সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

বাঁশখালীতে ভাইরাল ভিডিও ঘিরে সাম্প্রদায়িক উসকানির অভিযোগ, তদন্তে পুলিশ

ফেসবুকে সংখ্যালঘু পরিবারের দাবি, থানার এজাহারে ভিন্ন পরিচয়; ভিডিওটি ছড়ানোর পেছনে রাজনৈতিক বিরোধের অভিযোগ
মোহাম্মদ বেলাল উদ্দিন | প্রকাশিতঃ ২৮ অগাস্ট ২০২৬ | ৯:৫৬ অপরাহ্ন


চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়াকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক উসকানির অভিযোগ উঠেছে। ভিডিওতে আবদুল্লাহ আল মামুন নামের এক যুবক তাঁর বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর, হুমকি ও পরিবারের সদস্যদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ করেছেন। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন পেজ ও অ্যাকাউন্টে তাঁকে সংখ্যালঘু পরিবারের সদস্য হিসেবে উপস্থাপন করে পোস্ট দেওয়া হয়েছে।

তবে বাঁশখালী থানার পুলিশ বলছে, আবদুল্লাহ আল মামুন সনাতন ধর্মাবলম্বী নন। এদিকে থানায় তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে করা একটি লিখিত অভিযোগেও তাঁকে সনাতন ধর্মাবলম্বী হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। ফলে ভিডিওটি কীভাবে এবং কী উদ্দেশ্যে ছড়ানো হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

শেখেরখীল ইউনিয়নের লালজীবন এলাকার বাসিন্দা আবদুল্লাহ আল মামুনের ওই ভিডিও বর্তমানে ফেসবুক ও ইউটিউবসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ‘ডেইলি আজকের দর্পণ’ নামের একটি ফেসবুক পেজে প্রকাশিত ২ মিনিট ৮ সেকেন্ডের ভিডিওটি শুক্রবার রাত পর্যন্ত ২৩ হাজারের বেশি লাইক, প্রায় এক হাজার মন্তব্য ও সাড়ে তিন হাজার শেয়ার হয়েছে।

ভিডিওটি ভারতের কয়েকটি ফেসবুক পেজ থেকেও শেয়ার করা হয়েছে। এসব পোস্টের কয়েকটিতে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ তোলা হয়েছে। এতে বাঁশখালীর স্থানীয় একটি ঘটনার ভিডিও বৃহত্তর সাম্প্রদায়িক প্রচারণার অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে কি না, সেই প্রশ্নও উঠেছে।

ভিডিওতে যা বলেছেন মামুন

ভিডিওতে আবদুল্লাহ আল মামুনকে তাঁর বাড়িতে দাঁড়িয়ে কথা বলতে দেখা যায়। পাশে থাকা এক নারীকে তাঁর মা পরিচয় দিয়ে মামুন বলেন, ‘উনি আমার মা। আজ সকাল থেকে আমার বাড়িতে জঙ্গি হামলা চলতেছে।’

তিনি শেখেরখীল ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের কথা উল্লেখ করে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তাঁর পরিবার আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে।

একপর্যায়ে মায়ের পোশাকের দিকে ইঙ্গিত করে মামুন বলেন, ‘দেখেন, এগুলো হচ্ছে কাদা। আমার মা। দেখেন, আমার মায়ের ব্লাউজটা কী রকম।’

মামুনের দাবি, প্রায় দুই বছর ধরে তাঁদের পরিবার রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারছে না। তাঁর ভাষ্য, বাড়িতে ঢুকে তাঁর মেজো ভাবিকে মারধর করা হয়েছে, উঠানের গাছপালা নষ্ট করা হয়েছে এবং ঘরের শোকেজ ভাঙচুর করা হয়েছে।

ভিডিওতে তাঁকে আরও বলতে শোনা যায়, ‘আমরা এই ঘরে রাতে ঘুমাতে পারি না। ইট মারে, পাটকেল মারে। বিভিন্ন হুমকি-ধমকি দেয় রাস্তাঘাটে।’

এ সময় জমিজমা দখলেরও অভিযোগ করেন তিনি। তবে ভিডিওতে কাউকে নির্দিষ্ট করে অভিযুক্ত করেননি। রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন তিনি। মামুন বলেন, ‘আইনের প্রতি সম্মান রেখে আমি ভিডিওটা করলাম। আমি আইনকে শ্রদ্ধা করি।’

নির্বাচনের আগে তাঁর বাবাকে তাঁর সামনে মারধর করা হয়েছিল বলেও দাবি করেন মামুন।

তবে ভিডিওতে করা এসব অভিযোগের স্বতন্ত্র সত্যতা যাচাই করা যায়নি।

থানার অভিযোগে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ

মামুনের পরিবারের পক্ষ থেকে বৃহস্পতিবার বাঁশখালী থানায় করা একটি লিখিত অভিযোগে অন্য একটি ঘটনার কথা বলা হয়েছে।

মামুনের ভাবি নাসরিন সোলতানা থানায় দেওয়া অভিযোগে বলেন, তিনি ও তাঁর শাশুড়ি ছাড়া বাড়িতে কোনো প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ সদস্য থাকেন না। পুরুষ সদস্যরা কাজের কারণে এলাকার বাইরে থাকেন। এই সুযোগে স্থানীয় দুই ব্যক্তি তাঁকে বিভিন্ন সময় কুনজর ও হয়রানি করে আসছিলেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।

অভিযোগে শেখেরখীলের লালজীবন এলাকার মাহবুবুল আলমের ছেলে আরিফুল ইসলাম (৩৫) ও একই এলাকার সিরাজুল ইসলামের ছেলে ফাহিমুল ইসলামকে (৩০) বিবাদী করা হয়েছে।

নাসরিনের অভিযোগ, গত ২৫ আগস্ট দুপুর ১টার দিকে তিনি তাঁর দুই বছর বয়সী সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছিলেন। এ সময় আরিফুল ও ফাহিমুল তাঁদের ঘরে ঢুকে শিশুটিকে তাঁর কাছ থেকে সরিয়ে দিয়ে তাঁকে ধর্ষণের চেষ্টা করেন।

ঘটনার পর নাসরিন বিষয়টি তাঁর দেবর আবদুল্লাহ আল মামুনকে জানান বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। মামুন জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন করলে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে অভিযুক্তরা পালিয়ে যান বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।

অভিযোগে করা ধর্ষণচেষ্টার দাবিরও স্বতন্ত্র সত্যতা এই প্রতিবেদনের সময় পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

‘আমি তো হিন্দু পরিচয় দিইনি’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে সংখ্যালঘু পরিবারের সদস্য হিসেবে উপস্থাপন করার বিষয়ে আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, তিনি কোথাও নিজেকে হিন্দু বা সনাতন ধর্মাবলম্বী হিসেবে পরিচয় দেননি।

তিনি বলেন, ‘আমি তো ভিডিওতে কোথাও হিন্দু পরিচয় দেইনি দাদা। ওই ভিডিওটা আপনি ভালো করে দেখুন। ওখানে হিন্দু পরিচয় কী দিলাম?’

ভিডিওতে ‘জঙ্গি’ শব্দ ব্যবহারের ব্যাখ্যায় মামুন বলেন, তাঁদের ওপর হামলা করছে—এমন ব্যক্তিদের বোঝাতেই তিনি শব্দটি ব্যবহার করেছেন।

ভিডিওটি তিনি নিজে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়াননি বলেও দাবি করেন মামুন। তাঁর অভিযোগ, স্থানীয় সংসদ সদস্য মাওলানা জহিরুল ইসলামের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা ভিডিওটি ছড়িয়েছেন।

মামুন বলেন, ‘ভিডিওটা আমার হলেও আমি ছড়াইনি। আমাদের এলাকার সংসদ সদস্যের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা ছড়িয়েছে। উনি জামায়াতের এমপি। তাই হয়তো প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের লোকজন এটি ছড়িয়ে দিয়েছে।’

তাঁর দাবি, ছনুয়ার ছাত্রদল নেতা আতিকুর রহমান প্রথম ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করেন।

আতিকুরের নামও সামনে

অনুসন্ধানে জানা গেছে, আতিকুর রহমান ছনুয়া ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের খোরশেদ আলী চৌধুরী পাড়ার মোসলেহ উদ্দিন ওরফে লেদু মাঝির ছেলে। তিনি চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ছাত্রদলের সদস্য বলে জানা গেছে।

ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের বিষয়ে বক্তব্য জানতে শুক্রবার দুপুরে আতিকুর রহমানকে ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

পুলিশ যা বলছে

ভাইরাল ভিডিও ও এর পেছনের ঘটনা নিয়ে বাঁশখালী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সুধাংশু শেখর হালদার বলেন, ভিডিওটি ফেসবুকের পাশাপাশি বিভিন্ন ইউটিউব চ্যানেলেও ছড়িয়ে পড়েছে।

মামুনের ধর্মীয় পরিচয় সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ভিডিওতে মামুন নিজেকে সংখ্যালঘু দাবি করেছে। সে সনাতন ধর্মের লোক নয়।’

সুধাংশু শেখর হালদার আরও বলেন, ‘আতিক ও মামুন নামের দুজনকে গ্রেপ্তারে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ওসি স্যারও এ বিষয়ে অবগত আছেন।’

বাঁশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রবিউল হক বলেন, ‘ভিডিওটা নজরে আসার পর আমরা তদন্ত শুরু করেছি। ঘটনাটি গভীরভাবে তদন্ত করা হচ্ছে।’

স্থানীয় একটি ঘটনার ভিডিও কীভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ল এবং পরে সেটি সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরির উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হলো কি না, তা এখন তদন্তের বিষয়। একই সঙ্গে ভিডিওতে করা হামলা, ভাঙচুর, নির্যাতন ও জমি দখলের অভিযোগের সত্যতা, ভিডিওটি প্রথম কে ছড়িয়েছেন এবং এর পেছনে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বা পরিকল্পিত প্রচারণা ছিল কি না—এসব বিষয়ও খতিয়ে দেখছে পুলিশ।