চট্টগ্রাম: চট্টগ্রাম নগরের জিইসি মোড়। চার সড়কের মিলনস্থল। ব্যস্ত এ মোড়ে যত্রতত্র দাঁড়িয়ে যায় গণপরিবহন। এসব গাড়িকে নির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে দাঁড়ানোর জন্য এতদিন ‘ইশারা’ দিয়ে আসছিল পুলিশ। কিন্তু এগিয়ে যাওয়ার এ ‘সংকেত’ না দেখার ভান করে দাঁড়িয়ে থাকতো গাড়ি চালক। এই ধরনের অবাধ্য চালকদের ‘বাধ্য’ করার জন্য এবার ‘মাইক থেরাপি’ নিয়ে মাঠে নেমেছে ট্রাফিক পুলিশ।
নগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সাতটি স্থানে যানজট নিরসনে মাইক ব্যবহার করছে পুলিশ। এসব স্থানে চালকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে নির্দেশনামূলক বক্তব্য রাখছেন ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা। বর্তমানে জিইসি মোড়, নিউ মার্কেট মোড়, ষোলশহর, নতুন ব্রীজ, ইপিজেড মোড়, অলংকার মোড় ও আগ্রাবাদ বাদামতলী মোড়ে হচ্ছে মাইকের ব্যবহার। এজন্য দৈনিক দুইশ টাকা ব্যয়ে প্রতিটি মাইক ভাড়া নিয়েছে পুলিশ।
সরেজমিন বুধবার বেলা ১২টার দিকে জিইসি মোড়ে গিয়ে দেখা গেছে, মোড়টির পশ্চিম পাশের সড়কে একটি গণপরিবহন দাঁড়িয়ে যাত্রী তোলছিল। এতে যানজট তৈরি হয়। সাথে সাথে মাইক হাতে নেন ট্রাফিক কনস্টেবল নিতাই। মাইকে বলে উঠেন, ‘১১ সিরিয়ালের ৪২৭০ (গাড়ির নাম্বার), দাঁড়াবেন না। দ্রুত চলে যান। অন্যথায় আপনার বিরুদ্ধে মামলা করা হবে।’ অতপর গাড়িটি চলা শুরু করলো।
এসময় কথা হয় ট্রাফিক কনস্টেবল নিতাইয়ের সাথে; তিনি বলেন, ব্যস্ততম মোড়ে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে মানুষ তোলা-নামা করে গণপরিবহনগুলো। মোড় ছেড়ে যাওয়ার জন্য আগে বাঁশি বাজিয়ে, গাড়ির বড়িতে লাটির বারি দিয়ে সংকেত দিতাম। কিন্তু বেয়াড়া চালকরা এতে পাত্তা দিত না। কিছুই শুনেনি এমন ভাব ধরে বসে থাকতো। এখন মাইক দিয়ে গাড়ির নাম্বার ধরে ধরে বলছি। এতে তারা ভয় পেয়ে দ্রুত রাস্তা ছেড়ে দিচ্ছে।’
এসময় জিইসি মোড়ে বাসের জন্য অপেক্ষায় থাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আলম শাহ বলেন, ‘আমাদের মধ্যে ট্রাফিক আইন অমান্য করার প্রবণতা বেশি। রাস্তার উপর গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাখা ও পার্কিংয়ের কারণে যানজট হয়। এখন মাইক ব্যবহার করায় এ বিষয়ে সুফল মিলছে।’
কথা বলার একপর্যায়ে মাইক হাতে আবারো নির্দেশনা দিতে শুরু করলেন কনস্টেবল নিতাই। কিন্তু এবার এই পুলিশের সদস্যের অনুরোধ-নির্দেশনাকে ‘পাত্তা’ না দিয়ে দুই মিনিটের মত ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইলেন এক বাস চালক। বিষয়টা নজরে আসার পর চালকের কাছে ছুটে যাচ্ছিলেন অদূরে থাকা ট্রাফিক সার্জেন্ট মোখলেছুর রহমান। টের পেয়ে তখনই গাড়ি নিয়ে ভৌ দৌড় দিলেন চালক।
যানজট নিরসনে মাইক ব্যবহারে কেমন সুবিধা পাচ্ছেন- প্রশ্ন শুনেই সার্জেন্ট মোখলেছুর বলেন, ‘কোরবানি ঈদের আগে পরীক্ষামূলকভাবে মাইক ব্যবহার শুরু হয়। এরপর ঈদের ছুটিতে সড়কে গাড়ি কম থাকায় বন্ধ রাখা হয়েছিল। তবে মাইক ব্যবহারে ভালো ফল পেয়ে কয়েকদিন আগে আবার আনা হয়েছে। ফলে এখানে যানজট তেমন নেই। সব চালকের মধ্যে শৃঙ্খলাবোধ নেই। মাইক দিয়ে বলার পরও ট্রাফিক আইন না মানলে মোটা অংকের জরিমানা করা হচ্ছে।’
এদিকে বৃহস্পতিবার দুপুর ২টায় নিউ মার্কেট মোড়ে গিয়ে দেখা গেছে, ট্রাফিক কনস্টেবল তপু মাইকে বলছেন- ‘মোড় থেকে কোন যাত্রী উঠা-নামা করবেন না। ১০০ গজ দূরে নির্ধারিত স্থান থেকে গােিত উঠুন। অযথা গাড়ি দাঁড় করিয়ে যানজট সৃষ্টি করবেন না। ট্রাফিক আইন মেনে চলুন, ট্রাফিক পুলিশকে সহযোগিতা করুন।’ এভাবেই চলছিল, মানুষকে সচেতন করার কাজ।
সরেজমিন দেখা যায়, টাইগারপাসগামী গাড়িগুলো মোড় থেকে কিছুটা দূরে যাত্রী ছাউনীর কাছে গিয়ে থামছে। সেখানে যাত্রী উঠা-নামার কাজ সুন্দরভাবে সম্পন্ন হওয়ায় যানজট হচ্ছে না। এসময় দায়িত্ব পালনরত ট্রাফিক পরিদর্শক অনিল বিকাশ চাকমা বলেন, ‘মাইক ব্যবহার করে জনগণকে সচেতন করা ও চালককে আইন মেনে চলতে নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। এতে সুফল মিলছে।’
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের ট্রাফিক পরিদর্শক (প্রশাসন-উত্তর) কানু চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ‘বর্তমানে নগরের ৭টি স্পটে ভাড়ায় মাইক ব্যবহার করা হচ্ছে। ভাড়ার টাকা সংশ্লিষ্ট সার্জেন্টকে পরিশোধ করা হচ্ছে।’
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মাসুদ উল হাসান বলেন, ‘ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে মাইক ব্যবহার করে ভালো ফল পাওয়া যাচ্ছে। তাই ১৪টি স্থানে ব্যবহারের জন্য ১৪টি মাইক কেনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৫টি মাইক কেনার জন্য সব প্রক্রিয়া শেষ করা হয়েছে। সবসময় মাইকে কথা বলতে গিয়ে পুলিশ সদস্যরা ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন। তাই সচেতনতামূলক নানা কথা রেকর্ড করে তা মাইকে প্রচারের জন্যও ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।’