
চিংড়িঘের ও লবণ মাঠ তৈরির জন্য কক্সবাজারের মহেশখালীতে সরকারি প্যারাবন বা ম্যানগ্রোভ বন ধ্বংসের দায়ে সাতজনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত।
সোমবার মহেশখালী সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক মো. ইমরান হোসেন পৃথক তিন মামলায় এই রায় ঘোষণা করেন।
আমাবশ্যাখালী মৌজায় প্যারাবন কেটে চিংড়িঘের ও লবণ মাঠ তৈরির অভিযোগে করা দুটি মামলায় পাঁচজনকে ছয় মাস করে বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং ১৫ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
২০২৩ সালে বন বিভাগের করা একটি মামলায় (১৩/২৩) সাজাপ্রাপ্তরা হলেন এরশাদ উল্লাহ, ফিরোজ ওয়াহিদ শামীম ও আমান উল্লাহ। এই মামলাটি মহেশখালী থানায় দায়ের করা হয়েছিল।
একই বছর করা অপর মামলায় এরশাদ উল্লাহ, মো. শাহাব উদ্দিন ও শাহাদৎ কবিরকে একই সাজা দেওয়া হয়।
অন্যদিকে, কালারমারছড়া ইউনিয়নের কোহেলিয়া নদীর তীরবর্তী এলাকায় অবৈধভাবে পুকুর খনন করে পরিবেশের ক্ষতির দায়ে ২০২১ সালের একটি মামলায় (২৮৯/২১) আব্দুস সালামকে এক বছর তিন মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
রাষ্ট্রপক্ষে মামলাগুলো পরিচালনা করেন মহেশখালী আদালতের আইনজীবী সিরাজুল হক রানা।
তিনি জানান, সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে ফিরোজ ওয়াহিদ শামীম ও শাহাদৎ কবিরকে এক মাসের মধ্যে আপিল করার শর্তে জামিন দেওয়া হয়েছে।
আদালতের নথিপত্র এবং স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মহেশখালীতে প্যারাবন দখল ও নিধনের ঘটনা নতুন নয়।
২০২৩ সালের জানুয়ারিতে হোয়ানক ইউনিয়নের আমাবশ্যাখালী মৌজায় প্রায় ১০০ হেক্টর বনভূমির গাছ কেটে চিংড়িঘেরের বাঁধ নির্মাণ এবং সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে চারজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে সোনাদিয়া ও ঘটিভাঙা উপকূলে প্যারাবন কেটে চিংড়িঘের ও লবণ মাঠ তৈরির অভিযোগে আরও একাধিক মামলা হয়।
২০২৪ সালে পরিবেশ অধিদপ্তর সোনাদিয়ায় প্যারাবন নিধনের অভিযোগে ২৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে।
২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে সোনাদিয়ায় সাতটি স্থানে ৫৬২ একর এলাকায় অনুমতি ছাড়া প্রাকৃতিক বন কেটে বাঁধ নির্মাণ, চিংড়িঘের ও লবণ মাঠ তৈরির অভিযোগ উঠে আসে।
একই সময়ে শাপলাপুর, হোয়ানক ও কুতুবজোমে প্যারাবন উজাড় করে চিংড়িঘের তৈরির অভিযোগও প্রকাশ্যে আসে।
পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সরকারি নথিতে তালিকাভুক্ত বন আইন, ১৯২৭-এর ২৬ ধারা, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ এবং পরিবেশ আদালত আইন, ২০১০ অনুযায়ী পরিবেশবিধ্বংসী এসব কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
মহেশখালীতে প্যারাবন নিধনের অভিযোগে অতীতেও মামলা হয়েছে এবং ২০০৮ সালের একটি মামলায় ১২৯ কোটি ৫৮ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দাবির বিষয়ও আদালতে গড়িয়েছে।
সোনাদিয়া নিয়ে ২০২৫ সালেও প্যারাবন রক্ষায় সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনি নোটিশ দিয়েছেন পরিবেশবাদী সংগঠনের স্থানীয় প্রতিনিধিরা।
পরিবেশবিদদের মতে, মহেশখালীর উপকূলীয় প্যারাবন প্রাকৃতিক দুর্যোগের অভিঘাত কমানোর পাশাপাশি জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়স্থল।
প্যারাবন কেটে চিংড়িঘের ও লবণ মাঠ তৈরি হলে উপকূলের স্বাভাবিক প্রতিবেশব্যবস্থা দুর্বল হয়।
তাই প্যারাবন রক্ষায় শুধু মামলা ও সাজা দেওয়াই যথেষ্ট নয়, বরং দখলমুক্ত করা, ক্ষতিগ্রস্ত বন পুনরুদ্ধার এবং নতুন করে গাছ কাটা বন্ধে নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।