শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

দারিদ্র্য: ভাসমান আবর্জনায় জীবিকা খুঁজছে শিশুরা

| প্রকাশিতঃ ১৮ নভেম্বর ২০২১ | ১০:৪৯ পূর্বাহ্ন

শরীফুল রুকন : সকালে যখন শিশুরা ব্যাগ কাঁধে নিয়ে স্কুলে ছোটে, তখন আরিফ (১১) ছোটে কর্ণফুলী নদীতে। তার কাঁধে ব্যাগের বদলে থাকে প্লাস্টিক কুড়ানোর বস্তা। সারা দিন কর্ণফুলী নদী থেকে প্লাস্টিক বা ভাসমান আবর্জনা কুড়িয়ে দিন কাটে তার; এই নদীর তীরে গড়ে উঠেছে চট্টগ্রাম শহর। সন্ধ্যায় সেই প্লাস্টিক বিক্রি করে নিজের মুখে আহার তোলে ফরহাদ। প্রকৃতির বুকে যখন অন্ধকার ভর করে, তখন ফরহাদের ঠিকানা হয় ফুটপাতে। আরিফের মা নেই, বাবা কোথায় মনেই পড়ে না তার।

গত রোববার সকালে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর শাহ আমানত সেতু এলাকায় কথা হয় আরিফের সঙ্গে। তখন ককশিটের অস্থায়ী ভেলায় বসে নদী থেকে ভাসমান আবর্জনা সংগ্রহ করছিল আরিফ। কথা বলে জানা গেল, নদীতে ভাসমান পুরনো ও অব্যবহৃত প্লাস্টিকের জিনিসপত্র কুড়িয়ে বিক্রির জন্য ‘আবর্জনার দোকানে’ নিয়ে যায় সে। কুড়িয়ে পাওয়া এসব প্লাস্টিক সামগ্রী বিক্রি করে প্রতি কেজি ২০ থেকে ৪০ টাকা পাওয়া যায়।

আরিফের সরল ভাষ্য, ‘আমি তো ভিক্ষা করি না। প্লাস্টিক কুড়িয়ে বিক্রি করি। রাস্তাঘাটের চেয়ে নদীতে সহজে প্লাস্টিক পাওয়া যায়। তাই ঠান্ডা লেগে জ্বর-সর্দি হলেও নদীতে নামতে হয়। এ কাজ করে দৈনিক ১০০-২০০ টাকা পাওয়া যায়। প্লাস্টিক না কুড়ালে না খেয়ে থাকতে হয় তাকে।’ স্কুলে যাওয়া হয় কিনা জানতে চাইলে আরিফ ‘না’ সূচক মাথা নাড়ে।

আরিফের মতো ভাসমান আবর্জনায় জীবিকা খুঁজে বেড়ায় রাসেলও (৮)। আরিফের সঙ্গে কথা বলার সময়ই হঠাৎ বস্তা কাঁধে নিয়ে নদীর তীরে হাজির রাসেল। প্রথমেই নদীর তীরে ও হাঁটু পানিতে থাকা প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ করা শুরু করে সে।

কিছুক্ষণ পর ককশিটের বড় টুকরো খুঁজে পায় রাসেল। এটাকে অস্থায়ী ভেলায় রূপ দিয়ে ভারসাম্য বজায় রেখে সেখানে বসে পড়ে সে। এরপর আরিফের মত কায়দায় নদীর একটু গভীরে গিয়ে প্লাস্টিকের ভাসমান জিনিসপত্র কুড়ানো শুরু করে রাসেল।

জানতে চাইলে রাসেল জানায়, তার বাবা নেই। মা আছে। তিনি অন্যের বাসায় গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করেন। তাদের বাড়ি চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলায়। সেখানে ভাঙনের ফলে তারা ঘরবাড়ি হারিয়ে নগরের বাকলিয়ার শাহ আমানত সেতু এলাকার বাস্তুহারা বস্তিতে বসবাস শুরু করেছে। তার মায়ের একার আয় দিয়ে সংসার চলে না। তাই মাকে সাহায্য করতে প্লাস্টিক বর্জ্য কুড়ানো শুরু করেছে সে।

রাসেল জানায়, ‘প্লাস্টিক সংগ্রহ করে সে প্রতিদিন ১০০-১৫০ টাকা পায়। তবে পানিতে বেশিক্ষণ থাকতে পারে না। ৫-৬ ঘন্টার বেশি থাকলে জ্বর-সর্দি চলে আসে তার। জ্বর আসলে তার মা ফার্মেসি থেকে ওষুধ এনে দেয়। কয়েকদিন পর সুস্থ হলে আবার কাজে নেমে পড়ে।’ স্কুলে যায় কিনা জানতে চাইলে রাসেল জানায়, সন্দ্বীপে থাকতে প্রথম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করেছে। এখন পড়াশোনা করে না।

কুড়ানো প্লাস্টিক ২০ থেকে ৩৫ টাকা কেজিতে বিক্রি করার কথাও জানায় রাসেল। পরে রাসেলকে অনুসরণ করে দেখা গেল, তার কাছ থেকে এসব প্লাস্টিক কিনে নেন শাহ আমানত সেতুর বাকলিয়া প্রান্তের গোলচত্বরের পূর্বপাশের একটি ভাঙারির দোকানের মালিক, প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবসায়ী মনোয়ার হোসেন।

জানতে চাইলে মনোয়ার হোসেন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘অভাবে পড়ে বস্তির শত শত শিশু প্লাস্টিক কুড়িয়ে এনে আমাদের কাছে বিক্রি করে। তাদের অনেকে এসব প্লাস্টিক নদী-খাল থেকে তুলে আনে। প্লাস্টিকের পুরনো বোতল প্রতি কেজি ২০ টাকা দরে ও অন্যান্য প্লাস্টিক সামগ্রী ৩৫-৪০ টাকা কেজি দরে আমরা কিনে থাকি। এগুলো ওয়াশ করে বিভিন্ন প্লাস্টিক কারখানায় আমরা সরবরাহ করি। তারা এগুলোকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য করে তোলে।’

শুধু আরিফ ও রাসেল নয়, বেঁচে থাকার জন্য আরও অনেক শিশু জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদী ও চাক্তাই খালে নেমে প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ করছে; যদিও ঠিক কত জন শিশু নোংরা পানিতে নেমে এভাবে আবর্জনা সংগ্রহ করছে, কোনো সরকারি-বেসরকারি সংস্থার কাছে সে–সংক্রান্ত কোনো জরিপ নেই।

তবে সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর বা বিবিএস এর ন্যাশনাল চাইল্ড লেবার সার্ভে ২০২১-এ উঠে এসেছে, দেশে বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত রয়েছে ১২ লাখ ৮০ হাজার শিশু। এর মধ্যে ২ লাখ ৬০ হাজার শিশু অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজ নিয়োজিত রয়েছে এবং তাদের কাজের ধরণ জীবন ও স্বাস্থ্যের জন্য বেশ হুমকিস্বরূপ। জরিপে আরও বলা হয়েছে, দেশের মধ্যে শিশুশ্রমিকের সংখ্যা সব থেকে বেশি ঢাকা বিভাগে যা প্রায় সাড়ে ৮ শতাংশ এবং এর পরেই চট্টগ্রামে রয়েছে ৫.৮ শতাংশ শিশু শ্রমিক।

অন্যদিকে ২০২১ সালের ১১ জুন আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) ও ইউনিসেফের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী শিশুশ্রমে নিয়োজিত শিশুর সংখ্যা বেড়ে ১৬ কোটিতে পৌঁছেছে, যা গত চার বছরে বেড়েছে ৮৪ লাখ। কোভিড-১৯ এর প্রভাবের কারণে আরও লাখ লাখ শিশু ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রতিবেদনটিতে শিশুশ্রমে নিযুক্ত ৫ থেকে ১১ বছর বয়সী শিশুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বৃদ্ধির বিষয়টি তুলে ধরে বলা হয়, ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিযুক্ত ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুর সংখ্যা ২০১৬ সালের পর ৬৫ লাখ বেড়ে ৭ কোটি ৯০ লাখে পৌঁছেছে।

এদিকে ভাসমান আবর্জনা কুড়ানোর মত ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করে খাবার জুটলেও দূষিত পানি থেকে এসব শিশুদের নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া এবং যক্ষ্মার মতো রোগ হতে পারে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ইলিয়াছ চৌধুরী।

তিনি একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘নোংরা পানিতে চলাফেরা বা আবর্জনা নিয়ে কাজ করার কারণে শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ, নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া এবং যক্ষ্মা রোগের ঝুঁকিতে রয়েছে শিশুরা। নিশ্চিতভাবে তারা এসব রোগে আক্রান্ত হবে। তবে আমার জানা মতে, এসব শিশুদের রোগে আক্রান্ত হওয়ার বিষয়ে কোন জরিপ স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে হয়নি।’

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘নগরায়ন ও অব্যবস্থাপনার ফলে চট্টগ্রাম শহরের প্লাস্টিক বর্জ্য সরাসরি কর্ণফুলী নদীতে গিয়ে পড়ছে। এসব প্লাস্টিক বর্জ্য শিশুদের দিয়ে সংগ্রহ করানোর ফলে তারা নানা রোগের ঝুঁকিতে আছে। অথচ প্লাস্টিক সামগ্রী কেনা দোকানগুলো ঝুঁকির কিছুই নেয় না। তারা উল্টো কম দামে কিনে অসহায় শিশুদের ঠকায়। শিশুদের দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করানো এসব ব্যবসায়ীদের আইনের আওতায় আনা উচিত।’

শিশুদের কাছ থেকে প্লাস্টিক সামগ্রী কেনার বিষয়ে জানতে চাইলে প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবসায়ী মনোয়ার হোসেন বলেন, ‘পথশিশু বা নিম্নআয়ের পরিবারের শিশুরা ছাড়া আর কেউ তো প্লাস্টিক কুড়াবে না। তারা আগে একবেলা খেয়ে, আরেক বেলা না খেয়ে কোনো রকমে দিন কাটত। প্লাস্টিক কুড়িয়ে এখন তো দুই বেলা খাবার অন্তত পাচ্ছে। স্বাস্থ্য নিয়ে ভাবার আগে তাদের খাবারের নিশ্চয়তা দরকার।’

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক অলক পাল একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘প্লাস্টিকের বর্জ্য পুনরায় ব্যবহার করার মাধ্যমে কিছু মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হচ্ছে, পরিবেশ রক্ষা হচ্ছে। কিন্তু এসব প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহের কাজে শিশুদের ব্যবহার করা উচিত নয়। এ বিষয়ে সবাইকে সচেতন হতে হবে।’

নারী ও শিশুর অধিকার নিয়ে কাজ করে আলোচনায় আসা চট্টগ্রাম সিটির তিনবারের সাবেক কাউন্সিলর রেহানা বেগম রানু একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘পানিতে আবর্জনায় জীবিকা খুঁজতে গিয়ে শিশুরা নানা ধরনের সংক্রামকব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে। কিন্তু একটি সরকারি হাসপাতালে গিয়ে তারা ১০ টাকা দিয়ে টিকিট কেটে ডাক্তার দেখাবে, এরকম অবস্থার মধ্যেও তারা নেই৷ এ অবস্থায় যেখানে পথশিশু বেশি থাকে, সেসব এলাকায় সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর যৌথ উদ্যোগে স্যাটেলাইট ক্লিনিকের মাধ্যমে সেবা দেওয়া উচিত।’

বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের সভাপতি আমিনুল হক বাবু বলেন, ‘অভাবের তাড়নায় নোংরা পানিতে নেমে শিশুদের প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহের বিষয়টি সমগ্র জাতি, সমাজ এবং পরিবারের জন্য বেদনাদায়ক ও দুর্ভাগ্যজনক। সরকার, জনপ্রতিনিধি ও বেসরকারি সংগঠনসহ সকলের উচিত এ থেকে শিশুদেরকে মুক্তি দিতে এক যোগে কাজ করা।’

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মমিনুর রহমান একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘নদী-খালে ভাসমান আবর্জনায় জীবিকা খোঁজা শিশুদের ব্যাপারে আমি এখনই জানলাম। তাদের দিকে আমরা নজর দেব। তাদেরকে সেখান থেকে সরিয়ে স্কুলে দিতে পারি কিনা, তাদের পরিবারের সদস্যদেরও কিছু প্রণোদনার ব্যবস্থা করা যায় কিনা, সেটা আমরা দেখব।’

এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘যে শিশুদের স্কুলে যাওয়ার কথা, তারা অভাবের তাড়নায় আবর্জনা কুড়াচ্ছে। এটা খুবই বেদনাদায়ক। তাদের বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেব। তাছাড়া প্রত্যেক শিশুর ছেলেবেলার অধিকার নিশ্চিত করতে, শিশুশ্রম নিরসনে সবাইকে দায়িত্ব নিয়ে কাজ করতে হবে।’

চট্টগ্রামের সিটি মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘অনেকেই নির্দিষ্ট স্থানে ময়লা-আবর্জনা না ফেলে নালা-ড্রেনে ফেলছেন। যার কারণে এসব আবর্জনা খাল-নদী হয়ে সাগরে গিয়ে পড়ছে। এই সুযোগে ময়লা পানিতে নেমে আবর্জনা সংগ্রহ করছে শিশুরা। আর যারা শিশুদের দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করাচ্ছেন, প্রত্যেকেই অপরাধ করছেন। এসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আমি অনুরোধ জানাচ্ছি।’

চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) কমিশনার সালেহ মোহাম্মদ তানভীর একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজগুলোর একটি পানি থেকে আবর্জনা সংগ্রহের খাত। ঝুঁকি নিয়ে নোংরা পানিতে নেমে কঠোর পরিশ্রম করছে এই শিশুরা। কঠোর আইন প্রয়োগ করে এসব চাইলে বন্ধ করা যায়। তখন শিশুশ্রমিকরা যাবে কোথায়? এ কারণে আগে পুনর্বাসনের কার্যক্রম হাতে নেওয়া উচিত।’

তিনি আরও বলেন, ‘মা-বাবা সচেতন হলে সন্তানকে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে না দিয়েও সংসার চালাতে পারেন। এখন সেই সচেতনতা তৈরির জন্য বিট পুলিশিং ও কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মাধ্যমে আমরা তৎপরতা চালাচ্ছি। তবে কিছু শিশুর বাবা-মা নেই। তাদের অবস্থা খুবই সংকটাপন্ন। এই শিশুদের দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করানো থেকে শুরু করে মাদক বহন, এমনকি বিক্রি পর্যন্ত করানো হয়। তাদেরকে ধরে বিভিন্ন সেফ হোমে দিয়ে আসলে, কিছুদিন পর কেউ কেউ পালিয়ে চলে আসে। পুরো বিষয়টি নিয়ে আমরাও বেকায়দায় আছি।’