শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

চসিক: জব্দ করা মালামাল নিয়ে নয়ছয়

| প্রকাশিতঃ ২ অক্টোবর ২০২২ | ৮:৩৭ অপরাহ্ন


জোবায়েদ ইবনে শাহাদাত : চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) উচ্ছেদ অভিযানে জব্দকৃত মালামাল ‘নয়ছয়’ করার অভিযোগ উঠেছে প্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা আবুল হাসেমের বিরুদ্ধে। অভিযোগ, উচ্ছেদ অভিযানে জব্দ করা মালামাল নিজের ইচ্ছেমতো বিক্রি করছেন তিনি। শুধু তাই নয়, নিলাম পরিচালনার প্রচলিত বিধানের তোয়াক্কা না করে জব্দকৃত মালামাল বিক্রি করে পাওয়া টাকা লোপাটের অভিযোগও রয়েছে আবুল হাসেমের বিরুদ্ধে। আরও অভিযোগ, জব্দকৃত মালামালের তালিকা কিংবা বিক্রির রেকর্ড পরিচ্ছন্নতা বিভাগে রাখছেন না তিনি।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে আবুল হাসেম উল্টো একুশে পত্রিকার এ প্রতিবেদককে প্রতিবেদন প্রকাশ না করার অনুরোধ করেন; তিনি একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আপনি যদি নিউজটা করেন তাহলে সেটা আমার জন্য অসুবিধা, ম্যাজিস্ট্রেটের জন্যও অসুবিধা। এখানে আমার যেমন দায়বদ্ধতা আছে ম্যাজিস্ট্রেটেরও দায়বদ্ধতা আছে। আপনারা নিউজটি করলে আমাদের কাজেও স্থবিরতা চলে আসবে। আপনার কাছে অনুরোধ থাকবে নিউজটি না করার।’ এ সময় অভিযোগকারী এবং তথ্যদাতার নাম প্রকাশের জন্যও ‘আবদার’ করেও বসেন তিনি।

সংশ্লিষ্টরা জানান, জব্দকৃত মালামাল বিক্রির কার্যক্রমকে বৈধতা দিতে অভিনব কৌশল অবলম্বন করছেন আবুল হাসেম। পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেওয়া ছাড়াই নিজস্ব পদ্ধতিতে মালামাল বিক্রি করে এতে নিলামের নাম জুড়ে দিয়েছেন তিনি। গত ৪, ৫, ১১ ও ১৪ সেপ্টেম্বর আবুল হাসেম পরিচালিত কথিত সেই নিলামের বেশকিছু নথি এসেছে একুশে পত্রিকার হাতে। আবুল হাসেমের নামসর্বস্ব নিলামের নথি পর্যালোচনা করে বেশ কিছু অসংগতি দেখা যায়।

আবুল হাসেম স্বাক্ষরিত ৪ সেপ্টেম্বর জব্দকৃত মালামাল নামসর্বস্ব নিলামের সেই কাগজে দেখা যায়, দুটি আইটেমে (পাথর ও ফার্নিচার) মোট ১০ জন ব্যক্তির নাম ও মোবাইল নাম্বার লেখা আছে। পাথর আইটেম নিলামের জন্য ৩ জনের নাম লিপিবদ্ধ করা হলেও সেগুলোর ডাকের কোনো মূল্য লেখা হয়নি। অভিযোগ আছে, হাসেমের কাছের এক ব্যক্তিকে নামমাত্র মূল্যে এসব পাথর পরবর্তীতে বিক্রি করা হয়েছে।

অপরদিকে ফার্নিচার কেনায় ৭ জনের আগ্রহ থাকলেও সর্বোচ্চ দর ২০ হাজার টাকা ডেকে আনোয়ার হোসেন নামে এক ব্যক্তি ফার্নিচারগুলো কেনেন। সেই কাগজে আবুল হাসেমের স্বাক্ষরসহ লেখা ছিল- সর্বোচ্চ ডাক পাওয়ায় আনোয়ার হোসেনকে মালামাল বুঝিয়ে দেওয়া হলো।

৫ সেপ্টেম্বর সেপ্টেম্বর জব্দকৃত মালামাল নিলামেও একইভাবেই নিজস্ব পদ্ধতিতেই নিলাম কার্যক্রম পরিচালনা করেন আবুল হাসেম। আলাদা আলাদা আইটেম নিলামে তুললেও এসব মালামালের কোনো নাম উল্লেখ না করে সরাসরি উন্মুক্ত নিলামের নামে বিক্রির উদ্দেশ্যে তোলেন তিনি। মোট ৯ জন আগ্রহীর মধ্যে ৪৬ হাজার টাকায় সর্বোচ্চ ডাক দিয়ে মালামাল ক্রয় করেন ওমর ফারুক নামে এক ব্যক্তি।

১১ সেপ্টেম্বর জব্দকৃত মালামাল ‘হাসেম-নিয়মে’ নিলামে তোলা হয় আইটেমের নাম উল্লেখ না করেই। আবুল হাসেম স্বাক্ষরিত সেই কাগজে দেখা যায়, মোট ৪ জন আগ্রহীর মধ্যে মফজল আহমদ সর্বোচ্চ ডাক দিয়ে ১৩ হাজার ৮০০ টাকায় মালামাল পান। সেই কাগজের নিচে হাসেম আরও লিখেন, ৪ হাজার টাকা খরচ (লেবার, মাইকিং ড্রাম ট্রাক ড্রাইভার ও স্ট্রাইকিং ফোর্সের সকালের খাবার বাবদ) বাদে বাকি ৯ হাজার ৮০০ টাকা ক্যাশিয়ার (একাউন্স ডিপার্টমেন্ট) এর কাছে জমা দেওয়ার জন্য হৃদয়কে (সুপারভাইজার) বলা হলো।

১৪ সেপ্টেম্বর জব্দকৃত মালামালও একইভাবে (আইটেমের নাম উল্লেখ না করে) নিলামে তোলা হয়। এদিন মালামাল ক্রয়ে আগ্রহী ছিলেন মোট ১৪ জন। যাদের মধ্যে মো. মনা নামে এক ব্যক্তি ২৬ হাজার ৮০০ টাকা সর্বোচ্চ ডাকে মালামাল ক্র‍য় করেন।

এসব নিলামে অংশগ্রহণকারী বেশ কয়েকজনের সাথে কথা বলে জানা যায়, ম্যাজিস্ট্রেটের অনুপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত নিলামের মালামাল ক্রয়ের কোনো রশিদ ক্রেতাকে দেওয়া হয়নি। শুধুমাত্র নিলামে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিদের নাম লিপিবদ্ধ করে একটি কাগজে কে কত টাকা দর ডেকেছেন তা লিখে স্বাক্ষর করে দেন আবুল হাসেম। নিজের কিংবা কর্পোরেশনের কোনো সীলও সেখানে দেন না তিনি।

৪ সেপ্টেম্বর জব্দকৃত মালামালের নিলামে অংশগ্রহণকারী মিথুন নাথ বলেন, ‘নগর ভবনে বেশকিছু লোহা ও ফার্নিচার বিক্রি করা হবে জানতে পেরে সেগুলো কেনার উদ্দেশ্যে সেখানে যাই। গিয়ে দেখি আরও অনেকেই মালামাল কিনতে এসেছেন। পরে হাসেম সাহেব নিজেকে ম্যাজিস্ট্রেট পরিচয় দিয়ে আমাদের নাম ও মোবাইল নাম্বার একটা সাদা কাগজে লিখে বললেন, কে কত দিবা বলো। তারপর একেকজন একেক ডাক দিতে লাগলো। পরবর্তীতে তাদেরই একজন লোক ডাক পেয়েছিল।’

৫ ও ১১ সেপ্টেম্বর নিলামে অংশগ্রহণকারী আব্দুর রহিম বলেন, ‘নিলামের কোনো পেপার বিজ্ঞপ্তি আমরা পাইনি। কর্পোরেশনের কয়েকজন লোক আমাদের ফোন করে নিলামের কথা জানায়। নিলামের বৈধতা নিয়েও আমার সন্দেহ আছে। কারণ নিলামের সময় কোনো ম্যাজিস্ট্রেট উপস্থিত থাকে না। সর্বোচ্চ ডাক দেওয়া ব্যক্তির কাছে মালামাল বিক্রি করা হয়। কিন্তু ক্রেতাকে কোনো রশিদই দেওয়া হয় না। কে কত টাকা ডাক দিয়েছে এমন একটা কাগজের ফটোকপি দেওয়া হয়। সেখানে হাসেম সাহেবের সই থাকলেও কোনো সীল থাকে না।’

১৪ সেপ্টেম্বর আবুল হাসেম স্বাক্ষরিত নিলাম তালিকার ৩ নম্বরে মো. শাকিলের নাম সংযুক্ত করে একটি ডাক দেখানো হলেও শাকিলের অভিযোগ তার নাম সংযুক্ত করে জালিয়াতি করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘কেমন পদ্ধতিতে নিলাম হচ্ছে তা দেখার জন্য আমি ওই দিন গিয়েছিলাম। স্ক্যাপের ব্যবসা করার সুবাদে বিভিন্ন সংস্থার নিলামে অংশগ্রহণ করেছি। কিন্তু কোথাও এ ধরনের নিলাম দেখিনি। ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতি ছাড়া মন-মর্জি মত মালামাল বিক্রি করা হচ্ছে সেখানে। এসব অনিয়ম দেখে নিলামে অংশগ্রহণ না করে আমি চলে আসি।’

নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে বেশ কয়েকমাস ধরে এভাবেই সিটি কর্পোরেশনের অস্থায়ী কার্যালয়ের সামনে মালামাল বিক্রি করে আসছেন আবুল হাসেম। যদিও গণমাধ্যমে পাঠানো প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, অভিযান পরিচালনা করে চসিকের নালা, ফুটপাত, রাস্তা দখল করে গড়ে উঠা অবৈধ দোকানপাট ও স্থাপনা উচ্ছেদ করে দখলমুক্ত করা হয়েছে। যদিও এসব প্রেস বিজ্ঞপ্তির কোথাও মালামাল জব্দের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি।

উচ্ছেদ অভিযানে ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠানের মালামাল জব্দ করার পর জব্দ তালিকা করে সংশ্লিষ্টদের কাছে সেই কপি সরবরাহ করা এবং নিলামের পূর্বে তাদের এ সম্পর্কে অবহিত করার নিয়ম থাকলেও তা করেননি আবুল হাসেম। জোর খাটিয়ে মালামাল ট্রাকে তুলে নিয়ে গিয়ে সরাসরি বিক্রি করে দিয়েছেন তিনি।

প্রচলিত বিধান অনুযায়ী, দুই ভাবে মালামাল নিলাম করা যায়। একটি হলো দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে নিলাম, অন্যটি উন্মুক্ত নিলাম। দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে নিলামের ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত ধাপসমূহ অনুসরণ করতে হবে-

জব্দকৃত মালামাল নিলামের জন্য ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে নিলাম পরিচালনা কমিটি গঠন করতে হবে। এরপর নিলামযোগ্য পণ্যের তালিকা প্রস্তুত করে মালামাল লটভুক্ত (প্রতিটি লটের বিপরীতে একটি নাম্বার প্রদান) করে সংশ্লিষ্ট দলিলাদি ও তালিকা কর্তৃপক্ষকে সরবরাহ করবে। লটভুক্ত পণ্যের মূল্য নির্ধারণের লক্ষ্যে এর গুণগত মান, পরিমাণ ইত্যাদি পরীক্ষা করে প্রতিবেদন প্রদানের জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সমন্বয়ে ইনভেন্ট্রি টিম গঠন করতে হবে।

নিলাম পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষ ইনভেন্ট্রিকৃত লটের পণ্য নিলামে বিক্রির উদ্দেশ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে নিলামের তারিখ ও সময় নির্ধারণ করবেন। উক্ত তারিখের পর্যাপ্ত সময় পূর্বে লটগুলোকে নিলাম ক্যাটালগভুক্ত করার জন্য লটের তালিকা নিলামকারীকে সরবরাহ করতে হবে। নিলামকারী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্ভুল ক্যাটালগ তৈরি করবেন।

পরবর্তীতে নিলাম পরিচালনা কমিটি কর্তৃপক্ষের নির্দেশক্রমে নিলাম অনুষ্ঠানের কমপক্ষে ৭ কার্যদিবস পূর্বে ২টি জাতীয় দৈনিকে এবং ১টি স্থানীয় দৈনিকে নিলামের বিজ্ঞপ্তি প্রচারের ব্যবস্থা করবেন। এছাড়া সংস্থার নিজস্ব ওয়েবসাইটেও বিজ্ঞপ্তিটি প্রচার করতে হবে। বিজ্ঞপ্তিতে নিলাম অনুষ্ঠানের তারিখ, ক্যাটালগ প্রদানের তারিখ ও ক্যাটালগের মূল্য, পণ্য পরিদর্শনের তারিখ ও সময়, জামানতের পরিমাণ ইত্যাদি উল্লেখ থাকতে হবে।

তবে পণ্য পরিদর্শনের তারিখ নিলাম অনুষ্ঠানের তারিখের কমপক্ষে ২ কার্যদিবস আগে হতে হবে। যথাসময়ে বিজ্ঞপ্তি প্রচারিত হওয়ার পর উক্ত বিজ্ঞপ্তির পেপার কাটিং নিলাম পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষের নিকট নিলামকারী উপস্থাপন করবেন।

বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখিত তারিখ ও সময়ে নিলামকারী নিলাম শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সহায়তায় আগ্রহী ক্রেতাদের লটভুক্ত পণ্য পরিদর্শনের ব্যবস্থা করবেন। দরদাতা প্রতিষ্ঠানের হালনাগাদ ট্রেড লাইসেন্স, মূসক নিবন্ধন, হালনাগাদ টিআইএন সনদপত্র থাকতে হবে। তবে ব্যক্তি শ্রেণীর দরদাতার ক্ষেত্রে হালনাগাদ টিআইএন সনদপত্র থাকতে হবে।

নিলাম পরিচালনা কমিটি নিলাম অনুষ্ঠান পরিচালনা করবেন। নিলামে অংশগ্রহণকারীদের জামানতসহ (দরপত্রে দরপত্রদাতা কর্তৃক উদ্ধৃত মূল্যের অন্যূন ১০% দরপত্রের জামানত হিসেবে উল্লেখ করতে হবে) দরপত্র দাখিলের জন্য সংশ্লিষ্ট অফিসে নিলাম বাক্স স্থাপন করতে হবে। নিলাম অনুষ্ঠানের দিনে নিলামের নির্ধারিত সময় শেষ হলে নিলামকারী নিজ দায়িত্বে সবগুলো নিলাম বাক্স সীলগালা করে নিলাম পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষ এর অফিস কক্ষে আনবেন।

নিলাম কমিটি সংরক্ষিত মূল্য ও প্রাপ্ত দরমূল্য যাচাই করে নিলাম অনুমোদন বা প্রত্যাখ্যান বিষয়ে কর্তৃপক্ষের নিকট সুপারিশ করবেন। তারপর নিলাম পরিচালনা কমিটি এবং উপস্থিত নিলামে অংশগ্রহণকারীদের সামনে প্রতিটি বাক্স খুলতে হবে। প্রতিটি লটের বিপরীতে প্রাপ্ত দরমূল্য সাজিয়ে একটি শীট তৈরি করতে হবে। উক্ত শীটে উপস্থিত সকল নিলাম অংশগ্রহণকারী, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (নিলাম) এবং নিলাম পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষ স্বাক্ষর করবেন।

নিলামে লটের বিপরীতে সংরক্ষিত মূল্যের কমপক্ষে ৬০ শতাংশ দরপত্র মূল্য পাওয়া গেলে উক্ত মূল্যে সংশ্লিষ্ট লটের পণ্য বিক্রয়ের সুপারিশ করা যাবে। সর্বোচ্চ দরদাতা নিলামে জয়ী হবেন।

অন্যদিকে উন্মুক্ত নিলামের ক্ষেত্রে উপরোক্ত সকল নিয়মাবলি অনুসরণ করতে হবে শুধুমাত্র নিলাম বাক্সে দরপত্র জমা দেওয়ার জায়গায় সকলের সামনে আগ্রহীরা নিলামের জন্য ডাক দিবেন। এক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ দরদাতা নিলামে জয়ী হবেন।

অভিযোগ আছে, উপরোক্ত নিয়মাবলি অনুসরণ না করার পাশাপাশি জব্দকৃত মালামালের কোন সঠিক রেকর্ড রাখেন না হাসেম। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভাঙা ও অকেজো মালামালই নিলামে তোলেন তিনি। যেসব মালামালের দাম বেশি (লোহা-ড্রাম, টিন-গ্যাস সিলিন্ডার, পাথর-ইট) সেগুলো নিজের পরিচিতজনদের কাছে নিলাম ছাড়াই বিক্রি করেন তিনি।

৪ সেপ্টেম্বর ফইল্ল্যাাতলী সড়ক ও নয়াবাজার থেকে বড়পোল পর্যন্ত পোর্ট কানেক্টিং সড়কস্থ ফুটপাত-নালা ও রাস্তার উপর রাখা দোকানের মালামাল ও নির্মাণ সামগ্রী, ৫ সেপ্টেম্বর কাজীর দেউরি, নুর আহমদ সড়ক, এস এস খালেদ রোড ও জামালখান সড়কস্থ ফুটপাত নালা ও রাস্তার উপর রাখা দোকানের মালামাল ও নির্মাণ সামগ্রী, ১১ সেপ্টেম্বর ষোলশহর, ২নং গেইট মোড়সহ আশপাশের রাস্তায় অভিযান পরিচালনা করে প্রায় ৫০টি অবৈধ স্থাপনা ও দোকানপাট এবং ১৪ সেপ্টেম্বর বায়েজিদ রোড ও বায়েজিদ থানা রোডে অভিযান চালিয়ে শতাধিক অবৈধ দোকানপাট ও স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়।

অভিযানে উচ্ছেদ করা এসব দোকানপাট ও অন্যান্য মালামালের বেশিরভাগই জাব্দ করেন আবুল হাসেম। যদিও নিজস্ব নিয়মে পরিচালিত নামসর্বস্ব নিলামে অতিসামান্য সংখ্যক মালামাল বিক্রির জন্য দেন তিনি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পরিচ্ছন্নতা বিভাগের এক কর্মচারী বলেন, আব্দুল হামিদ, মো. আলমগীর, মো. জাবেদ, মো. ফারুকসহ বেশ কয়েকজন ব্যক্তি নিলামে আসেন। মালামাল নিতে এসেছেন এটা বোঝানোর জন্য দু-একটা ডাকও দেন। কিন্তু তারা নিলাম থেকে মালামাল কেনেন না। হাসেম সাহেবের সাথে ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে দামি মালামালগুলো কিনে নেন। নামসর্বস্ব নিলামের নথি পর্যালোচনায়ও এসব নাম উঠে এসেছে।

পরিচ্ছন্নতা বিভাগের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘তিনি (আবুল হাসেম) দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার জন্য উদগ্রীব থাকতেন। অনিয়মেরবিষয়টি প্রথমে আমরা বুঝতে না পারলেও একের পর এক অভিযোগ পেয়ে বুঝতে পেরেছি। নিলামের নিয়মনীতি অনুসরণ না করে ইচ্ছেমতো মালামাল বিক্রি করছেন তিনি। ব্যক্তিগত সম্পর্কের অনেকের কাছে বিভিন্ন মূল্যবান মালামাল বিক্রি করে দিচ্ছেন বলেও জানতে পেরেছি।’

তিনি আরও বলেন, নিলাম সংক্রান্ত কোন তথ্যের হিসেবেই তিনি কর্পোরেশনের পরিচ্ছন্নতা বিভাগে রাখেন না। এ বিষয়ে বিভাগের অন্যান্য কর্মকর্তাদের সাথে কোনো আলাপ-আলোচনাও করেন না। আপনারা একদিন নিলামে উপস্থিত থাকলে দেখবেন কতটা অনিয়ম তিনি করেন। ম্যাজিস্ট্রেট, জব্দ তালিকা ছাড়াই নিজের ইচ্ছেমতো মালামাল বিক্রি করে দিচ্ছেন। এসব দেখার কেউ নেই।

এদিকে, নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য সিটি কর্পোরেশনের পরিচ্ছন্ন কর্মীদের নিয়ে গঠিত স্ট্রাইকিং ফোর্সের মাধ্যমে হেনস্তার অভিযোগও উঠেছে হাসেমের বিরুদ্ধে। সর্বশেষ গত ২৯ আগস্ট সাগরিকা থেকে পোর্ট কানেকটিং রোডে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার সময় বেলায়েত হোসেন নামে এক গাড়ি ব্যবসায়ীকে শারীরিকভাবে হেনস্তা করার অভিযোগ উঠে তার বিরুদ্ধে।

ওয়ালী কার সেন্টারের স্বত্ত্বাধিকারী ও রিকন্ডিশন্ড ভেহিক্যালস ইম্পোর্টার্স অ্যান্ড ডিলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বারভিডা) সাবেক নির্বাহী সদস্য বেলায়েত হোসেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা আবুল হাশেমের বিরুদ্ধে শারীরিক হেনস্তা এবং তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সিলগালা করার হুমকির বিষয়টি ৩১ আগস্ট সশরীরে উপস্থিত হয়ে সিটি মেয়রকেও জানান। পরবর্তীতে ৩ সেপ্টেম্বর এ নিয়ে অভিযোগ দেওয়া হলেও সেটি চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে গ্রহণ করা হয় পরদিন।

এ সংক্রান্ত একটি ভিডিও ফুটেজে বেলায়েত হোসেনের উপর আবুল হাসেমের নির্দেশে স্ট্রাইকিং ফোর্সের হামলা ও শারীরিক হেনস্তার বিষয়টি দেখা যায়। যদিও পরবর্তীতে মেয়রের নির্দেশে আবুল হাসেম বেলায়েত হোসেনের বাসায় গিয়ে ক্ষমা চাইলে বিষয়টির মিমাংসা হয়।

হেনস্তার অভিযোগ তুলে বাংলাবাজার এলাকার বাসিন্দা রাজু আহমেদ বলেন, ‘মূল সড়ক ব্লক করে শাখা সড়ক করার জন্য সিটি মেয়রের বেয়াই জাকারিয়া পাঁয়তারা করছেন, তার কথাতেই মেয়র মহোদয় নতুন রাস্তা করার জন্য জনগণের স্থাপনা ভাঙতে আসেন। অথচ দলিল অনুযায়ী সেখানে রাস্তার কোনো অস্তিত্ব নেই। বিষয়টি আমি হাসেম সাহেবকে বোঝাতে চাইলে তিনি আমাকে হেনস্তা করেন। তার নির্দেশে স্ট্রাইকিং ফোর্সের লোকজন আমার উপর চড়াও হয়। এসময় দলিল না দেখে গায়ের জোরে আবুল হাসেম আমাকে গ্রেপ্তারের হুমকিও দেন।’

আইনজ্ঞদের মতে, কেবলমাত্র ম্যাজিস্ট্রেটই উচ্ছেদ অভিযানে মালামাল জব্দের এখতিয়ার রাখেন। সংস্থার অন্য কোন ব্যক্তি যদি তা করেন তা আইনসিদ্ধ হবে না। এছাড়া সুনির্দিষ্ট বিধি অনুসরণ না করে নিলাম কার্যক্রম পরিচালনা করাও অপরাধ। এমন কর্মকাণ্ডে দুর্নীতি, সরকারি অর্থ আত্মসাতসহ নানা অভিযোগে অভিযুক্ত হতে পারেন আবুল হাসেম। আদালত বিষয়টি আমলে নিলে কিংবা ভুক্তভোগীদের বিচার প্রার্থনার ভিত্তিতে অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইনে শাস্তি পেতে পারেন অভিযুক্ত ব্যক্তি।

সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) চট্টগ্রাম মহানগর সভাপতি অ্যাডভোকেট আকতার কবির চৌধুরী বলেন, ‘আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার প্রতিনিধিত্ব করা কোনো কর্মকর্তার বেআইনি কাজ করার সুযোগ নেই। কোনো সংস্থার কর্মকর্তা বিধির বাইরে কোনো কাজ করতে পারেন না। সরকারি সংস্থার মালামালের নিলাম অবশ্যই বিধি অনুসরণ করে হতে হবে। এ ধরনের দুর্নীতি-অপরাধ অতি দ্রুত বন্ধ হওয়া উচিত।’

নিলাম প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘জব্দ তালিকা করা, যার মালামাল জব্দ করা হয়েছে তাকে তালিকার একটি কপি সরবরাহ করাসহ সুনির্দিষ্ট বিধি অনুসরণ না করলে তা অপরাধের শামিল। কারণ যা মালামাল জব্দ করা হচ্ছে তাকে সেগুলো ফেরত নিতে আদালতের আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ দিতে হবে। এক্ষেত্রে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাও একই দোষে দোষী হচ্ছেন।’

অভিযোগের বিষয়ে চসিকের ভারপ্রাপ্ত প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা আবুল হাসেম বলেন, ‘২-৩ হাজার টাকার মালামালের নিলামে পেপার বিজ্ঞপ্তি দেওয়া সম্ভব হয় না।’ বেশ কয়েকবার অর্ধ লক্ষাধিক টাকার মালামাল নিলাম হয়েছে সেগুলোতে কেন পেপার বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়নি এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বিষয়টা সময় সাপেক্ষ হওয়ায় আমরা এই প্রক্রিয়ায় যাই না। তবে সবকিছুর বিকল্প আছে। তাই এক্ষেত্রে আমরা মালামালগুলোর অকশন করি।’

পরবর্তীতে নিলাম কার্যক্রমে অসংগতির কথা স্বীকার করলেও চসিকের ম্যাজিস্ট্রেট নারী হওয়ায় নিলামে তাদের উপস্থিত থাকতে সমস্যা হয় বলেও জানান তিনি। লোকবল সংকটসহ বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার অজুহাতে নিলাম কার্যক্রমে যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করা সম্ভব হচ্ছে না বলেও জানান তিনি।

ম্যাজিস্ট্রেটের অনুপস্থিতিতে নিলাম কার্যক্রম পরিচালনা করা যায় কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কয়েকটি নিলামে ম্যাজিস্ট্রেট উপস্থিত ছিলেন। যে ক্ষেত্রে ম্যাজিস্ট্রেট উপস্থিত থাকেন না সে ক্ষেত্রে আমদের কর্মকর্তাদের রাখা হয়। তবে আমরা নিলামের বিষয়ে ম্যাজিস্ট্রেটকে অবহিত করি। তবে ছোটখাটো নিলাম আমরাই করে ফেলি।’

নিলামে অংশ নেওয়া ক্রেতাদের সিটি কর্পোরেশনের সীলসহ রশিদ না দেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘নিলামে ডাকের কাজটাই রশিদ হিসেবে স্বীকৃত। সেই কাগজে অংশগ্রহণকারীদের নাম, মোবাইল নাম্বার এবং স্বাক্ষীর তথ্য থাকে। ভালো কাজ করতে গেলে অনেকে অনেককিছু বলবে। এটাকে (নিলাম কার্যক্রম) চাইলে অনেকদিক দিয়েই প্রশ্নবিদ্ধ করা যায়। এমনকি নেগেটিভ রিপোর্টও করতে পারবেন। তবে নিলাম কার্যক্রম আরও আইনসিদ্ধ প্রক্রিয়ায় করার চেষ্টা করবো।’

কথোপকথনের প্রায় ২ ঘন্টা পর প্রতিবেদকে ফোন করেন আবুল হাসেম। এসময় প্রতিবেদককে পরদিন সময় দেওয়ার অনুরোধ করে হাসেম জানান, বিষয়টি নিয়ে তিনি সামনাসামনি বসে বিস্তারিত আলাপ করতে চান। পরবর্তীতে অফিসে গিয়ে দেখা করলে একই কথাগুলো পুনরায় বলার পাশাপাশি এ বিষয়ে নিউজ না করার অনুরোধও করেন তিনি।

এ বিষয়ে জানতে চসিকের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মারুফা বেগম নেলীকে একাধিকবার ফোন করলেও প্রত্যেকবারই তিনি ফোন কেটে দেন।

এ প্রসঙ্গে স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ড. মহ. শের আলী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে কোনো ধরনের মালামাল জব্দ করার এখতিয়ার পরিচ্ছন্নতা বিভাগের কর্মকর্তার নেই। একমাত্র ম্যাজিস্ট্রেট এই এখতিয়ার রাখেন৷ মোবাইল কোর্ট পরিচালনার সময় পরিস্থিতি অনুযায়ী সিটি কর্পোরেশনের আওতায় মালামাল বাজেয়াপ্ত করে অর্ডারশীটে নির্দেশনা দেবেন কীভাবে মালামালগুলো নিষ্পত্তি করতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘অনিয়মের মাধ্যমে এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা হলে মানুষের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হবে। আর এমনটা হলে সরকার বিব্রত হবে। এ বিষয়ে আমি সচিব মহোদয়, সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেটের সাথে কথা বলবো। অনিয়ম পেলে অবশ্যই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’