শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

বিমানে এসে রেলস্টেশনে সংবর্ধনা, কেন এই প্রবঞ্চনা?

| প্রকাশিতঃ ১ ডিসেম্বর ২০২০ | ৯:৪২ অপরাহ্ন


জোবায়েদ ইবনে শাহাদাত : গত সোমবার (৩০ নভেম্বর) চট্টগ্রামের পুরাতন রেলওয়ে স্টেশন চত্বরে চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা যুবলীগের ব্যানারে যুবলীগের নবনিযুক্ত যুগ্ম সম্পাদক মুহাম্মদ বদিউল আলমের রাজকীয় সংবর্ধনা হয়ে গেলো। সংবর্ধিত ব্যক্তি বদিউল আলমসহ অতিথিরা সংবর্ধনাস্থলে উপস্থিত হন বেলা ১টার কিছুক্ষণ পর।

জানা গেছে, ইউএস বাংলা এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে সকাল ৭ টায় চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে পৌঁছে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের অতিথিরা সরাসরি চলে যান পাঁচতারকা হোটেল রেডিসন ব্লুতে। ১০০১ নম্বর রুমে যুবলীগের নবনিযুক্ত প্রেসিডিয়াম সদস্য নিক্সন চৌধুরী এমপি, ১২১২ নম্বর রুমে যুবলীগের নবনিযুক্ত সদস্য ব্যারিস্টার তৌফিকুর রাহমান ওঠেন। একই হোটেলে অবস্থান করেন তাদের অন্য সফরসঙ্গীরা।

অন্যদিকে, যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বদিউল আলম বিমানে চট্টগ্রামে আসলেও তার আসার কথা ছিল ট্রেনযোগে। বদি উঠেছিলেন সিটি করপোরেশনের রেস্ট হাউজে। আর সেখান থেকেই রেডিসন ব্লু হয়ে খোলা জিপে চড়ে হুঁইসেল বাজিয়ে তিনি হাজির হন রেলস্টেশনে।

একইভাবে যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ায় গত ২২ নভেম্বর চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা যুবলীগের ব্যানারে স্টেশন চত্বরে জাঁকজমকপূর্ণ সংবর্ধনা নেন শহীদুল হক চৌধুরী রাসেল। এর আগে গত ২১ নভেম্বর যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির নবনিযুক্ত তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক মীর মাে. মহিউদ্দিন একইভাবে সংগঠনটির ব্যানারে রেলস্টেশনে সংবর্ধনা নেন।

সংশ্লিষ্ট তথ্যমতে, শহীদুল হক চৌধুরী রাসেল ট্রেনে এসে রেলস্টেশনে সংবর্ধনা নিয়ে দুদিন পর বিমানে করে চলে যান। সংবর্ধনা উপলক্ষে স্থানীয় গণমাধ্যমে লাখ লাখ টাকার বিজ্ঞাপনও দিয়েছেন চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর, দক্ষিণ যুবলীগের ব্যানারে। অন্যদিকে, মীর মো. মহিউদ্দিন ট্রেনে এসে সংবর্ধনা নিয়ে ওদিন বিকেলেই বিমানযোগে ঢাকা ফিরে যান।

এই পরিস্থিতিতে চট্টগ্রামের রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে, রাজনৈতিক কর্মীদের সাথে কেন এই প্রবঞ্চনা, প্রতারণা? সংবর্ধনা যদি নিতেই চান সাদাপথে, তথ্যগোপন না করে সংবর্ধনা নিতেই পারেন। বিমানে এসে রেলের যাত্রী সেজে কেন সংবর্ধনা নেবেন? স্রেফ সংবর্ধনার জন্যই কি তাহলে সকালে এসে বিকেলে চলে গেছেন?

এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও হচ্ছে তির্যক মন্তব্য, সমালোচনা। যুবনেতা মো. সাজ্জাত হোসেন গত ২৪ নভেম্বর তার ফেসবুক আইডিতে লিখেন, ‘তিনি ট্রেনে করে আসলেন। স্টেশন প্রাঙ্গণে সংবর্ধনা নিলেন। আবার বিমানে করে ঢাকা চলে গেলেন। কেন্দ্রীয় পদবী পেলে এমনটা করতে হয় মনে হচ্ছে!’ এরপর সোমবার (৩০ নভেম্বর) আরেক স্ট্যাটাসে তিনি লিখেন, ‘এবার বিমানে করে এসে রেলস্টেশনে সংবর্ধনা’।

এতে অনেকেই তির্যক মন্তব্য ও হাস্যরস করেন। নানারকম প্রতিক্রিয়া দেখান। ফরহাদ মোরশেদ নামের এক ফেসবুক ব্যবহারকারী মন্তব্য করেন, ‘আজব একটা জাতি আমরা। লজ্জা-শরমবিহীন আঁতেলে ভরে গেছে দেশ।’ সাহেদুল আলম নামের একজন লিখেন, ‘এরপর রেলে এসে বিমানবন্দরে সংবর্ধনা হবে।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে উক্ত পোস্টদাতা সাবেক ছাত্রনেতা মো. সাজ্জাত হোসেন একুশে পত্রিকাকে বলেন, প্রথমত এমন প্রবঞ্চনার সংবর্ধনা আমার রাজনৈতিক জীবনে কখনো দেখিনি। দ্বিতীয়ত, যুবলীগের পদ পেয়েছেন তাতে সংবর্ধনার কী আছে? সংবর্ধনা যদি দিতে হয় নগরে লালদিঘী, পলোগ্রাউন্ডসহ বিভিন্ন ভেন্যু আছে। আয়োজন করে একদিনেই চট্টগ্রাম থেকে যুবলীগে যারা আসীন হয়েছেন তাদের একসাথে সংবর্ধনা দেওয়া যেত। তাছাড়া চট্টগ্রাম উত্তর, দক্ষিণ ও মহানগর যুবলীগের ব্যানার ব্যবহার করা হলেও প্রকৃতপক্ষে সংশ্লিষ্ট নেতাদের উপস্থিতি ছাড়া আর কোনো সংশ্লেষ ছিলো না এসব সংবর্ধনায়। সংশ্লিষ্ট সংবর্ধিত নেতারা সমস্ত অর্থের জোগান দিয়েছেন।

বিমানে এসে রেলযাত্রী সেজে রেলচত্বরে সংবর্ধনা নেওয়ার ব্যাপারে যুবলীগ যুগ্ম সম্পাদক মুহাম্মদ বদিউল আলম একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমাদের ট্রেনে আসার কথা ছিল এটা সত্য এবং আমি ট্রেনের একটি এসি কেবিনও নিয়েছিলাম। কিন্তু যেহেতু বঙ্গবন্ধু পরিবারের দুজন সদস্য সাংসদ নিক্সন চৌধুরী ও ব্যারিস্টার তৌফিকুর রহমান এই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে আসছেন, তাই তাদের নিরাপত্তার কথা ভেবে তাদেরকে বিমানযোগে আনাটা নিরাপদ মনে করেছি। সেই কারণে তাদের সাথে আমিও বিমানে চলে এসেছি।’

তিনি বলেন, ‘সংবর্ধনার ভ্যেনুতে অতিথি ট্রেনে আসবেন নাকি বাসে বা প্লেনে আসবেন সেটা সময়, পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে। এখানেও তাই হয়েছে। এ নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো সুযোগ নেই।’

এদিকে, প্রত্যেককে আলাদাভাবে দেওয়া সংবর্ধনা নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন। সংবর্ধনাগুলোর একেকটিতে ৫ লাখ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়েছে বলে জানা যায়। চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা যুবলীগের আয়োজনে সংবর্ধনার কথা বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে যাবতীয় ব্যয়ভার সংবর্ধনা গ্রহীতারই। এক্ষেত্রে যিনি সংবর্ধনা নিবেন পোস্টার-লিফলেট, বাসে-ট্রাকে করে লোকসমাগম থেকে শুরু করে সকল খরচ সংবর্ধনা গ্রহণে ইচ্ছুক নেতাই বহন করে থাকেন।

জানতে চাইলে নবনিযুক্ত সাংগঠনিক সম্পাদক শহীদুল হক চৌধুরী রাসেল বলেন, ‘টাকা খরচ করে আমার সংবর্ধনা নেওয়ার কী দরকার? আয়োজকদের মধ্যে যে কারো সাথে আপনারা কথা বলে দেখতে পারেন। তবে টাকা দিয়ে যে সংবর্ধনা নেওয়া হয় না এমন না। আমি শুনেছি অনেকে নিজের ব্যানার-পোস্টার ছাপিয়ে, টাকা পয়সা দিয়ে এধরনের কাজ করছেন। তবে সবাই যে করে তাও না।’

যুবলীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক মীর মাে. মহিউদ্দিন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘টাকা দিয়ে সংবর্ধনা নেওয়ার মত সামর্থ্য আমার নেই। এই যে এতো বড় একটা সংবর্ধনা আমাকে দেওয়া হলো আমি এই উপলক্ষে টাকা দেওয়া তো দূরের কথা, কাউকে একটি চা পর্যন্ত খাওয়াইনি। তাই এসব গুঞ্জন নিয়ে আমি মোটেও বিব্রত নই।’

জানতে চাইলে মহানগর যুবলীগের আহ্বায়ক মহিউদ্দিন বাচ্চু একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘তাদের দেওয়া তথ্য বা ঘোষণার ভিত্তিতে রেলস্টেশনে সংবর্ধনার আয়োজন হয়। তারা আমাদের জানিয়েছিলেন ট্রেনেই আসবেন। তবে কেন তারা ফ্লাইটে আসলেন সেই বিষয়ে আমার জানা নেই।’

সংবর্ধনার ব্যয়নির্বাহ কারা করেছে, টাকার উৎস কী-এমন প্রশ্নের জবাবে মহিউদ্দিন বাচ্চু বলেন, ‘খরচের বিষয়ে আমি পুরোপুরি জ্ঞাত নই, তাদের বিভিন্ন শুভাকাঙ্ক্ষী থাকতে পারে, যারা এই খরচের বিষয়টার সাথে জড়িত।’

এদিকে একুশে পত্রিকার কাছে বিষয়টি এড়িয়ে গেলেও নিজের টাকায় সংবর্ধনার গ্রহণের কথাটি একজন রাজনৈতিক সতীর্থের সাথে ফোনালাপে স্বীকার করেছেন যুবলীগের যুগ্ম সম্পাদক মুহাম্মদ বদিউল আলম।

একুশে পত্রিকার কাছে সরক্ষিত সেই ফোনালাপের একাংশে বদিউল আলমকে বলতে শোনা যায়, ‘সংবর্ধনা মানে কী জানো-নিজের ব্যানার নিজে করবে, নিজের পোস্টার নিজে ছাপবে, নিজের মঞ্চ নিজে বানাবে। নিজের টাকায় সংবর্ধনা হবে। সেই সংবর্ধনায় নেতাকর্মীরা এসে ধাক্কাধাক্কি করে তোমাকে বক্তৃতা দিতে দিবে। এটাই হচ্ছে সংবর্ধনা।’