
এম কে মনির : পশুপাখি ও বনপ্রাণীদের নিরাপত্তা বাড়াতে দর্শনার্থী প্রবেশ কমাতে চায় চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ। এজন্য প্রবেশ টিকিটের মূল্য বাড়িয়ে দ্বিগুণ করার পরিকল্পনা চলছে।
চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার ডেপুটি কিউরেটর মোহাম্মদ শাহাদাত শুভ হোসেন একুশে পত্রিকাকে তার দপ্তরে বলেন, ‘বর্তমানে প্রতি মাসে গড়ে ৮০ হাজার দর্শনার্থী চিড়িয়াখানায় ভিড় জমাচ্ছেন। যা বছরে প্রায় ১০ লাখ। এতো বেশি দর্শনার্থী ধারণ করতে চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা সক্ষম নয়। কেননা এর আয়তন খুবই ছোট। আয়তন অনুসারে বেশি সংখ্যক দর্শনার্থী প্রবেশ করালে চিড়িয়াখানার সৌন্দর্য ধরে রাখা কষ্ট হবে। সেইসাথে প্রাণীদের নিরাপত্তা হুমকিতে পড়বে।’
এ বিষয়টি বিবেচনা করেই ভবিষ্যতে আমরা টিকিটের মূল্য ৫০ টাকার স্থলে ১০০ টাকা নির্ধারণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলে বলে তিনি।
মোহাম্মদ শাহাদাত শুভ হোসেন বলেন, টিকিটের দাম বাড়ালে দর্শনার্থী কমে আসবে। এতে সার্বিক ব্যবস্থাপনা ঠিক থাকবে। বার্ষিক আয়ে কোন ধরণের প্রভাব পড়বে না। চিড়িয়াখানা স্পর্শকাতর জায়গা। এখানে প্রাণীরা থাকে। তাদের জন্য বেশি দর্শনার্থীর ভিড় সুখকর নয়। প্রাণীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা, সুস্থতা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও আমাদের দায়িত্ব। তাই আমরা চাই কম দর্শনার্থী চিড়িয়াখানায় ভিড় করুক। আর সে চিন্তা থেকে টিকিটের মূল্য বৃদ্ধির পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তাছাড়া জঙ্গল সলিমপুরে সাফারি পার্ক করা হলে অনেক দর্শনার্থী সেদিকে ডাইভার্ট হবে। সেটিও আমাদের অধীনে থাকবে।’
ডেপুটি কিউরেটর ডা. শাহাদাত হোসেন শুভ আরও বলেন, ‘বর্তমানে প্রবেশ টিকিটের দাম কম হওয়ায় অনেক দর্শনার্থী এক মাসে দুইবার পরিদর্শন করছেন। একই চিড়িয়াখানা দুইবার পরিদর্শন করাটা দর্শনার্থীর নিজস্ব ব্যাপার। কিন্তু বেশি দর্শনার্থী ভিড় করাতে প্রাণীদের অসুবিধা হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আমরা মনে করছি দাম বৃদ্ধি করলে দর্শনার্থী কমে আসবে। তবে আয় কমবে না। কেননা এখন যদি মাসে ৮০ হাজার দর্শনার্থীর কাছে টিকিট বিক্রি করে ৫০ লাখ টাকা আয় করি, দাম বৃদ্ধির পরও ৪০ হাজারে একই টাকা আয় হবে।’
‘তবে এখনই দাম বৃদ্ধি করা হচ্ছে না। আমাদের চিড়িয়াখানায় জিরাপ ও হাতি নেই। দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে আমরা এক জোড়া জিরাপ ও হাতি আমদানি করার পরিকল্পনা করছি। সেগুলো আনা হলে টিকিটের মূল্য বাড়লেও দর্শনার্থীতে ভাটা পড়বে না। এখন যে সংখ্যক লোকজন চিড়িয়াখানায় আসছেন তখনও আসবে, আর্কষণটা কমবে না। কেননা এর আগে জিরাপ ও হাতি চিড়িয়াখানায় ছিলো না। ফলশ্রুতিতে আমাদের আয়ে কোন ধরণের প্রভাব পড়বে না।’

জানা যায়, প্রতিমাসে চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার আয় প্রায় ৫০ লাখ টাকা। তার মধ্যে পশুপাখির খাবার, রক্ষণাবেক্ষণ, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন পরিশোধে খরচ হয় ২০ লাখ টাকা। অবশিষ্ট ৩০ লাখ টাকা প্রতিমাসে চিড়িয়াখানার ব্যাংক হিসাবে জমা হয়।
দেশের সব চিড়িয়াখানা ও সাফারি পার্কগুলো সরকারি ভর্তুকিতে চললেও পরিকল্পিত উন্নয়ন, পশুপাখির সংখ্যা বৃদ্ধি ও সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
প্রসঙ্গত, ১৯৮৮ সালে চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন তৎকালীন চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক ও বর্তমান পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। তার হাত ধরেই ১৯৮৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি নগরীর ফয়’স লেক পাহাড়ের পাদদেশে মাত্র ২ একর জায়গায় অল্পকিছু প্রাণী নিয়ে যাত্রা শুরু করে চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা। সেই থেকে সর্বসাধারণে জন্য এটি উন্মুক্ত করা হয়। বর্তমানে চিড়িয়াখানাটির পরিধি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০.২ একরে। যেখানে রয়েছে ৭২ প্রজাতির সাড়ে তিনশ’র বেশি প্রাণী। যার মধ্যে ৩০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৩৮ প্রজাতির পাখি ও চার প্রজাতির সরীসৃপ।
চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানায় স্তন্যপায়ী প্রাণীর মধ্যে রয়েছে রয়েল বেঙ্গল টাইগার, ভারতীয় সিংহ, এশীয় কালো ভালুক, আফ্রিকান জেব্রা, মায়া হরিণ, চিত্রা হরিণ, সাম্বার হরিণ, প্যারা হরিণ, মুখপোড়া হনুমান, উল্লুক, বিভিন্ন প্রজাতির বানর, মেছো বিড়াল, বন বিড়াল, চিতা বিড়াল, গন্ধগোকুল (হিমালয়ান), গয়াল, খরগোশ, সজারু, শিয়াল ইত্যাদি।
চিড়িয়াখানার বিভিন্ন জাতের পাখির মধ্যে তিতির, ময়ূর, রাজধনেশ, কাকধনেশ, শকুন, মদনটাক, সাদা বক, নিশি বক, তিলাঘুঘু, ভুবন চিল, কোকিল, ময়না, খঞ্জনা পাখি, ও তার্কি মুরগি উল্লেখযোগ্য।
গত ৬ বছরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিবিড় তত্ত্বাবধানে ক্যাপটিভ ব্রিডিং বা নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে প্রজননের মাধ্যমে ১৪টি বাঘ শাবকের জন্ম হয়েছে চিড়িয়াখানাটিতে। এরমধ্যে ৫টিই শাবকই বিরল প্রজাতির সাদা বাঘ। আর সাদা বাঘ দেখতেই দিনদিন দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়ছে।
২০০৩ সালে ঢাকা চিড়িয়াখানা থেকে চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানায় ২ টি বাঘ আনা হয়। ২০০৬ সালে বাঘ চন্দ্র মারা যায়। পরে ২০০৯ সালে তার সঙ্গী পূর্ণিমার ক্যান্সার ধরা পড়ে। পরে ২০১২ সালের ৩০ অক্টোবর পূর্ণিমার মৃত্যু হয়। এরপর থেকে দীর্ঘ ৮ বছর বাঘ শূণ্য ছিল চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানায় দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে রয়েল বেঙ্গল টাইগার প্রজাতির বাঘ রাজ-পরীকে আমদানি করা হয়। বাঘগুলোর বৈজ্ঞানিক নাম ‘প্যানথার টাইগ্রিস টাইগ্রিস’। ২০১৮ সালের ১৯ জুলাই রাজ-পরীর ঘরে জন্ম নেয় বিরল সাদা বাঘ, যার নাম রাখা হয়েছিলো শুভ্রা। শুভ্রাই ছিল বাংলাদেশের প্রথম সাদা বাঘ।

চলতি বছরের ৩০ জুলাই কালো ডোরাকাটা কমলা রঙের বাঘ দম্পতি রাজ-পরীর সংসারে একইসাথে ৪টি সাদা বাঘ সাবকের জন্ম হয়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি দেখা দিয়েছে। এদের মধ্যে ৩টি বাঘ, ১ টি বাঘিনী সাবক। দেশের চারটি নদী পদ্মা, মেঘনা, সাঙ্গু ও হালদার নামে এদের নামকরণ করা হয়েছে। জন্মের সময় এদের ওজন ছিল ৮০০-৯০০ গ্রাম। যা বর্তমানে বেড়ে দেড় কেজি হয়েছে। তারা সবাই সুস্থ ও সবল রয়েছে।
তবে কালো ডোরা কাটা কমলা রঙের বাঘের ঘরে সাদা বাঘের জন্ম যেমন আলোড়ন সৃষ্টি করেছে তেমনি এ নিয়ে আলোচনাও হয়েছে সর্বত্র। ঠিক কি কারণে একইসাথে ৪ টি সাদা বাঘ সাবকের জন্ম তা জানার কৌতূহল অনেকেরই। গবেষণা বলছে, প্রতি ১০ হাজারে একটি বাঘ সাদা হয়ে জন্মগ্রহণ করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সাদার মধ্যে কালো রঙের ডোরাকাটাযুক্ত এ ধরনের বাঘের জন্ম প্রাণিবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে খুবই ব্যতিক্রমী ঘটনা।
চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার ডেপুটি কিউরেটর ডা. মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন শুভ বলেন, ‘সাদা বাঘগুলোর বাবা-মা রাজ-পরী। এ দম্পতির পূর্ব-পুরুষদের কেউ একজন সাদা বাঘ থাকার কারণে এমনটি হতে পারে। অথবা কন্টিনিউয়াস ইনব্রিডিংয়ের কারণেও এমনটি হতে পারে। জিনগত গবেষণার মাধ্যমেই একই সাথে ৪টি সাদা বাঘের জন্মের সঠিক কারণ জানা সম্ভব হতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাঘের ক্যাপটিভ ব্রিডিংয়ের সাফল্য ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে বাঘের সংখ্যা আরো বাড়িয়ে তা দেশের অন্যান্য চিড়িয়াখানায় সরবরাহের পাশাপাশি সুন্দরবনে অবমুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে। সেই সাথে চিড়িয়াখানায় পশুপাখীর সংখ্যা ও দর্শনার্থীদের আকর্ষণ আরও বাড়াতে ম্যাকাও, ওয়েল্ডি বিস্টসহ বেশ কয়েকটি পশুপাখি সংগ্রহের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।’