ ১০৫ কোটি ঘনফুট সরবরাহ হতো। একটি বন্ধ হওয়ায় সরবরাহে বিশাল ঘাটতি তৈরি হয়।

অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত, কাতারের সরবরাহে অনিশ্চয়তা এবং শীতের আগে ইউরোপের বাড়তি মজুতের চাপে এলএনজির দাম ছয় মাসে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। কাতার ও ওমানের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর সেখান থেকে সরবরাহ কার্যত বন্ধ। ফলে বিশ্ববাজার থেকে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে, অথচ কিনতে চাইলেও কার্গো পাওয়া যাচ্ছে না।

অগ্রাধিকার তালিকা ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় গ্যাস-সংকটের সমাধান

পেট্রোবাংলার তথ্য বলছে, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট। সর্বোচ্চ ২৭০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করে পরিস্থিতি সামলানো হচ্ছিল। কিন্তু এখন সেটিও সম্ভব হচ্ছে না- গতকাল সন্ধ্যায় মোট গ্যাস সরবরাহ হয়েছে মাত্র ২৩৮ কোটি ঘনফুট।

জ্বালানিবিশেষজ্ঞ ম তামিম সরাসরি বলছেন, এখনকার চড়া দামে এলএনজি কেনার সামর্থ্য বাংলাদেশের নেই। তাঁর পরামর্শ—সরকারকে গ্যাস সরবরাহের অগ্রাধিকার তালিকা তৈরি করতে হবে এবং জ্বালানি তেল থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়ে শিল্পে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।

পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. আবদুল মান্নান অবশ্য বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি চুক্তির অধীন কার্গো আনার চেষ্টা অব্যাহত আছে। তবে সংশ্লিষ্টরা সতর্ক করছেন—বিশ্ববাজারে সংকট এখনও কাটেনি, আগামী মাসেও সরবরাহ পেতে ভোগান্তি হতে পারে।

এ পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞ তামিমের কথায়, “এটি শুধু অর্থনৈতিক নয়- সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।”