
মৃত্যুর আগের দিন সকাল থেকেই মায়ের সঙ্গে কথা বলছিলেন সামিহা হাকিম নেহা। একসময় ফোনে বললেন, ‘এরা আমাকে বাঁচতে দেবে না।’ মা তখন কতটা বুঝেছিলেন, জানা নেই। পরদিন রাতে ফটিকছড়ির শ্বশুরবাড়ির ঘর থেকে চিৎকারের শব্দ। তারপর গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া।
রাতেই চিকিৎসক জানালেন, নেহা আর নেই। বিয়ের মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় থেমে গেল ১৯ বছরের এই জীবন, সঙ্গে হারিয়ে গেল তাঁর গর্ভের অনাগত সন্তানও।
গত ১ সেপ্টেম্বর রাতে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার সুন্দরপুর ইউনিয়নের কান্দিরপাড়া এলাকার সোলেমান কন্ট্রাক্টর বাড়িতে নেহার মৃত্যু হয়। শ্বশুরবাড়ির দাবি, তিনি আত্মহত্যা করেছেন।
কিন্তু নেহার মা রুপা আক্তারের অভিযোগ, এটি পরিকল্পিত হত্যা। ইতিমধ্যে তিনি ফটিকছড়ি থানায় মামলা করেছেন। মামলায় নেহার স্বামী মোহাম্মদ মারুফ পারভেজ (৩০)-সহ দুজনকে আসামি করা হয়েছে।
একটি ছিটকানি, একটি দাগ- যা প্রশ্ন তুলছে
ঘটনার পরপরই পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে কিছু আলামত সংগ্রহ করে। ফটিকছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রবিউল আলম খান জানান, ঘরের দরজার ছিটকানি বাঁকা অবস্থায় পাওয়া গেছে। নেহার থুতনির নিচে দাগও দেখা গেছে।
নাজিরহাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসক ডা. এস এম সাইদুল আলম বলেন, নেহাকে জরুরি বিভাগে আনার পর ইসিজি করে মৃত্যু নিশ্চিত হয়। থুতনির নিচের দাগ সম্পর্কে তিনি বলেন, এটি একটি অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা হতে পারে।

দাম্পত্যের পাঁচ মাসে যা জমেছিল
নেহা ও মারুফকে কাছ থেকে দেখেছেন এমন স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মারুফের সঙ্গে প্রথম দফার বিয়ে ভেঙে যাওয়ার পর নেহার মায়ের আগ্রহেই এই বিয়ে হয়। তবে বিয়ের পর থেকেই সংসারে মনোমালিন্য চলছিল।
স্বজনদের অভিযোগ, মারুফ পরিচিতজনের কাছে ধার্মিক হিসেবে পরিচিত হলেও তাঁর আচরণে ধর্মান্ধতা ও কুসংস্কারের প্রভাব ছিল। তাঁদের দাবি, অনলাইন জুয়ায়ও আসক্ত ছিলেন মারুফ। নিজের জীবনে কোনো সমস্যা বা ব্যর্থতা দেখা দিলে এর দায় নেহার ওপর চাপাতেন তিনি। নেহাকে বিয়ে করার কারণেই জীবনে একের পর এক ব্যর্থতা আসছে বলে মন্তব্য করতেন। ‘অভিশপ্ত মেয়ে’ ও ‘অপয়া’ বলে রূঢ় আচরণ করতেন।
পরিস্থিতি সামাল দিতে নেহার মা একপর্যায়ে মারুফকে টাকাও দিয়েছিলেন বলে স্বজনেরা জানান।
সবচেয়ে বড় বিরোধ তৈরি হয়েছিল অনাগত সন্তানকে ঘিরে। স্বজনদের দাবি, গর্ভপাত করানো নিয়ে মারুফের চাপ ছিল, কিন্তু নেহা রাজি হননি।
মৃত্যুর রাতের বিবরণ
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাতে মারুফের ঘর থেকে চিৎকারের শব্দ শুনে আশপাশের লোকজন ছুটে যান। গুরুতর অবস্থায় নেহাকে প্রথমে ফটিকছড়ি স্কয়ার ক্লিনিক, পরে নাজিরহাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানেই তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
স্বজনদের অভিযোগ, মৃত্যুর মাত্র কয়েক মিনিট আগে নামাজ ও দোয়া নিয়ে নেহাকে অপমানজনক কথা বলতে শুরু করেন মারুফ। এ সময় মারুফের মাও নাকি ছেলের পক্ষ নিয়ে বলেন, ‘ছেলে তো খারাপ কিছু বলেনি, নামাজের কথাই বলছে।’ স্বজনদের আরও দাবি, নেহা মাকে বলেছিলেন, মারুফ তাঁকে বলেছেন, ‘তুই মরে গিয়ে আমাকে মুক্ত করে দে।’
তদন্তের দিকে তাকিয়ে সবাই
দরজার বাঁকা ছিটকানি, থুতনির দাগ, মৃত্যুর আগের দাম্পত্য বিরোধ এবং সেই রাতের ঘটনাপ্রবাহ- আত্মহত্যা নাকি হত্যা, এই প্রশ্নের উত্তর এখন তদন্তের ওপর নির্ভর করছে।
ওসি রবিউল আলম খান জানিয়েছেন, ঘটনাস্থলের আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে, তদন্ত চলছে।
পৃথিবীর আলো দেখার আগেই হারিয়ে যাওয়া সন্তানটিসহ নেহার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী- সেই সত্য সামনে আসুক, এটাই স্বজনদের দাবি।