শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

অযৌক্তিক গৃহকর আদায়ে জবরদস্তি!

| প্রকাশিতঃ ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২২ | ৬:৫৪ পূর্বাহ্ন

  • গৃহকর ৫০০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি
  • আয়ের ওপর ‘ডাবল ট্যাক্সেশন’
  • মনগড়া ভ্যালুয়েশন নির্ধারণের অভিযোগ
  • আপিলের নামে ঘুষ-বাণিজ্যের সুযোগ সৃষ্টি
  • চসিকের গৃহকর পুনরায় নির্ধারণের জন্য নতুন আইন প্রণয়নের দাবি

আবছার রাফি : আগে ভবন বা স্থাপনার আয়তনের ভিত্তিতে গৃহকর নিত চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক)। এখন ভবন বা স্থাপনার ভাড়ার ভিত্তিতে তা নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে গৃহকর অনেক বেড়ে গেছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, চট্টগ্রাম নগরের নাসিরাবাদ হাউজিং সোসাইটির সাড়ে তিন কাঠা জমির উপর পাঁচতলা বাড়ির জন্য বার্ষিক ২০ হাজার ৭২৫ টাকা গৃহকর পরিশোধ করতেন মিনহাজুর রহমান। কিন্তু চসিকের নতুন কর কাঠামোয় ওই বাড়ির জন্য চলতি বছর কর দিতে হচ্ছে ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা; যা আগের চাইতে ৮২০ শতাংশ বেশি!

নগরের আগ্রাবাদের রঙ্গিপাড়ায় পাঁচতলা ভবনের আটটি ফ্ল্যাটের জন্য মতিউর রহমান চৌধুরী আগে বছরে গৃহকর দিতেন ১৮ হাজার টাকা। একটিতে পরিবার নিয়ে মতিউর রহমান নিজে থাকেন। বাকি সাতটি ভাড়া দেন। তবে বছরের সব সময় ফ্ল্যাটে ভাড়াটে থাকে না। কিন্তু পঞ্চবার্ষিক কর পুনর্মূল্যায়নের পর তার বার্ষিক গৃহকর ১ লাখ ৩ হাজার টাকা নির্ধারণ করেছে সিটি করপোরেশন। আগের তুলনায় সাড়ে পাঁচ গুণ বেশি এই কর পরিশোধের জন্য গত আগস্ট মাসে তাকে নোটিশ দেওয়া হয়। এক লাফে গৃহকর লাখ টাকার কাছাকাছি বেড়ে যাওয়ায় দিশাহারা তিনি। বাসাভাড়ার টাকা থেকে সংসার চালান। তিনি ও স্ত্রী অসুস্থ। দুজনের চিকিৎসার টাকাও ব্যয় করা হয় ভাড়ার টাকা থেকে।

এভাবে নগরের বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের চলতি অর্থবছর থেকে পূর্বের তুলনায় সর্বোচ্চ ১ হাজার শতাংশ থেকে সর্বনিম্ন ৫৪৫ দশমিক ৩২ শতাংশ পর্যন্ত গৃহকর দিতে হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এ নিয়ে নগরজুড়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। দেশের ১২টি সিটি কর্পোরেশনের মধ্যে হাতেগোনা যে-কয়টি নগরবাসীর কাছ থেকে সর্বোচ্চ পৌরকর নিয়ে থাকে তন্মোধ্যে অন্যতম হচ্ছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন; যার করের পরিমাণ ১৭ শতাংশ। এর মধ্যে ৭ শতাংশ হোল্ডিং ট্যাক্স, ৩ শতাংশ বিদ্যুতায়ন এবং ৭ শতাংশ আবর্জনা অপসারণের জন্য আদায় করা হয়। অন্যদিকে রাজধানী ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন ১২ শতাংশ হারে পৌরকর আদায় করে। সেই হিসাব অনুযায়ী রাজধানী ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের চেয়েও ৫ শতাংশ বেশি পৌরকর দিচ্ছেন বাণিজ্যিক রাজধানী খ্যাত চট্টগ্রাম নগরের বাসিন্দারা। কিন্তু এতদিন যাবত বাড়তি কর দিয়েও প্রয়োজনীয় সেবার অনেক কিছুই পাচ্ছেন না বলে দীর্ঘদিনের অভিযোগ নগরবাসীর।

৭ শতাংশ কর আবর্জনা অপসারণের জন্য আদায় করা হলেও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নানা অনিয়ম-ভোগান্তি, বাড়তি টাকা দিয়ে বর্জ্য অপসারণ, যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলে রাখার মতো বিস্তর অভিযোগ চসিকের বিরুদ্ধে। অন্যদিকে ৩ শতাংশ বিদ্যুতায়নের জন্য আদায় করা হলেও প্রধান প্রধান সড়ক ছাড়া বাকি প্রায় সব আবাসিক এলাকায় সড়কবাতির অধিকাংশ বেশিরভাগ সময় নষ্ট থাকা, বছরের অর্ধেক সময় চট্টগ্রামের অর্ধেক পানির নিচে ডুবে থাকা, পয়ঃনিষ্কাশনের বেহাল দশাসহ নানা ভোগান্তির অভিযোগ নগরবাসীর।

এভাবে চট্টগ্রামে নাগরিক সুবিধা বাড়াতে না পারলেও ইতোমধ্যে গৃহকর বাড়ানোর নতুন সিদ্ধান্ত নিয়েছে চসিক। ফলে বাড়তি করের বোঝায় অতিষ্ঠ হয়ে মাঠে নেমেছেন নগরবাসী। ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে চট্টগ্রাম করদাতা সুরক্ষা পরিষদ। এ নিয়ে চসিক মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরীকে ‘গুন্ডা’ সম্বোধন করেছেন করতাদা সুরক্ষা পরিষদের এক নেতা। এতে ক্ষুব্ধ হয়েছেন মেয়র রেজাউল করিমের লোকজন। ফলে উভয়পক্ষ পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি পালনে রাজপথে নামায় বন্দরনগরী হয়ে উঠেছে উত্তপ্ত। স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, নগরপিতার সাথে নগরবাসীর মুখোমুখি অবস্থান।

জানা যায়, আগে ব্যক্তি মালিকানাধীন ও বেসরকারি স্থাপনার আয়তনের (বর্গফুট) ভিত্তিতে গৃহকর পরিশোধ করতো নগরবাসী। কিন্তু নতুন নিয়মে বাসা ভাড়ার ভিত্তিতে কর আদায় করা হচ্ছে। যাতে আগের তুলনায় বহুগুণ পর্যন্ত বেড়েছে এ করের পরিমাণ।

এর আগে ২০১৬ সালের মার্চে ‘পঞ্চবার্ষিকী কর মূল্যায়ন কর্মসূচি’র মধ্য দিয়ে ১৯৮৬ সালে প্রণীত ‘দ্য সিটি কর্পোরেশন ট্যাক্সেশন রুলস’ অনুসারে বাড়ি ভাড়ার ভিত্তিতে হোল্ডিংয়ের কর নির্ধারণের কাজ শুরু করেছিলেন তখনকার মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন। এ পদ্ধতির বিরোধিতা করে মাঠে নামেন সাবেক মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী। তিনি পুরোনো পদ্ধতিতে স্থাপনার আয়তন অনুযায়ী (প্রতি বর্গফুট) গৃহকর নির্ধারণের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন। সাবেক মেয়র ও চট্টগ্রাম করতাদা সুরক্ষা পরিষদের নেতৃত্বে নগরজুড়ে আন্দোলন শুরু হলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপে চসিকের ওই উদ্যোগ আটকে যায়। পাশাপাশি কর পুনর্মূল্যায়ন স্থগিত রাখতে এবং আগের হারে গৃহকর আদায়ের নির্দেশ দেওয়া হয়।

কিন্তু রেজাউল করিম চৌধুরী মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর পঞ্চবার্ষিক কর পুনঃমূল্যায়নের ভিত্তিতে গৃহকর আদায়ের ওপর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দেওয়া স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের অনুরোধ জানিয়ে দুই দফা চিঠি দেয় চসিক। সেই চিঠির প্রেক্ষিতে গত ১৮ জানুয়ারি নিজেদের স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে নেয় স্থানীয় সরকার বিভাগ। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-সচিব মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম সাক্ষরিত এ সংক্রান্ত চিঠি সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে পাঠানো হয়।

চিঠিতে বলা হয়, “চট্টগ্রাম মহানগরীতে গত ১০ বছর পূর্বের নির্ধারিত হারে জনসাধারণ কর প্রদান করছে। এতে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় হতে বঞ্চিত হচ্ছে। জনসাধারণের নাগরিক সেবা ও বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকান্ড গতিশীল রাখাসহ করপোরেশনের আয় বৃদ্ধির স্বার্থে ব্যক্তিমালিকানাধীন ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান হোল্ডিং সমূহের বিগত ২০১৭-১৮ অর্থ বছরের প্রথম কোয়ার্টারের প্রকাশিত গৃহকর-পুনর্মূল্যায়নের আলোকে গৃহকর আদায়ের পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।” ফলে গৃহকরের এ স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার হওয়ায় চলতি বছর থেকে ভাড়ার ভিত্তিতে কর আদায় শুরু করেছে চসিকের রাজস্ব বিভাগ। যাতে আগের চেয়ে প্রায় ৮ গুণ বেশি পৌরকর দিতে হবে নগরবাসীকে। এ নিয়ে ব্রিটিশ আমলের নীল বিদ্রোহের ন্যায় গৃহকর বিদ্রোহের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন চট্টগ্রাম করতাদা সুরক্ষা পরিষদ। তারা কর বাড়ানোর প্রতিবাদে বিক্ষোভ, সভা-সমাবেশ করে চলছে।

২০১৭-১৮ অর্থবছরের হোল্ডিং ট্যাক্স পুনর্মূল্যায়নের বিরোধিতাকারী সংগঠন চট্টগ্রামের করদাতা সুরক্ষা পরিষদের মুখপাত্র হাসান মারুফ রুমী বলেন, “সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের সময়ে করা পুনর্মূল্যায়নের বিরুদ্ধেই আমরা আন্দোলন করেছিলাম। এখন স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার মানে তো সেই অনুসারেই হোল্ডিং ট্যাক্স নেওয়া হবে। সিটি করপোরেশনের রাজস্ব বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে গৃহকর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৮৩ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। কিন্তু হিসাব বলছে, চলতি বছর নতুন নিয়মে কর আদায় হলে এই খাতে রাজস্ব বেড়ে দাঁড়াবে ৮৫১ কোটি ৩০ লাখ টাকা। সিটি করপোরেশনের এমন সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন চট্টগ্রামের করতাদার সুরক্ষা পরিষদ। তারা আশঙ্কা করছেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির মাঝে বাড়তি গৃহকর সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করবে। চাপে থাকবেন ভবনমালিক ও ভাড়াটিয়া সবাই।

এ নিয়ে গত রোববার (১৮ সেপ্টেম্বর) করদাতা সুরক্ষা পরিষদের উদ্যোগে নগরীর মাদারবাড়ীতে অনুষ্ঠিত সমাবেশে ২৯ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও করতাদা সুরক্ষা পরিষদের সভাপতি নুরুল আবছার বলেন, ‘ওবা মেয়র সাব, অনে আর আব্বাজান, অনে আর চাচা, অনে জেডা, অনে আর খালু, অনে আরে মাপ গরি দন। আই গরিব মানুষ। আরা ১১টি ট্যাক্স দিয়ে এ শহরে বসবাস করছি। এ বেডা, এ মেয়র, আরা আরার বাপর ভিডাত বসবাস করিরদে, তোর বাপর ভিডাত বসবাস নগরির। খাজনা বিদ্যুৎ, পানি, ইনকাম ট্যাক্স, ট্রেড লাইসেন্স ট্যাক্স দি, বসবাস গরির দে। তুই হন গুন্ডা আইস্যুসদে। আঁরারে অ’ল তুলি হতা হাইবার লাইস। এ মেয়র তুমি সাবধান হয়ে যাওয়া। তুমি সাবধান হয়ে যাওয়া। তোমাকে সাবধান বাণী দিচ্ছে। চোদর-বোদর কথাবার্তা হলে তোয়ারতে এ চট্টগ্রাম ছাড়ি যনগুই পরিব।’

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ বক্তব্য ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। নুরুল আবছারের এ বক্তব্যকে করদাতাদের স্বার্থরক্ষার সাহসী বক্তব্য বলে মন্তব্য করেছেন অনেকে। তবে এ বক্তব্যে মেয়রের লোকজনও বেশ ক্ষুব্ধ হয়েছেন। নুরুল আবছারের বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছেন ভারপ্রাপ্ত মেয়র, সাধারণ ও সংরক্ষিত কাউন্সিলররা। বুধবার প্রতিবাদ জানায় চসিক সিবিএ।

গত বৃহস্পতিবার স্বেচ্ছাসেবক লীগ, যুবলীগ বিক্ষোভ ও সমাবেশ করে। অন্যদিকে, করদাতা সুরক্ষা পরিষদও কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছে। বুধবার কদমতলীতে সভা করার পর আজ বিকালে কদমতলী থেকে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব পর্যন্ত গণমিছিল করার ঘোষণা দিয়েছে। মহাসমাবেশ, গণশুনানিসহ নানা কর্মসূচি ধারাবাহিকভাবে পালন করছে। অন্যদিকে মঙ্গলবার রাতে মেয়রের ব্যক্তিগত সহকারী মোস্তফা কামাল চৌধুরী দুলাল বাদী হয়ে নুরুল আবছারের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে নগরীর চান্দগাঁও থানায় মামলা করেন।

বর্ধিত গৃহকরের বোঝা চাপানো হবে ভাড়ায়, ভাড়াটিয়ারদের নাভিশ্বাস গৃহকর বৃদ্ধির খবরে সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় রয়েছেন নগরের ভাড়াটিয়ারা। কারণ বর্ধিত করের বোঝা চাপানো হবে তাদের ভাড়ায়। ফলে বাড়তি ভাড়া গুনতে হবে তাদের। নগরীর মুরাদপুরের গাউছিয়া আবাসিক এলাকার ভাড়াটিয়া মো. রুবেল বলেন, হোল্ডিং ট্যাক্স যখন পুনর্মূল্যায়ন করেছিল, তখনই অনেক বাড়ির মালিক ভাড়া বাড়িয়েছেন। নতুন এই অজুহাতে আরেক দফা ভাড়া বাড়াবে। দ্রব্যমূল্যের দাম বেড়েছে কিন্তু বেতন বাড়েনি। নির্ধারিত বেতনে যেখানে জীবন-জীবিকা সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে সেখানে এটা মড়ার উপর খাড়ার ঘা হবে। চসিকের এ সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা জরুরি।

নগরীর পাঁচলাইশ এলাকার একটি আবাসিক ভবনের মালিক আবদুল কাদের বলেন, ‘আগে ভবনের মূল্যায়ন করা হতো বর্গফুটের ভিত্তিতে। কিন্তু নতুন নিয়মে তা ভবনের ভাড়া বা আয়ের বিপরীতে নির্ধারণ করা হবে। নগরবাসীর আন্দোলনের মুখে এতদিন এটি স্থগিত ছিল। এখন যদি কার্যকর হয় তাহলে ভাড়াটিয়াদের ভাড়া বৃদ্ধি করা ছাড়া আমাদের কোনো উপায় নেই।’আরেকজন ভবনমালিক বলেন, ‘করোনার কারণে অনেক দিন বাসা খালি ছিল। বিদ্যুৎ ও পানির দামও বেড়েছে। এখন হোল্ডিং ট্যাক্স বাড়লে বাড়ির মালিকদের পথে বসা ছাড়া উপায় থাকবে না। স্বাভাবিকভাবেই বাড়ি ভাড়া বাড়াতে হবে।’

বাসাভাড়ার আয় থেকে আয়কর, তারওপর গৃহকরের চাপ বাসাভাড়া থেকে আয় করেন গৃহমালিকরা। সেখান থেকে আয়কর দেন, গৃহকর বাড়ানোর কারণে সেখান থেকে গৃহকরও দিতে হচ্ছে। অর্থাৎ একই বিষয়ে দুইবার টাকা দিতে হবে তাদের। ফলে ভবনমালিকদের বিপাকে পড়তে হবে। করোনার ধকল কাটিয়ে উঠতে না-উঠতে এ বাড়তি করের বোঝা তাদের ভীষণ চাপে ফেলবে বলে মনে করছেন। আবুদর রশীদ নামের নগরীর চকবাজার এলাকার একজন বাড়িওয়ালা বলেন, বিদ্যুৎ-গ্যাসের দাম বেড়েছে। দ্রব্যমূল্যের ব্যাপক উর্ধ্বগতির এ সময় বর্ধিত গৃহকর আদায় করা আমার পক্ষে সম্ভব না। আমি মনে করি, সিটি মেয়র নির্বাচনী ওয়াদা ভঙ্গ করে রাজস্ব বিভাগের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ঘুষের অবাধ সুযোগ করে দেওয়ার জন্য এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। নয়তো সেবা বাড়ানোর মুরোদ নেই, গৃহকর বাড়াতে মরিয়া হয়ে উঠছেন কেনো।

চট্টগ্রাম করতাদা সুরক্ষা পরিষদের নেতারা জানান, এ মুহূর্তে পৌরকর বাড়ানোটা অযৌক্তিক। বাসা ভাড়া দিয়ে ভবন মালিকরা আয় করে। ওই আয় থেকে সরকারকে আয়কর দেন। তাহলে আবার কেন গৃহকর দিতে হবে। সাধারণ মানুষের কাছ থেকে পুনর্মূল্যায়ন অনুযায়ী ট্যাক্স আদায়ের বিরুদ্ধে আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাব।

এ বিষয়ে একুশে পদকপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম বলেন, ‘১৯৮৬ সালে স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের মেয়াদে এক ভুল অধ্যাদেশে গৃহকরের এ ধারণার জন্ম হয়েছিল, যা বিশ্বের আর কোথাও চালু নেই। বাড়িভাড়া হলো বাড়ির মালিকের আয়, যার ভিত্তিতে তিনি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে নিয়মমাফিক প্রতি বছর আয়কর পরিশোধ করতে বাধ্য। ঐ একই বাড়িভাড়ার আয়ের ভিত্তিতে যদি তাঁকে আবার গৃহকর দিতে হয় তাহলে তো আয়ের ওপর ‘ডাবল ট্যাক্সেশন’ হয়ে যাবে, যা সর্বস্বীকৃত করনীতির পরিপন্থী।’

গৃহকরে চসিক মেয়রের নির্বাচনি ‘প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগ সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনের আগে ইশতেহারে ‘বাড়িওয়ালা ভাড়াটিয়া কেউ যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সেভাবে যৌক্তিক হারে গৃহকর নির্ধারণ করার’ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী। কিন্তু চট্টগ্রাম নগরবাসীর কাছ থেকে বর্ধিত হারে গৃহকর আদায় করা হলেও তিনি দাবি করছেন, নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী পৌরকর বৃদ্ধি করেননি তিনি। একটি মহল হীনস্বার্থে বিষয়টি নিয়ে প্রোপাগান্ডা ছড়াচ্ছে।

মেয়রের বক্তব্যের বিষয়ে করদাতা সুরক্ষা পরিষদের মুখপাত্র হাসান মারুফ রুমী বলেন, মেয়রের বক্তব্য খুবই চাতুর্যপূর্ণ। তিনি বোঝাতে চাচ্ছেন, আগের মেয়র কর যেটি বাড়িয়েছেন, তা থেকে তিনি আর বাড়াননি। কিন্তু নগরবাসীর আন্দোলনের কারণে আগের মেয়রের যে বর্ধিত কর আদায় স্থগিত ছিল, সেটি তিনি ঠিকই আবেদন করে প্রত্যাহার করেছেন। এটি স্পষ্ট, তাঁর নির্বাচনী ওয়াদার বরখেলাপ। এমন বক্তব্যের কারণে তাঁর সম্পর্কে মানুষের ধারণা পাল্টে যাবে।

তিনি বলেন, গৃহকর বাড়বে না, আমরা এটি বলছি না। আমাদের দাবি, আগের মেয়ররা যেভাবে বর্গফুটের ভিত্তিতে কর আদায় করেছেন, সেভাবে করতে। এখন ভাড়ার ভিত্তিতে কর আদায় করায় ১৫ থেকে ২০ গুণ পর্যন্ত বেড়েছে।

তিনি আরও বলেন, ১৯৮৬ সালে সিটি করপোরেশন ট্যাক্সেন রুলস’ অধ্যাদেশ জারি করা হয়। অধ্যাদেশ জারির ৩৬ বছর পর কোথাও তা বাস্তবায়ন করা হয়নি। অথচ চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন বাড়িভাড়ার আয়কে ভিত্তি ধরে হোল্ডিং ট্যাক্স নির্ধারণ করছে। যা বাড়ি মালিকদের ওপর বাড়তি করের বোঝা চাপছে। পৃথিবীর কোথাও হোল্ডিং ট্যাক্স বাড়িভাড়ার আয়ের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয় না। তিনি আরও বলেন, এ অধ্যাদেশ বাতিল না করা পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।

এ বিষয়ে চসিক মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, সিটি করপোরেশন চলে নগরবাসীর দেওয়া করের ওপর ভিত্তি করে। কর না পেলে করপোরেশন চলবে কী করে। তবে কর বাড়ানো হচ্ছে না। বাড়ানো হবে করের আওতা। এক তলা ভবন দোতলা বা বহুতল হয়েছে। তাহলে এই ভবনের মূল্যায়নও বাড়বে। একইভাবে ভবন বা ফ্ল্যাটের দামও ১০ বছরে অনেক বেড়েছে। সে অনুযায়ী পুনর্মূল্যায়ন হবে। কর নেওয়া হবে নির্ধারিত ১৭ শতাংশ হারেই। তাই কর বাড়ানো হচ্ছে, এটা বলা যাবে না। তবে অসঙ্গতি হয়ে থাকলে আপিল করার পরামর্শ দিয়ে চসিক মেয়র বলেন, আপিল করলে তা সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসা হবে। ইতোমধ্যে যারা আবেদন করেছেন সেগুলো সহনীয় করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম করদাতা সুরক্ষা পরিষদের সভাপতি নুরুল আবছার বলেন, ‘নির্বাচনের আগে এম রেজাউল করিম চৌধুরীর বাসায় গেলে জানতে চেয়েছিলাম, মহিউদ্দিন চৌধুরী গৃহকরে হাত দেননি। আপনি কি করবেন? তখন রেজাউল করিম চৌধুরী বললেন, আমার নেতা যেখানে হাত দেন নাই, সেখানে হাত দিয়ে আমার নেতাকে অপমান করতে চাই না। গৃহকর বাড়াবো না। কিন্তু চেয়ারে বসার পর ৫ হাজার টাকার গৃহকর ১ লাখ ২০ হাজার টাকা দাবি করছেন। কালেক্টররা লাখ লাখ টাকা ঘুষ বাণিজ্য চালাচ্ছে। কালেক্টররা বলছে, এর ভাগ মেয়র পর্যন্ত যায়। আপনাকে মেয়র বানিয়ে আমরা কী অপরাধ করেছি- এমন প্রশ্ন তুলে নুরুল আবছার বলেন, রাষ্ট্রের মালিক জনগণ। মেয়র-কাউন্সিলররা সেবক। সেবা দেওয়ার জন্যই তাদেরকে আমরা ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছি। ১৫ টনের ধারণক্ষমতার সড়ক দিয়ে ৮০ টন ওজনের মালবাহী লরি চলে সড়ক নষ্ট করছে। যেসব মিল-কারখানা এসব লরির মালিক, মেয়র তাদের কাছ থেকে কর আদায় করেন না।’

একুশে পদকপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ ড. মইনুল ইসলাম গত ১৮ আগস্ট একটি পত্রিকায় লিখেছেন, অযৌক্তিক ভাবে গৃহকর বাড়িয়ে দিয়ে আপিলের মাধ্যমে তা কমিয়ে দিলে শুধু দুর্নীতিই বাড়বে। সরকারকেও উপলব্ধি করতে হবে যে বাড়িভাড়ার আয়ের ভিত্তিতে গৃহকর নির্ধারণ মারাত্মক ভুল পদ্ধতি। গৃহকর যেহেতু সম্পত্তি কর (প্রোপার্টি ট্যাক্স) তাই সারা বিশ্বের সিটি গভর্ণমেন্টগুলো সম্পত্তির লোকেশন, স্থাপনার মান ও ধরণ এবং আয়তনের ভিত্তিতে হোল্ডিং ট্যাক্স নির্ধারণ করে থাকে। করদাতার বাড়িভাড়ার আয়ের ভিত্তিতে যেহেতু এনবিআর কর্তৃক আয়কর নির্ধারিত হয় তাই আবার হোল্ডিং ট্যাক্স নির্ধারণেও যদি বাড়িভাড়ার আয়কেই নির্ধারক বিবেচনা করা হয় তাহলে ‘ডাবল ট্যাক্সেশন’ সমস্যার সৃষ্টি হবে, যা করনীতির চরম লঙ্ঘন বিধায় বাতিলযোগ্য।

তিনি আরও লিখেছেন, স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের কোন আমলার বা মন্ত্রীর উর্বর মস্তিষ্ক থেকে বাড়ীভাড়ার আয়ের ভিত্তিতে গৃহকর নির্ধারণের যে ধারণা বেরিয়ে এসেছে সেটাকে অপরিবর্তনীয় বিবেচনা করা ক্ষমতাসীন মহাজোট সরকারের জন্যেও বড়সড় ভুল হয়ে যাচ্ছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশ ভারত, দেশটি আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী। ওখানকার সব সিটি কর্পোরেশনে যে নিয়মে হোল্ডিং ট্যাক্স আদায় করা হয় আমাদের দেশে সে নিয়ম অনুসরণ করলে অসুবিধে কোথায়? অতএব, ১৯৮৬ সালের ‘দি সিটি কর্পোরেশন ট্যাক্সেশন রুলস’ যথাযথ সংশোধন করে একটি নূতন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়ার জন্যে আমি সরকারের কাছে আবেদন জানাচ্ছি।