সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬, ৬ মাঘ ১৪৩২

চবি শিক্ষক সুপ্তিকণা ও শিপকের ভাগ্য নির্ধারণ শনিবার

| প্রকাশিতঃ ২২ ফেব্রুয়ারী ২০১৯ | ১১:৫৪ অপরাহ্ন


চট্টগ্রাম: পর্যবেক্ষকের স্বাক্ষরবিহীন অতিরিক্ত উত্তরপত্র যুক্ত করা হয়েছে পরীক্ষার্থীদের মূল খাতায়। তার আগে পরীক্ষার হলের বাইরে পছন্দের শিক্ষার্থীদের উত্তরপত্রগুলোতে দেয়া হয়েছে লেখার সুযোগও। এমন জালিয়াতি সংঘঠিত হয়েছে দেশের উচ্চশিক্ষার অন্যতম প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে।

এ বিভাগের দুই শিক্ষকের বিরুদ্ধে ওঠা এমন অভিযোগ তদন্ত করে সত্যতা পেয়েছে তদন্ত কমিটি। এই দুই শিক্ষক হলেন- প্রফেসর ড. সুপ্তিকণা মজুমদার ও সহকারী অধ্যাপক শিপক কৃষ্ণ দেবনাথ। শনিবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় এই জালিয়াতির বিষয়ে গঠিত দ্বিতীয় তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন খোলা হবে। এই প্রতিবেদনে যদি তারা দোষী সাব্যস্ত হন তাহলে এই দুই শিক্ষকের বিরুদ্ধে নেওয়া হবে চূড়ান্ত ব্যবস্থা।

২০১৩ সালের ৩য় বর্ষ (সম্মান) পরীক্ষার ৩০৮ নং কোর্সের (প্রাচীন ভারতীয় সমাজ ও সংস্কৃতি) পরীক্ষার কাজে দায়িত্বে অবহেলা, অনিয়ম, দুর্নীতি এবং পরীক্ষার খাতা জালিয়াতির অভিযোগ তুলে বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য বরাবর আবেদন করেন উক্ত বিভাগের তৎকালীন প্রভাষক (বর্তমানে সহকারী অধ্যাপক) লিটন মিত্র। ২০১৪ সালের ৮ মার্চ দেওয়া এই অভিযোগ তদন্তে তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য প্রফেসর আনোয়ারুল আজিম আরিফ উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর ড. এম. আবদুল গফুরকে আহ্বায়ক করে একটি কমিটি গঠন করেন। কমিটিতে ফলিত ও পরিবেশ রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. হেলাল উদ্দীন আহমেদ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক খালেদ মিছবাহুল মোকর রবীনকে সদস্য করা হয়। উক্ত তদন্ত কমিটি তদন্ত শেষে লিটন মিত্রের আনীত অভিযোগের সত্যতা খুঁজে পায়।

তদন্ত কমিটি পরীক্ষা সংক্রান্ত জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়ায় প্রফেসর ড. সুপ্তিকণা মজুমদার ও সহকারী অধ্যাপক শিপক কৃষ্ণ দেবনাথকে শাস্তি দেওয়ার সুপারিশ করে।

প্রথম তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে উল্লেখিত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, কলা অনুষদের ১৪২ নং কক্ষে ২০১৪ সালের ৭ মার্চ অনুষ্ঠিত ৩০৮ নং কোর্সের পরীক্ষায় পর্যবেক্ষকের দায়িত্বে ছিলেন লিটন মিত্র ও প্রফেসর ড. শান্তিরাণী হালদার। কিন্তু সেদিন শান্তিরাণী হালদার অনুপস্থিত ছিলেন। ফলে লিটন মিত্র একাই ওই পরীক্ষায় পর্যবেক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। পরীক্ষা শেষে ১০ জন পরীক্ষার্থীর উত্তরপত্র সংগ্রহ করে তিনি পরীক্ষা কমিটির সভাপতি সুপ্তিকণা মজুমদারের কাছে জমা দেন। ওই সকল উত্তরপত্রের সঙ্গে কোন অতিরিক্ত উত্তরপত্র সংযোজিত ছিল না। প্রথম পরীক্ষক হিসেবে লিটন মিত্রের কাছে উক্ত পরীক্ষা কমিটির সভাপতি সুপ্তিকণা মজুমদার উত্তরপত্রগুলো মূল্যায়নের জন্য পাঠান। এই সময়েও ওই খাতাগুলোর সঙ্গে কোন অতিরিক্ত উত্তরপত্র সংযোজিত ছিল না।

এরমধ্যে প্রশ্নপত্রের শিরোনাম ভুলসহ উক্ত পরীক্ষায় বিভিন্ন অনিয়ম হয়েছে বলে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন লিটন মিত্র। এবং তিনি এই অভিযোগের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত উত্তরপত্র মূল্যায়নে অপারগতা প্রকাশ করে লিখিতভাবে পরীক্ষা কমিটির সভাপতি কাছে উত্তরপত্রগুলো ফেরত পাঠান।

পরীক্ষা সংক্রান্ত সমস্যার কারণে বিভাগে অচলাবস্থা সৃষ্টি হওয়ায় প্রায় বছরখানেক পর বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ও বিভাগের সকল শিক্ষকের উপস্থিতিতে সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দ্রুত ফল প্রকাশের লক্ষে ৩০৮ নং কোর্সের মোট ১৬ পরীক্ষার্থীর খাতা মূল্যায়নের জন্য লিটন মিত্রকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এ সময় লিটন মিত্রের কাছে সুপ্তিকণা মজুমদার খাতাগুলো পাঠায়। এই খাতাগুলোর মধ্যে ১০টির সঙ্গে এক বা একাধিক অতিরিক্ত উত্তরপত্র পাওয়া যায়, যদিও প্রথম দফায় পাঠানো খাতাগুলোর সঙ্গে কোন অতিরিক্ত উত্তরপত্র ছিল না।

শুধু তাই নয়; এই অতিরিক্ত উত্তরপত্রগুলোতে স্বাক্ষর ছিল পরীক্ষা কমিটির সভাপতি সুপ্তিকণা মজুমদারের। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী, কোন পরীক্ষায় পরীক্ষা কমিটির সভাপতি পর্যবেক্ষকের দায়িত্ব পালন করতে পারেন না। ফলে পর্যবেক্ষক হিসেবে কোন খাতায় তার স্বাক্ষর করার সুযোগই নেই।

এটুকুতেই শেষ নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী কোন পরীক্ষার্থীকে উত্তরপত্র সরবরাহ করা হলে ওই উত্তরপত্রের উল্লেখিত কোড নাম্বার পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অফিস কর্তৃক দেওয়া ফরমে রেকর্ড রাখার বিধান রয়েছে। কিন্তু এই উত্তরপত্রগুলোর ক্ষেত্রে উক্ত নিয়ম মানা হয়নি। শুধু তাই নয়, পরীক্ষা কমিটির সভাপতি সুপ্তিকণা মজুমদার সাক্ষরিত উত্তরপত্রগুলোর সঙ্গে যে ‘টপসীট’ দেওয়া আছে সেখানেও কোন পরীক্ষার্থী কর্তৃক ব্যবহৃত অতিরিক্ত খাতার সংখ্যা উল্লেখ নেই। পরীক্ষা কমিটির সভাপতিও অতিরিক্ত খাতা যে নিয়েছেন তা তদন্ত কমিটির কাছে প্রমাণ করতে পারেননি।

তদন্ত কমিটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, পছন্দের শিক্ষার্থীকে হলের বাইরে নিয়ে গিয়ে অতিরিক্ত উত্তরপত্রে লেখার সুযোগ করে দিয়েছেন সুপ্তিকণা মজুমদার।

এদিকে প্রথম তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, অন্যায়ভাবে অতিরিক্ত খাতা যুক্ত করার বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্যকে অবহিত করেন লিটন মিত্র। এবং উপাচার্যের মৌখিক নির্দেশে উত্তরপত্র পরীক্ষণ শেষে কভার পেইজের ফটোকপি করে রাখেন বলেও লিটন মিত্র তদন্ত কমিটিকে জানান। তদন্তের স্বার্থে কমিটি উক্ত পরীক্ষার উত্তরপত্রগুলো পরীক্ষা কমিটির সভাপতি সুপ্তিকণা মজুমদারের কাছ থেকে সংগ্রহ করে। তবে সেখানে ১২২০৩৬ নং অতিরিক্ত খাতাটি তিনি কমিটির কাছে সরবরাহ করেননি সুপ্তিকণা।

লিটন মিত্রের দেয়া ফটোকপির সঙ্গে সুপ্তিকণার দেওয়া মূল খাতাগুলো মিলিয়ে দেখে কমিটি। সেখানে দেখা গেছে, লিটন মিত্রের জমা দেওয়া ফটোকপিতে ১২২০৩২, ১২২০৩৪, ১২২০৩৬ নং খাতায় কারো স্বাক্ষর নেই। কিন্তু ১২২০৩২, ১২২০৩৪ নং মূল অতিরিক্ত উত্তরপত্রে উক্ত বিভাগের শিক্ষক শিপক দেবনাথের স্বাক্ষর রয়েছে। ১২২০৩৬ নং খাতায় কারো স্বাক্ষর নেই। যেটিতে কারো স্বাক্ষর নেই, সে খাতার প্রথম পৃষ্ঠায় লিখে আবার কেটে দেওয়া হয়েছে বিধায়, এই খাতাটি পরীক্ষা কমিটির সভাপতি সুপ্তিকণা তদন্ত কমিটির কাছে জমা দেননি। কিন্তু লিটন মিত্রের ফটোকপিতে ওই খাতার অস্তিত্ব খুঁজে পায় তদন্ত কমিটি।

মূল্যায়নের পর লিটন মিত্র পরীক্ষা কমিটির সভাপতি সুপ্তিকণাকে উত্তরপত্রগুলো যথারীতি ফেরত দেয়। এরপর শিপক দেবনাথকে দিয়ে অবৈধভাবে নেওয়া অতিরিক্ত উত্তরপত্রগুলোতে স্বাক্ষর করান সুপ্তিকণা। যদিও শিপক ওইদিন উক্ত পরীক্ষায় পর্যবেক্ষকের দায়িত্বে ছিলেন না। তদন্ত কমিটি মনে করে, পরীক্ষা কমিটির সভাপতি সুপ্তিকণা শিপককে পর্যবেক্ষক হিসেবে প্রমাণ করার জন্য এই জঘন্য কাজটি করেছেন।

তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক প্রফেসর ড. এম. আবদুল গফুর এবং সদস্য অধ্যাপক ড. হেলাল উদ্দীন আহমেদ জানান, পরীক্ষার্থীরা অতিরিক্ত উত্তরপত্র নেওয়ার কোন প্রমাণ পরীক্ষা কমিটির সভাপতি সুপ্তিকণা মজুমদার তদন্ত কমিটির কাছে প্রমাণ করতে পারেননি। এখানে দুর্নীতি করার সুযোগ নেয়া হয়েছে বলে তদন্ত কমিটি মনে করে। পরীক্ষা অনুষ্ঠানের জন্য রুটিনে দেওয়া সময়ের পূর্বে এ কোর্সের পরীক্ষা নেওয়া হয়েছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে। পরীক্ষা সংক্রান্ত এ ধরনের অন্যায় কাজের শাস্তি হওয়া উচিত বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করে; যাতে বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ধরনের কাজ করার সাহস যেন কেউ না পায়।

এদিকে তদন্ত কমিটি উক্ত বিভাগে পরীক্ষা নিয়ে প্রহসন হয়েছে বলেও তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে। এ বিষয়ে সুপ্তিকণা মজুমদার ও শিপক দেবনাথের মোবাইল নাম্বারে যোগাযোগ করেও তাদের বক্তব্য জানতে পারেনি একুশে পত্রিকা।

এ ঘটনা তদন্তে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আরো একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটিতে মার্কেটিং বিভাগের প্রফেসর এস. এম সালামত উল্ল্যা ভূঁইয়াকে সভাপতি করা হয়। সদস্য করা হয় মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মাজহারুল ইসলাম ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্ট্রার ইসকান্দর মোঃ রেশাদুল করিমকে। এই কমিটির প্রতিবেদন শনিবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় উপস্থাপনের কথা রয়েছে। প্রতিবেদনের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে সুপ্তিকণা মজুমদার ও শিপক দেবনাথের ভাগ্য!