
কক্সবাজারের প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন (ইসিএ) এলাকা সুগন্ধা-কলাতলী সৈকতের বালিয়াড়ি ভরাট করে সড়ক ও শহর রক্ষা বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
একই সঙ্গে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা)-এর অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পে সংস্থাটির নিজস্ব গাইডলাইনস এবং জলবায়ু ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে জাপানের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার যথাযথভাবে অনুসরণের মাধ্যমে ‘বাংলাদেশ-জাপান’ যৌথ উদ্যোগটি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে টিআইবি।
রোববার (৩০ আগস্ট) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এই আহ্বান জানান।
বিবৃতিতে ড. ইফতেখারুজ্জামান জানান, উন্নয়ন অবকাঠামো নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য হলেও প্রকল্পটির কারণে প্রাকৃতিক বালিয়াড়ি, উপকূলীয় উদ্ভিদ ও জীববৈচিত্র্যের সম্ভাব্য ক্ষতি, প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা ব্যাহত হওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদে উপকূলীয় জলবায়ু-সহনশীলতা ঝুঁকিগ্রস্ত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।
তিনি আরও জানান, সমুদ্রসৈকতের বালিয়াড়ি ও উপকূলীয় উদ্ভিদ শুধু পরিবেশগত সম্পদ নয়; এগুলো ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, সমুদ্রের ঢেউ ও উপকূলীয় ক্ষয়ের বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষাব্যূহ হিসেবে কাজ করে।
একটি গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় প্রতিবেশ ব্যবস্থার স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা নষ্ট করে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন কোনোভাবেই টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে না বলে তিনি উল্লেখ করেন।
চলমান প্রকল্পের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু ও পরিবেশগত ঝুঁকি যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির মুখে রয়েছে উল্লেখ করে তিনি জানান, প্রাকৃতিক উপকূলীয় প্রতিবেশব্যবস্থাকে দুর্বল করতে পারে উন্নয়নের নামে এমন কোনো প্রকল্প দীর্ঘমেয়াদে জনস্বার্থ ও জলবায়ু স্থিতিস্থাপকতার সহায়ক হতে পারে না।
প্রকল্পের অর্থায়নকারী সংস্থা হিসেবে জাইকার কাছে প্রকল্পটির পরিবেশগত ও সামাজিক সুরক্ষা নীতিমালা যথাযথভাবে প্রতিপালন ও প্রয়োগের প্রত্যাশা ব্যক্ত করে টিআইবি।
জাইকার নিজস্ব গাইডলাইনস ‘এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড সোশ্যাল কনসিডারেশনস’-এ সম্ভাব্য ক্ষতি এড়িয়ে চলা, বিকল্প ব্যবস্থা বিবেচনা, পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন ও অংশীজনদের অর্থবহ অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
সুগন্ধা-কলাতলি বালিয়াড়ির মতো পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল এলাকায় প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে এসব সুরক্ষাব্যবস্থা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা জাইকা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্বচ্ছতার সঙ্গে নিশ্চিত করা জরুরি বলে বিবৃতিতে জানানো হয়।
বিষয়টি কেবল একটি অবকাঠামো প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জাপান সরকার ও বাংলাদেশ উভয়ের ঘোষিত জলবায়ু ও জীববৈচিত্র্য-বিষয়ক আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারসমূহের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতার প্রশ্নও জড়িত।
দুটি দেশই ‘কনভেনশন অন বায়োলজিক্যাল ডাইভার্সিটি (সিবিডি)’-এর রাষ্ট্রপক্ষ এবং ‘কুনমিং-মন্ট্রিল গ্লোবাল বায়োডাইভার্সিটি ফ্রেমওয়ার্ক (কেএমজিবিএফ)-এ অঙ্গীকারবদ্ধ।
এছাড়া জাপানের ‘ন্যাশনাল বায়োডাইভার্সিটি স্ট্র্যাটিজি অ্যান্ড অ্যাকশন প্ল্যান’-এ ২০৩০ সালের মধ্যে “নেচার পজেটিভ” অর্থনীতিভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠাকে অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে এবং জাপান তার উন্নয়ন সহযোগিতাকে প্যারিস চুক্তির লক্ষ্যসমূহের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
অন্যদিকে জাইকার ‘এনভায়রনমেন্টাল পলিসি’ ও ‘সাসটেইনেবল পলিসিতে’ প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) ও প্যারিস চুক্তির লক্ষ্যসমূহের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখার কথা বলা হয়েছে।
এমন প্রেক্ষাপটে চলমান প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে জাপান সরকার ও জাইকার উল্লিখিত অঙ্গীকারসমূহের বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে বলে টিআইবি মনে করে।
এই অবস্থায় টিআইবি জাইকা ও জাপান সরকারের প্রতি তাদের নিজস্ব পরিবেশগত সুরক্ষা নীতির সামঞ্জস্যতা নিশ্চিতসহ প্রকল্পটির পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব সম্পর্কে জনসমক্ষে সুস্পষ্ট তথ্য প্রকাশের আহ্বান জানিয়েছে।
একইসঙ্গে প্রকল্পটির একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ পরিবেশগত ও কারিগরি পর্যালোচনা সম্পন্ন করা এবং সৈকতের বালিয়াড়ি ও স্থানীয় উপকূলীয় উদ্ভিদ পুনরুদ্ধারসহ একটি বিশ্বাসযোগ্য পরিবেশ পুনর্বাসন পরিকল্পনা গ্রহণ করে প্রকল্পটি পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি।