শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

নিজেই কলেজ ক্যাম্পাসে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করেন অধ্যক্ষ!

| প্রকাশিতঃ ২৬ অক্টোবর ২০২১ | ১০:২৪ অপরাহ্ন

আবছার রাফি : নিয়ম অনুযায়ী ঝাড়ু হাতে কলেজের আঙিনা-শ্রেণিকক্ষ, টয়লেট পরিস্কার করেন মালি বা পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা। কেবল চট্টগ্রাম নয়, সারাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মালি-পরিচ্ছন্নতাকর্মীর এমন পরিষ্কার-পরিচর্যার কাজের দৃশ্যের সাথে আমরা সকলেই কমবেশি পরিচিত। স্বাভাবিকভাবে যেই কাজটি করেন মালি বা পরিচ্ছন্নতাকর্মী, সেই একই কাজটি যদি নিয়মিত কোনো কলেজের অধ্যক্ষ করে থাকেন, তাহলে কেমন লাগে শুনতে? হ্যাঁ, এরকমই অবাক হওয়ার মতো কাজটি নিয়মিত করে চলছেন চট্টগ্রাম কলেজের অধ্যক্ষ মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী।

পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের সাথে নিয়ে কখনো চট্টগ্রাম কলেজ ক্যাম্পাসে থাকা ছোট ছোট ফুলগাছে পানি ঢালা, কখনো হোসপাইপ দিয়ে পানি ঢেলে দেওয়াল বা মেঝে পরিষ্কার করা, কখনোবা কলেজের আঙিনার ময়লা-আবর্জনা কুড়িয়ে ময়লার ভাগাড়ে ফেলা; নিত্য এসব কাজ আনন্দের সাথে করে চলেছেন প্রচারবিমুখ মানুষ হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রাম কলেজের অধ্যক্ষ মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী।

বিষয়টি ইতোমধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে। একটি ছবিতে দেখা যায়, হাতে পানিভর্তি হোসপাইপ নিয়ে চট্টগ্রাম কলেজের পূবালী ব্যাংকের ঠিক পেছনের জায়গায় টাইলসে থাকা ময়লা পরিষ্কার করছেন তিনি। অদূরে দাঁড়িয়ে আছেন এক পরিচ্ছন্নতাকর্মী। ছবিটি ফেসবুকে শেয়ার করে প্রিয় শিক্ষকের প্রতি ছাত্রছাত্রীদের পাশাপাশি কলেজের অন্যান্য শিক্ষকরাও জানাচ্ছেন সাধুবাদ-অভিনন্দন।

এই সাধুবাদ-অভিনন্দন জ্ঞাপনের বিষয়ে কথা হয় চট্টগ্রাম কলেজ শিক্ষার্থী মো. জাবেদুল আলম জিতুর সাথে। তিনি একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজটা স্যার প্রতিদিনই করেন। ক্যাম্পাসে হাঁটাহাঁটি করার সময় একটা চিপসের খালি প্যাকেট পেলে সেটা নিজ হাতে ডাস্টবিনে ফেলে দেন। প্রতিদিনই সবার আগে ক্যাম্পাসে আসেন। পিতা-মাতা যেমন সন্তানকে লালনপালন করেন ঠিক তেমনি আমাদের অধ্যক্ষ স্যার কলেজটাকে লালন করেন।

চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি ও সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী মো. মনিরুল ইসলাম একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘শুধু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নয়, পুরো ক্যাম্পাসকে নান্দনিক, সবুজায়ন করতে নিরলস কেটে যাচ্ছেন সৃজনশীল মানুষ আমাদের অধ্যক্ষ স্যার; যিনি সাধারণে অসাধারণ, যাঁকে নিয়ে আমরা গর্ব করতে পারি। যিনি ক্যাম্পাসকে নিজের সন্তানের মত যত্ন করে সৌন্দর্যবর্ধন করেন, লালন পালন করেন ভালবাসার মহিমায়। অবাক হই স্যারের এসব কর্মকাণ্ড দেখে।’

রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক প্রফেসর মো. মুফিজুল ইসলাম বলেন, ‘অধ্যক্ষ মহোদয়ের এটা খুবই প্রশংসনীয় কাজ। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাছে বাধা তো দূরের কথা, নিজেই অংশগ্রহণ করছেন; এটা সত্যিই আনন্দদায়ক। আমরা সব শিক্ষকরা যদি এমন হতাম, সব কলেজের প্রিন্সিপ্যালরা যদি এরকম হতো, সব অফিস প্রধানরা যদি এরকম হতো তাহলে দেশটা কত দ্রুত যে পাল্টে যেত, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আমার ইচ্ছা, সুযোগ পেলে এই কাজটা আমিও করবো।’

ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক প্রফেসর মো. মুজিবুর রহমান বলেন, ‘অধ্যক্ষ মহোদয়ের এই কাজের অবশ্যই একটা প্রতীকি মূল্য আছে। প্রতিষ্ঠানের একেবারে নিম্নপদের কর্মচারী যাদেরকে আমরা এমএলএসএস বলি তারা যেই কাজটি করেন; তাদের সেই কাজটিতে যখন প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তি হাত লাগান তখন হয়তো এটার একটা প্রতীকি মূল্য থাকে। এটা নানা পর্যায়ে অনুসৃত হবে বলে আমি মনে করি।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম কলেজের অ্যধক্ষ মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘আমি প্রতিদিন সোয়া আটটা থেকে আটটার মধ্যে কলেজে আসি। প্রথমে পুরো ক্যাম্পাসে একটু ঘুরি। তারপর সাড়ে আটটায় আমাদের যে ছাত্রগুলো আসে তাদের স্বাগত জানাই। ভিজিল্যান্স টিমের সাথে কথাবার্তা বলি। কাজের ভাগাভাগি করে নিই; কোনও ক্লাস মিস যাচ্ছে কিনা, ছাত্ররা আসলো কিনা, এসব দেখি। ওয়াশরুম পরিষ্কার আছে কিনা ঘুরে ঘুরে দেখি ভিজিল্যান্স টিমকে নিয়ে। এরপর ক্লাসটা শুরু হয়ে গেলে আমি আস্তে আস্তে পুরো ক্যাম্পাসটা ঘুরে দেখি। আমার গাছগুলো ভালো আছে কিনা, কোথাও ময়লা জমে আছে কিনা, পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা দায়িত্বে অবহেলা করলো কিনা এসবও দেখার চেষ্টা করি।’

অধ্যক্ষ বলেন, ‘ আমাদের তো উদ্ভিদের প্রতি ভালোবাসা আছে। এজন্য আমরা কোন গাছটা কোথায় লাগাতে হবে, কোথাও কাটিং করতে হবে কিনা-এসব দেখতে দেখতে ছাত্রছাত্রীদের সাথেও ঠুকঠাক কথা বলি। জিজ্ঞেস করি, আপনি কেন আসছেন? কোনো কাজে আটকে আছেন কিনা। ঘুরতে ঘুরতে প্রশাসনিক ভবনের দিকে আসতে দশটা বেজে যায়। তখন গার্ডিয়ানরা আসেন। তাদের সাথে কথা বলি, তাদের কোনো কাজ আটকে থাকলে করে দিই। তারপর সাড়ে দশটার দিকে অফিসে বসি।’

‘কলেজের যেসব জায়গায় ময়লা জমে থাকতো অথবা জায়গাগুলো খালি পরে থাকতো সে জায়গাগুলো কীভাবে কাজে লাগানো যায় তা আমি ভাইস প্রিন্সিপ্যাল থাকাকালীন সময় থেকে আগের প্রিন্সিপ্যাল স্যারকে নিয়ে ভাবতাম। আমাদের ব্যাংকের পেছনে একটা ময়লার ভাগাড় ছিলো, ওটা পরিস্কার করে আমরা ছাত্র-ছাত্রীদের বসার জন্য জায়গা করে দিয়েছি। তারপর প্রশাসনিক ভবন দুইয়ের পাশে থাকা গাছের নিচে ময়লা জমতো সেখানে আমরা বেষ্টনী দিয়ে বৃক্ষরোপণ করে দিয়েছি। অ্যাকাডেমিক ভবন এক-দুই-তিনের পূর্বপাশে একটা মুক্তমঞ্চ করে দিয়েছি। এই মুক্তমঞ্চের চারিদিকে লোহার পেঞ্চি দিয়ে আমরা নানা ধরনের লতানো উদ্ভিদ তুলে দিয়েছি। ছাত্র মিলনায়তনের সামনে বাদাম গাছের নিচে একটা জায়গা ছিলো ওখানেও ময়লা জমে থাকতো সেখানে আমরা ঢেঁকিশাক জাতীয় উদ্ভিদের একটা বাগান করে দিয়েছি। ওটার নাম দিয়েছি টেরিস চত্বর।’

‘ছাত্রী মিলনায়তনের পেছনে একটা জায়গা ছিলো সেখানে সবাই ময়লা ফেলতো ওই জায়গাটাতে আমরা নানা ধরনের পাম্প লাগিয়ে দিয়েছি। ওটা করতে আমাদের তিন বছর সময় লেগেছে। বলা যায়, একেবারে গ্রিনজোন। আরেকটি জায়গায় ত্রিভুজের মতো একটা জায়গা করে আমরা ছত্রাক চত্বর করে দিয়েছি। বড় বড় কতগুলো ছত্রাক, তার চারপাশে গাছ। ছাত্রছাত্রীরা এখানে বসে, ছবি আঁকে, কথাবার্তা বলে। উদ্ভিদ বিজ্ঞান ভবনের সামনে আমরা গোল চত্বর করে দিয়েছি। ওখানে ছাত্রছাত্রীরা বসে বসে ছবি আঁকে। উদ্ভিদ ও প্রাণীবিদ্যার ছবিগুলো এখানে বসে বসে আঁকে।’ বলেন চট্টগ্রাম কলেজ অধ্যক্ষ।

‘ভুটানির সামনে আমরা অর্কিট হাউজ করে দিয়েছি। বাংলাদেশে একমাত্র অর্কিট হাউজ চট্টগ্রাম সরকারি কলেজে। নানা ধরনের অর্কিটের ফুল ফুটছে, আমাদের ভুটানি বিভাগের ছাত্র-ছাত্রীরা এগুলো শিখে। এসব তাদের লেখাপাড়া অংশ। আমাদের লাইব্রেরীর সামনে খালি জায়গা ছিলো আমরা ঢালাই করে কতগুলো দৃষ্টিনন্দন চেয়ার করে দিয়েছি। আমার আগের অধ্যক্ষ আবুল হাসান স্যার, তার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। সেটার পেছনে পুরো জায়গাটাতে আমরা নানা জাতের জবা এবং সোনালু ফুল গাছের বাগান করে দিয়েছি।’ যোগ করেন কলেজ-অধ্যক্ষ।

ছাত্রছাত্রীদেরকে নিজের ক্যাম্পাস নিজেদের পরিষ্কার রাখার পরামর্শ দিয়ে অধ্যক্ষ বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শুধু বই মুখস্ত করার জায়গা না, এখানে দেশপ্রেম শিখতে হয়, পরিবেশবান্ধবতা শিখতে হয়, বড়ভাইকে ইজ্জত করা শিখতে হয়, শিক্ষককে সম্মান করা শিখতে হয়। আমি মনে করি, একটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মানে অনেক বড় বিষয়।’

তিনি বলেন, ‘আমি দুইমাস পর কলেজ থেকে চলে যাব। কলেজকে বড়ই ভালোবাসি। ভালোবেসেই কাজগুলো করি। আমাদের কলেজের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা খুবই ভালো। ওরা আমার সাথে মিলেমিশে কাজগুলো করে। আমি এসব খুব মিস করবো। আমাদের দেশের মানুষগুলো আসলে অনেক ভালো। আমরা যারা বড় চাকরি করি, আর যারা ছোট চাকরি করে তারা যে কত ভালো এবং তাদের যে আমাদের কত দরকার এটা আমার কাছে আশ্চার্য লাগে।’