সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

আনোয়ারায় ভূমিসেবায় রেকর্ড, এক মাসে ১১৯৩ নামজারি

আনোয়ারা-কর্ণফুলী (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি | প্রকাশিতঃ ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১১:১৫ পূর্বাহ্ন


বৈরাগ ইউনিয়নের ফাতেমা বেগমের কাছে ভূমি অফিস মানে ছিল দীর্ঘ লাইন, দালালের ফাঁদ আর শেষ পর্যন্ত হতাশা। বাবার মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমির নামজারি করাতে আগে মাসের পর মাস ঘুরেছেন। “দালাল ছাড়া কাজ হবে না”- এই কথা শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এবার চিত্র পুরোপুরি উল্টো। সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যে হাতে পেয়েছেন মিউটেশন খতিয়ান। কোনো দালাল নয়, কোনো বাড়তি টাকা নয়।

ফাতেমা বেগম একা নন। চাতরীর মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন, পরৈকোড়ার রহিম মিয়া কিংবা হাইলধরের করিম- গত ৩০ দিনে আনোয়ারা উপজেলা ভূমি অফিস থেকে নামজারি সম্পন্ন করেছেন এমন মানুষের সংখ্যা ১ হাজার ১৯৩। চট্টগ্রামের ভূমি প্রশাসনের ইতিহাসে এটি এক অভূতপূর্ব রেকর্ড।

ভূমিসেবার পুরনো ছবি

জমির খতিয়ান তোলা, নামজারি সম্পন্ন করা কিংবা ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করা সাধারণ মানুষের জন্য একসময় সময়সাপেক্ষ, জটিল ও ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া ছিল। কাঙ্ক্ষিত সেবা পেতে ইউনিয়ন ভূমি অফিস, উপজেলা ভূমি অফিস বা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে দিনের পর দিন ঘুরতে হতো। দীর্ঘসূত্রতা, তথ্যের অস্বচ্ছতা এবং দালালচক্রের দৌরাত্ম্য মানুষের ভোগান্তিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল।

নামজারি না করলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের ঝামেলায় পড়তে পারেন, যেমন খাজনা বা ভূমি কর পরিশোধে বাধা, জমি বিক্রির সময় রেজিস্ট্রেশন জটিলতা, ওয়ারিশদের মধ্যে মালিকানা নিয়ে বিরোধ এবং আদালতে জমির মালিকানা প্রমাণ করা কঠিন হয়ে যাওয়া। এত জরুরি একটি সেবা পেতে গিয়ে সাধারণ মানুষ বারবার বিপদে পড়েছেন।

ভূমি সেবা ওয়েবসাইটে দেখা যায়, নামজারি প্রক্রিয়ায় গড়ে ৩৬ দিন সময় লাগছে, যদিও অটোমেশন প্রকল্পে এর জন্য ১৫ দিনের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই বাস্তবতার মধ্যে আনোয়ারার চিত্র তাই আলাদাভাবে দৃষ্টি টানে।

এক কর্মকর্তার বদলে দেওয়ার গল্প

আনোয়ারা উপজেলার মোট আয়তন ১৬৪.১০ বর্গ কিলোমিটার। কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ-পূর্ব পাশে ও বঙ্গোপসাগরের উপকূলে এই উপজেলার অবস্থান। জনসংখ্যা ২ লাখ ৫৯ হাজারের বেশি। জনগোষ্ঠীর আয়ের প্রধান উৎস কৃষি ৪১.২৫%, এবং কৃষিভূমির মালিকানায় ভূমিমালিক ৪৮.৭৮%, ভূমিহীন ৫১.২২%। মানে এই উপজেলার মানুষের একটি বড় অংশের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে আছে ভূমি- আর তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে নামজারি।

এই বাস্তবতা মাথায় রেখেই কাজে নেমেছেন নবনিযুক্ত সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. আবু জাফর মজুমদার। যোগদানের পর থেকেই তিনি তিনটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়েছেন- দালালের দৌরাত্ম্য বন্ধ করা, নিয়মিত ও সুশৃঙ্খল শুনানি নিশ্চিত করা এবং কোনো ফাইল অকারণে যেন ঝুলে না থাকে সে বিষয়ে কঠোর নজরদারি রাখা।

তিনি বলেন, “ভূমিসেবা পাওয়া জনগণের অধিকার। কোনো ফাইল যেন অপ্রয়োজনে আটকে না থাকে, সেদিকে আমরা কঠোর নজর রাখছি। এই ধারা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।”

কীভাবে সম্ভব হলো এই রেকর্ড

ভূমি অফিস সূত্রে জানা গেছে, কাজের গতি বাড়াতে কয়েকটি নির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি ফাইল চুলচেরাভাবে বিশ্লেষণ করে আইনি প্রক্রিয়া মেনে দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে। শুনানির দিনক্ষণ নিয়ম মেনে নির্ধারণ করা এবং সেবাগ্রহীতাদের সঠিক সময়ে ডাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। অফিসের ভেতর দালালদের প্রবেশ ও প্রভাব বিস্তার রোধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হয়েছে।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (মাঠ প্রশাসন অনুবিভাগ) নাসরিন জাহান জানান, অনলাইনে নামজারির আবেদন ভূমি সেবাগ্রহীতাদের সমস্যা অনেকাংশে কমিয়ে দিয়েছে এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নামজারি করতে না পারলে সহকারী কমিশনারদের জবাবদিহিতার আওতায় নিয়ে আসা হচ্ছে। আনোয়ারার এসিল্যান্ড ঠিক সেই প্রত্যাশারই প্রতিফলন ঘটিয়েছেন মাঠ পর্যায়ে।

সেবাগ্রহীতাদের অভিজ্ঞতা

চাতরী এলাকার মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন বললেন, “আগে একটা নামজারি করাতে মাসের পর মাস ভূমি অফিসে ঘুরতে হতো। দালালের খপ্পরে পড়ে টাকা খোয়া যেত। কিন্তু এবার কোনো প্রকার বাড়তি ঝামেলা ছাড়াই খুব দ্রুত আমার জমির মিউটেশন খতিয়ান হাতে পেয়েছি।”

বৈরাগ ইউনিয়নের ফাতেমা বেগম জানালেন ভিন্ন একটি দিকের কথা। “নারী হিসেবে ভূমি অফিসে এসে আগে নানা সমস্যায় পড়তে হতো। এখন পরিবেশ অনেক বদলেছে। স্যার নিজে আমাদের কথা শোনেন এবং দ্রুত ফাইল সই করে দেন। এক মাসে এতগুলো ফাইল নিষ্পত্তি হওয়া আমাদের মতো সাধারণ মানুষের জন্য অনেক বড় পাওয়া।”

সৎ কর্মকর্তার সদিচ্ছাই পার্থক্য গড়ে

স্থানীয় সচেতন মহলের অনেকে বলছেন, ব্যবস্থার সমস্যা তো আছেই- কিন্তু একজন সৎ ও কর্মঠ কর্মকর্তার সদিচ্ছা থাকলে যে সরকারি সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া সম্ভব, আনোয়ারার এসিল্যান্ড তার জীবন্ত প্রমাণ হয়ে উঠেছেন। এক মাসে ১ হাজার ১৯৩টি ফাইল নিষ্পত্তি শুধু সংখ্যা নয়- এটি ১ হাজার ১৯৩টি পরিবারের স্বস্তির গল্প, দালালমুক্ত সেবার গল্প, এবং প্রমাণ যে ইচ্ছে থাকলে পরিবর্তন সম্ভব।