
মঙ্গলবার রাতে ফটিকছড়ির হেঁয়াকো বেগবাজার এলাকার রাজ এলপিজি ফিলিং অ্যান্ড কনভার্সন সেন্টারে একটি দৃশ্য চোখে পড়ে- একজন গ্রাহক রান্নার সিলিন্ডার নিয়ে এসেছেন, স্টেশনের কর্মী সেটিতে গ্যাস ভরছেন, বাড়তি ৫০ টাকা নিচ্ছেন ‘নিয়মবহির্ভূতভাবে’ ভরার মাশুল হিসেবে।
গ্রাহকের মুখে স্বস্তির হাসি- বাজারের চেয়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা কম পড়েছে। কিন্তু এই সাশ্রয়ী লেনদেনের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ভয়াবহ বিপদ, যা যেকোনো মুহূর্তে ঘটিয়ে দিতে পারে বড় দুর্ঘটনা।
ফেনী-খাগড়াছড়ি আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে অবস্থিত এই স্টেশনটি মূলত গাড়ির জ্বালানি হিসেবে এলপিজি সরবরাহের অনুমোদন নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এখানে রান্নার সিলিন্ডারেও গ্যাস ভরা হচ্ছে- যা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং বিস্ফোরক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। স্থানীয়দের কাছে আগের ভিডিও ও ছবিও পাওয়া গেছে, যা প্রমাণ করে এই অবৈধ কারবার দীর্ঘদিন ধরেই চলছে।
বিষয়টি কতটা বিপজ্জনক, তা বোঝা যায় এলপিজি খাতের একজন কর্মকর্তার কথায়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, গাড়ির জ্বালানি ও রান্নার কাজে ব্যবহৃত এলপিজির সরবরাহ ও ব্যবহারের পদ্ধতি এক নয়। অনুমোদিত ব্যবস্থার বাইরে রান্নার সিলিন্ডারে গ্যাস ভরলে সিলিন্ডারের ধারণক্ষমতা, ওজন ও নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে- এতে যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
বিস্ফোরক অধিদপ্তরের সূত্রে জানা যায়, রান্নার কাজে ব্যবহৃত এলপিজিতে ৭০ শতাংশ কোপেন ও ৩০ শতাংশ ডিউটেন সংমিশ্রণ করা হয়। আর গাড়িতে ৬০ শতাংশ কোপেন ও ৪০ শতাংশ ডিউটেন সংমিশ্রণ করে ব্যবহার করতে হয়।
যমুনা এলপিজি গ্যাসের সিনিয়র মার্কেটিং কর্মকর্তা মো. আলা উদ্দিন বলেন, রান্নার কাজে ব্যবহৃত এলপিজি আর গাড়িতে ব্যবহৃত এলজিপি এক নয়। সঠিকভাবে রিফিল সংমিশ্রণ না হওয়ার কারণে গ্যাসগুলো সিলিন্ডারের নিচে বসে থাকে। এতে সিলিন্ডার বোতল নাড়াচাড়ার ফলে বিস্ফোরণের আশঙ্কা অনেক বেশি।
স্থানীয়রা জানান, এই স্টেশনে একটি সিলিন্ডারে ১৫ থেকে ১৬ কেজি পর্যন্ত গ্যাস ভরা হয়- যা নির্ধারিত ধারণক্ষমতার বাইরে। অতিরিক্ত গ্যাস ভরা সিলিন্ডার নিয়ে প্রতিদিন ঘরে ফিরছেন সাধারণ মানুষ, অথচ জানছেন না কী ঝুঁকি বহন করছেন।
স্টেশনের বিক্রয়কর্মী কামরুল হোসেন অকপটে স্বীকার করেন, “মালিক যেভাবে বিক্রি করতে বলেন, সেভাবেই বিক্রি করি। অনুমতিপত্র আছে কি না, সেটা জানি না।”
স্টেশনের স্বত্বাধিকারী আবুল কালাম আজাদ দাবি করেন সরকারের অনুমোদন নিয়েই কাজ করছেন, তবে অনুমোদনের কাগজপত্র দেখাতে পারেননি। এলাকার এলপিজি ব্যবসায়ীরা আগেই বিষয়টি তাঁকে জানিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি কর্ণপাত করেননি।
বিস্ফোরক আইন বলছে, গাড়ির জ্বালানি সরবরাহের কাজে নিয়োজিত এলপিজি স্টেশন থেকে রান্নার সিলিন্ডারে গ্যাস ভরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এই বিধান লঙ্ঘনে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড উভয়ের বিধান রয়েছে।
ফটিকছড়ি ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন কর্মকর্তা পংকজ বড়ুয়া বলেন, “এ ধরনের কাজ বেআইনি ও ঝুঁকিপূর্ণ। তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।”
ফটিকছড়ি উত্তর উপজেলার ইউএনও সাঈদ মুহাম্মদ ইব্রাহিম জানান, “তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
কিন্তু প্রশ্ন হলো, তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটে? মহাসড়কের পাশে জনবহুল এলাকায় এই অবৈধ কারবার চলছে প্রকাশ্যে, প্রতিদিন। সাশ্রয়ের লোভে মানুষ ছুটছেন সেখানে, আর প্রতিটি ভরা সিলিন্ডার হয়ে উঠছে একটি সম্ভাব্য বিপদের বোঝা।