বুধবার, ২১ জানুয়ারি ২০২৬, ৮ মাঘ ১৪৩২

শ্রেষ্ঠ ওসি মোহাম্মদ মহসীন

| প্রকাশিতঃ ১৫ ডিসেম্বর ২০১৬ | ১০:৪৬ অপরাহ্ন

mohsinচট্টগ্রাম: সংসার চালাতে মমতাজ (ছদ্মনাম) বেছে নেন মাদক ব্যবসা। পরিচিতি পান মাদক সম্রাজ্ঞী হিসেবে। জেলও খেটেছেন কয়েকবার। মাদকের টানে সর্বনাশের পথে পা বাড়িয়েছিলেন বায়েজিদের শহীদনগর এলাকার মমতাজ। কিন্তু এখন নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন তিনি। মমতাজ এখন পুরোদস্তুর ব্যবসায়ী! চট্টগ্রামের আলোচিত ওসি মোহাম্মদ মহসীনের সহায়তায় অন্ধকার থেকে আলোর পথে ফিরে এসেছেন মমতাজ।

শুধু মমতাজ নয়; মাদকের অন্ধকার জীবন থেকে ফিরে আসতে সক্ষম হয়েছেন বাকলিয়ার মমতা, বাবলু ও শামচু। মাদকের চোরাবালি থেকে উঠে দাঁড়িয়ে তিনজনই এখন সুস্থজীবন যাপন করছেন। অন্ধকার থেকে আলোর পথে আনতে বছর দুয়েক আগে তাঁদের কাউন্সেলিং ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছেন তৎকালীন বাকলিয়া থানার ওসি মোহাম্মদ মহসীন।

বর্তমানে বায়েজিদ বোস্তামি থানা পুলিশের ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মোহাম্মদ মহসীন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘অপরাধী অপরাধ সৃষ্টি করে। অপরাধ অপরাধী সৃষ্টি করেনা। তাই যদি অপরাধীকে সংশোধন করা যায়। তাহলে অপরাধ আপনা আপনিই কমে যাবে। আমি তাই অপরাধীদেরকে সংশোধনের সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়ার চেষ্টা করি।’

বায়েজিদের শহীদ নগরের বাসিন্দা মমতাজের মাদক ব্যবসা ছেড়ে দেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘মমতাজ পুলিশের হাতে বার বার গ্রেফতার হলেও মাদক ব্যবসা ছাড়ছিল না। স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে তাকে আমি কাউন্সেলিং (বোঝানো) করি। পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দিই। এতে কাজ হয় সাথে সাথেই। গত ১ ডিসেম্বর লালদীঘির মাঠে কমিউনিটি পুলিশিং অনুষ্ঠানে আইজিপি মহোদয় তার হাতে সেলাই মেশিন তুলে দেন।’

এ প্রসঙ্গে মমতাজ বলেন, ‘এতদিন সবাই শুধু গ্রেফতার করেছে। কিন্তু সংশোধনের সুযোগ দেয়নি। স্যার আমাদের সেই সুযোগ দিয়েছেন। তাই আমরা এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার চেষ্টা করছি।’

এদিকে অপরাধ দমন ও নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখায় শ্রেষ্ঠ ওসি হিসেবে পুরস্কার জিতে নিয়েছেন বায়েজিদ বোস্তামি থানার ওসি মোহাম্মদ মহসীন । নগরীর ১৬ থানার ওসিকে টপকে বৃহস্পতিবার (১৫ ডিসেম্বর) সিএমপি কমিশনার ইকবাল বাহারের কাছ থেকে পুরস্কার নেন তিনি।

অশান্ত বায়েজিদ এখন শান্ত!
চট্টগ্রাম নগরের অশান্ত এলাকা হিসেবে পরিচিত ছিল বায়েজিদ বোস্তামি এলাকা। বড় বড় শিল্প কারখানা থাকায় ওই এলাকায় শ্রমিকদের সংখ্যা বেশী। তাই অপরাধের সংখ্যাটাও সেখানে বেশী। শ্রমিক-মালিক সংঘর্ষ, পাড়ায়-পাড়ায় সংঘর্ষ, গ্রুপে-গ্রুপে সংঘর্ষ; সেখানকার নিয়মিত ঘটনা ছিল। কিন্তু অশান্তির সেই বায়েজিদে এখন শান্তির, স্বস্তির আবাহন। মালিক-শ্রমিকদের সাথে পুলিশের নিয়মিত বৈঠকের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে শ্রমিক অসন্তোষ। বিট পুলিশিং এবং কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মাধ্যমে কমানো হচ্ছে সামাজিক অপরাধ। মসজিদে মসজিদে আলোচনা সভার মাধ্যমে নির্মূল করা হচ্ছে মাদকও। প্রতিরোধমূলক এসব পদক্ষেপের কারণে গত ছয় মাসে বায়েজিদ বোস্তামি এলাকায় বড় ধরনের কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।

এ প্রসঙ্গে বায়েজিদ বোস্তামি থানার ওসি মোহাম্মদ মহসীন বলেন, ‘শ্রমিক অসন্তোষ এড়াতে বিভিন্ন কারখানায় নিয়মিত সৌহার্দ্য মিটিং, অপরাধ দমনে সচেতনতা সৃষ্টি, মসজিদে কথা বলা, উঠান– বৈঠক, বিট পুলিশিং, কমিউনিটি পুলিশিং করছি। এর সুফলও মিলছে।’

এ প্রসঙ্গে বায়েজিদ বোস্তামি এলাকার পাঁচলাইশ যুবসংঘের সভাপতি মনজুর আলম বলেন, ‘সাধারণত কোন ঘটনা ঘটলে আমরা পুলিশের কাছেই যায়। কিন্তু পুলিশের কাছে না গিয়ে, নিজেরাই এসব সমস্যার সমাধান করতে পারি- তা ওসি সাহেব আমাদের শিখিয়েছেন। সামাজিকভাবেই যে কোন সমস্যার সমাধান করা সম্ভব- তা এখন আমরা বুঝতে শিখেছি। তাই ওসি মহসীনকে আমরা পুলিশ হিসেবে নয়, সহকর্মী হিসেবেই দেখি।’

বদলে যাও, বদলে দাও!
নিজেকে যোগ্য নেতা হিসেবে প্রমাণ করেছেন ওসি মহসীন। নিজে যেমন সেরা হয়েছেন, পাশাপাশি সেরা করে তুলেছেন তার থানাকে। এ পর্যন্ত তিনবার সেরা থানার পুরস্কার পায় বায়েজিদ বোস্তামি থানা। এছাড়াও দলগত বিভিন্ন পুরস্কার জেতে প্রতিবারই। তার এই কাজ প্রভাব ফেলেছে তার অধীনস্থদের কাজেও। তার থানা থেকে এ পর্যন্ত সেরা অফিসারের স্বীকৃতি পেয়েছেন এসআই শামীম শেখ, এসআই মো. কামাল হোসেন খান, এসআই আবদুর রব ও এএসআই আব্দুল্লাহ।

এ প্রসঙ্গে ওসি মহসীন বলেন, ‘পুলিশের কাজ সমাজ থেকে অপরাধ নির্মূল করা, যা একজনের পক্ষে কখনোই সম্ভব নয়। এটি একটি টিমওয়ার্কের ব্যাপার। নিজে সেরা হলে হয়তো তুষ্টি পাওয়া যায়, কিন্তু তৃপ্তি পাওয়া যায় না।’

তিনি আরও বলেন, ‘ব্যক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য আমরা সবাই নিয়মিত নিজেদের মধ্যে মিটিং করে থাকি। আমি না হয়ে আমরা হিসেবে কাজ করার চেষ্টা করি। এর ফলে আমাদের মধ্যে কাজের গতিশীলতা বৃদ্ধি পায়।’

mohsin2সেরাদের সেরা ওসি মহসীন!
এদিকে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশে (সিএমপি) ওসি মহসীনের চমক চলছেই। টানা তিনবার শ্রেষ্ঠ থানা হিসেবে পুরস্কার পাওয়ার পর এবার জিতলেন সিএমপির সেরা ওসির পুরস্কার। চট্টগ্রামের ১৬ ওসিকে পেছনে ফেলে তিনি অর্জন করেছেন সিএমপির ব্যক্তিগত ক্যারিশমার সেরা এই সম্মান। নভেম্বর মাসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় অনবদ্য অবদান রাখায় এই পুরস্কার পান সিএমপির আলোচিত এই ওসি। ব্যক্তিগত অর্জনের পাশাপাশি তার থানা পুরষ্কার পেয়েছে আরও তিন ক্যাটাগরিতে।

সিএমপি সূত্রে জানা গেছে, ভাল কাজের স্বীকৃতি এবং কাজে গতিশীলতা আনতে গত মে মাস থেকে সিএমপিতে চার ক্যাটাগরিতে পুরষ্কারের ব্যবস্থা করা হয়। এর মধ্যে প্রথম তিনবারই সেরা থানা হয়ে চমক দেখায় ওসি মহসীনের বায়েজিদ বোস্তামি থানা। এরপর আরও কয়েকবার সেরা অস্ত্র উদ্ধারসহ বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে পুরস্কার জেতে বায়েজিদ বোস্তামি থানা। তবে ব্যক্তিগত ক্যারিশমার সেরা এই স্বীকৃতি জেতেন এই প্রথমবার।

নভেম্বর মাসে তিনটি বিদেশী পিস্তল, ১২ রাউন্ড গুলিসহ ২ সন্ত্রাসী, ৫০ হাজার টাকার জালনোট সহ ১ জন, ২১ টি মাদক মামলায় ২৬ জনসহ গ্রেফতারি পরোয়ানামূলে ১০২ জনকে আটক এবং ১৬ হাজার ২০০ ইয়াবা, ১২ কেজি ৮০০ গ্রাম গাঁজা এবং ১৮০ লিটার চোলাই মদ জব্দের স্বীকৃতি হিসেবে এই সেরার সম্মান অর্জন করেন তিনি। ব্যক্তিগত অর্জনের পাশাপাশি সেরা অস্ত্র উদ্ধারকারী এবং মাদক উদ্ধারকারী হিসেবে পুরস্কার অর্জন করে মহসীনের বায়েজিদ বোস্তামি থানা।