শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

মুহিবুল্লাহ হত্যার এক বছর: কোটি টাকায় মূলহোতাকে বাদ দেওয়ার অভিযোগ

| প্রকাশিতঃ ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২২ | ১০:৫৩ অপরাহ্ন


জসিম উদ্দিন, কক্সবাজার : কক্সবাজারের উখিয়ার লাম্বাশিয়া আশ্রয় শিবিরে ‘আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস (এআরএসপিএইচ)’ নামক সংগঠনের কার্যালয়ে বন্দুকধারীদের গুলিতে ২০২১ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে নিহত হন রোহিঙ্গাদের নেতা মুহিবুল্লাহ; তিনি ওই সংগঠনের চেয়ারম্যান ছিলেন।

পরদিন ৩০ সেপ্টেম্বর মুহিবুল্লাহর ছোটভাই হাবিবুল্লাহ বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলার তদন্ত করেন উখিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) গাজী সালাহ উদ্দিন। দীর্ঘ তদন্ত শেষে গত ১৩ জুন ২৯ জন আসামির বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন তিনি।

যদিও এ হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের নায়ক, আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা) প্রধান আতাউল্লাহ আবু আম্মার জুনুনিকে তার সঠিক নাম-ঠিকানা পাওয়া যায়নি উল্লেখ করে দায়মুক্তি দিতে আদালতের কাছে সুপারিশ করেছেন তদন্তকারী কর্মকর্তা।

মুহিবুল্লাহ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে একে একে গ্রেপ্তার হওয়া ১৪ আসামির মধ্যে ইলিয়াসসহ তিন কথিত আরসা নেতা আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। প্রত্যাবাসন নিয়ে সক্রিয় থাকায় মিয়ানমারের পরামর্শে ও আরসা নেতা আতাউল্লাহ আবু আম্মার জুনুনির নির্দেশে মুহিবুল্লাহকে হত্যা করা হয় বলে এতে উঠে আসে।

হত্যার পর খুনিরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে ধরা পড়ার আগে তাদেরকেও হত্যার নির্দেশ দেন আতাউল্লাহ আবু আম্মার জুনুনি।

রোহিঙ্গাদের অভিযোগ, সাধারণ রোহিঙ্গাদের চোখে ধুলো দিয়ে আরসা আমির আতাউল্লাহসহ আরও কয়েকজন শীর্ষ নেতা মিয়ানমার সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে গোপনে কাজ করে আসছেন।

যেভাবে খুন করা হয় মুহিবুল্লাহকে

২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১ সাল। এশার নামাজ শেষে মুহিবুল্লাহ নিজ শেডে প্রবেশ করেন। এরপর পরিকল্পনা মতো মুর্শিদ আমিন মুহিবুল্লাহকে বাইরে ডেকে নিয়ে প্রত্যাবাসন বিষয়ে আলাপ করেন। এ সময় কিছু লোক অফিসে কথা বলবেন বলে জানালে মুহিবুল্লাহ তার অফিসে যান।

মুহিবুল্লাহর অফিসে অবস্থান করার বিষয়টি মো. আনাছ ও নুর মোহাম্মদকে জানানো হয়। এ দুজনই হত্যাকাণ্ডে জড়িত অন্যদের ঘটনাস্থলে আসার সংকেত দেন। এ সময় ওঁৎ পেতে থাকা সাতজন মুখোশ পরা অস্ত্রধারী মুহিবুল্লাহর অফিসে অবস্থান নেন। সেখান থেকে তিনজন মুহিবুল্লাহর অফিসে ঢোকেন। ঘটনার সময় মুহিবুল্লাহ ১০-১৫ জন রোহিঙ্গার সঙ্গে কথা বলছিলেন।

এ সময় অস্ত্রধারীদের একজন মুহিবুল্লাহকে বলেন, ‘মুহিবুল্লাহ ওঠ’। চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াতেই প্রথম দুর্বৃত্ত একটি, দ্বিতীয় দুর্বৃত্ত দুইটি ও তৃতীয় দুর্বৃত্ত একটি গুলি করে। চারটি গুলি গায়ে বিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন মুহিবুল্লাহ।

চলতি মাসের ১১ সেপ্টেম্বর আলোচিত এ মামলার ২৯ জন আসামীর বিরুদ্ধে চার্জ গঠনের মধ্য দিয়ে বিচার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আসামীদের মধ্যে ১৪জন কারাগারে বাকি ১৫ জন পালাতক রয়েছে।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী পিপি ফরিদুল আলম বলেন, পরবর্তী বিচার কার্যের জন্য আদালত শিগগিরই সময় নির্ধারণ করবেন বলে জানিয়েছেন। সাক্ষীদের সমন জারি করে, দ্রুত সময়ের মধ্যে তাদের সাক্ষ্য সম্পন্ন করে বিচার কার্যক্রম শেষ করা যায়।

কোটি টাকায় মূলহোতাকে বাদ দেয়ার অভিযোগ

মামলার আসামিরা কথিত আরসা আমির আতা উল্লাহর নির্দেশে মুহিবুল্লাকে হত্যা করা হয়েছে বলে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। পাশাপশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার পৃথক তদন্তে এ তথ্য উঠে এসেছে। এরপরও এ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা তৎকালীন উখিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) গাজী সালা উদ্দিন আতা উল্লাহর নাম ঠিকানা পাওয়া যায়নি উল্লেখ করে তাকে মামলা থেকে অব্যাহতি দিতে আদালতের কাছে সুপারিশ করেছেন।

অথচ সাধারণ রোহিঙ্গারা সবাই আতা উল্লাহর পিতার নাম জানেন। রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও চট্টগ্রামে আতা উল্লাহর অস্থায়ী ঠিকানা রয়েছে। এ ছাড়াও মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দেয়ার আগে চলতি বছরের ১৬ জানুয়ারি আরসা আমির আতাউল্লাহ জুনুনীর সহোদর মো. শাহ আলীকে (৫৫) আগ্নেয়াস্ত্র এবং মাদকসহ গ্রেফতার করেছে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (১৪ এপিবিএন)। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি আতাউল্লাহর সাথে তার যোগাযোগের কথা স্বীকার করেছিলেন। তার নামে উখিয়া ও বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা রয়েছে। শাহ আলী এখনো কারাগারে রয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র ও মামলার তথ্য অনুযায়ী, উখিয়ার কুতুপালং ৬ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সি-১০ ব্লক এবং চট্টগ্রাম শহরের কোতোয়ালী থানার দেওয়ান বাজারের জয়নব কলোনির আরসা নেতা আতাউল্লাহর বসতি রয়েছে। তার পিতার নাম মৃত গোলাম মোহাম্মদ। এরপরও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আতাউল্লাহর পিতার নাম ও তার ঠিকানা পাননি বলে দাবি করেছেন।

রোহিঙ্গাদের একাধিক সূত্র অভিযোগ করে জানিয়েছেন, মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা গাজী সালা উদ্দিন ৩ থেকে ৫ কোটি টাকার বিনিময়ে আতাউল্লাহকে মামলা থেকে অব্যাহতি দিয়েছেন। তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার আগে চট্টগ্রামে এবং সৌদি আরবের মক্কা নগরীর নাক্কাসা থেকে গাজী সালা উদ্দিনের প্রতিনিধিরা এ টাকা গ্রহণ করেন।

মামলা থেকে রেহাই পেতে এত টাকা দেওয়ার বিষয়টি কতটুকু বিশ্বাসযোগ্য, সে বিষয়ে প্রশ্ন করলে তারা আরও জানিয়েছেন, মুহিবুল্লাহ হত্যাকাণ্ডের আসামি হয়ে গেলে আন্তর্জাতিকভাবে আস্থার সংকটে পড়বেন আতাউল্লাহ এবং তার সংগঠন নিষিদ্ধ হতে পারে। এতে করে সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশ থেকে রোহিঙ্গাদের অর্থ পাঠানো বন্ধ হয়ে যাওয়ার আংশকা রয়েছে। এ কারণে বিপুল পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে হলেও তিনি মামলা থেকে নাম বাদ দিতে মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে তৎকালীন পরিদর্শক (তদন্ত) ও বর্তমানে ঢাকায় কর্মরত গাজী সালা উদ্দিন বলেন, কোটি টাকা তো দূরের কথা এক কাপ চা’ও আমি কারও কাছ থেকে খাইনি।

নাম-ঠিকানা ও সব তথ্য থাকার পরও আতা উল্লাহকে কীভাবে মামলা থেকে অব্যাহতি দিয়েছেন, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি যেমন পেয়েছি, তেমনি দিয়েছি।

উখিয়া থানার ওসি শেখ মোহাম্মদ আলী বলেন, মামলাটি আমি উখিয়া থানায় যোগ দেয়ার আগে ওসির স্বাক্ষরে অভিযোগপত্র দেয়া হয়েছে। তবে এতটুকু বলতে পারি, খুনের ঘটনায় জড়িত থাকার প্রমাণ পেলে এবং নাম-ঠিকানা সব ঠিক থাকলে তদন্তকারী কর্মকর্তা আসামির নাম বাদ দিতে পারেন না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) রফিকুল ইসলাম বলেন, তদন্ত কর্মকর্তার সাথে টাকার লেনদেনের বিষয়টি বলতে পারবো না। তবে তদন্তে যদি আতা উল্লাহর নাম-ঠিকানা সঠিক পাওয়া যায় বা সে যদি গ্রেপ্তার হয় তার বিরুদ্ধে সম্পূরক চার্জশিট দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।