
এম কে মনির : দেশের চতুর্থ গ্রীন শিপইয়ার্ড হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে চট্টগ্রামের অন্যতম জাহাজভাঙা শিল্প প্রতিষ্ঠান কেআর শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ড। এর মধ্য দিয়ে জাহাজভাঙা শিল্পে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা আরও একধাপ এগিয়ে গেল। একইসাথে জাহাজভাঙা শিল্প জগতের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি দানকারী প্রতিষ্ঠান জাপানের ক্লাস এনকে ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সংস্থা ব্যুরো ভেরিটাসের অন্তর্ভুক্ত হলো প্রতিষ্ঠানটি।
গত ১০ আগস্ট জাপানের ক্লাস এনকে কেআর শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডকে গ্রীন শিপইয়ার্ডের সনদ প্রদান করে। এর আরও কয়েক মাস আগে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ব্যুরো ভেরিটাসের সনদ লাভ করে কেআর।
এক দশক আগে জাহাজভাঙা শিল্পে বিনিয়োগ শুরু করেন চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের অন্যতম তরুণ শিল্প উদ্যোক্তা মো. তছলিম উদ্দিন। তাঁর হাত ধরেই বেশ সুনামের সাথে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসা পরিচালিত হয়ে আসছে। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে ২ বছর আগে তছলিম উদ্দিন তাঁর কেআর শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডকে গ্রীন শিপইয়ার্ডে রূপ দিতে ঢেলে সাজাতে শুরু করেন৷ প্রায় ৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০২৩ সালের শুরুতে তাঁর প্রতিষ্ঠানকে গ্রীন ইয়ার্ডকরণের কাজ শেষ হয়৷ এরপরই মেলে জাহাজভাঙা শিল্পে স্বীকৃতি দানকারী বিশ্বের অন্যতম সংস্থা ইউরোপীয় ইউনিয়নের ব্যুরো ভেরিটাস সনদ। সেটির পরপরই আসে বিশ্বের সর্ব্বোচ স্বীকৃতিদাতা প্রতিষ্ঠান জাপানের ক্লাস এনকে সনদও। যেটির অন্তর্ভুক্ত বিশ্বের মাত্র ৩৫টি শিপইয়ার্ড।
একসময় জাহাজভাঙা শিল্পে শ্রমিক হতাহতের ঘটনা ছিল খুবই স্বাভাবিক। শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনায় এ শিল্পটি যেমন বারবার হোঁচট খাচ্ছিল তেমনি পরিবেশের ধোঁয়া তুলে একটি স্বার্থান্বেষী মহল এ শিল্পকে বাংলাদেশ থেকে সরিয়ে নিতে ওঠে পড়ে লেগেছিল। এজন্য নানা সময়ে নানা এজেন্ডা বাস্তবায়নে নেতিবাচক বিষয়গুলোকে পুঁজি করতো ওই স্বার্থান্বেষী মহলটি। এতোসব চ্যালেঞ্জকে সামনে রেখে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তার উপর গ্রীন শিপইয়ার্ডের শর্ত জুড়ে দেয় আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো। সব চ্যালেঞ্জকে সাহসের সাথে মোকাবেলা করে অবশেষে গ্রীন শিপইয়ার্ডের তকমা নিতে সক্ষম হলো সীতাকুণ্ডের চার চারটি শিপইয়ার্ড। যার মধ্যে কেআর শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ড অন্যতম।
জাহাজভাঙা শিল্পে বিদ্যমান নেতিবাচক ধারণা দূর করে এই শিল্পে বাংলাদেশকে বিশ্বে নেতৃত্বে নিয়ে যেতে কাজ করছেন চট্টগ্রামের বেশ কয়েকজন শিল্পপতি। নেপথ্যের সেই নায়কদের একজন মো. তছলিম উদ্দিন। তিনি একুশে পত্রিকাকে বলেন, জাহাজভাঙা শিল্পে চ্যালেঞ্জ অনেক। একদিকে নেতিবাচক প্রচার ও স্বার্থান্বেষী মহলের অব্যাহত ষড়যন্ত্র। অন্যদিকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ডলার সংকট ও নিম্নমুখী বাজার দর। এসবকে শক্ত হাতে মোকাবিলা করতে হচ্ছে আমাদের। সবকিছুর মাঝে গ্রীন শিপইয়ার্ডের স্বীকৃতি চাট্টিখানি কথা নয়। আর এজন্য আমার পুরো ইয়ার্ডকে ঢেলে সাজাতে হয়েছে। প্রায় ৬০ কোটি ব্যয় হয়েছে গ্রীন ইয়ার্ডের কাজে। এর ফলে বর্হিবিশ্বে বাংলাদেশের জাহাজভাঙা শিল্পের ভাবমূর্তি যেমন উজ্জ্বল হচ্ছে তেমনি শ্রমিক হতাহতের ঘটনা একেবারে শূণ্যের কৌটায় নেমে এসেছে।
তিনি আরও বলেন, মূলত পরিবেশকে সুরক্ষিত করে ও শ্রমিকদের কাজের সর্ব্বোচ্চ নিরাপত্তা নিয়ে গড়ে ওঠেছে গ্রীন ইয়ার্ড। যেখানে রয়েছে ১৫০ টন ধারণ ক্ষমতার দৈত্যকার ক্রেন। যেটি জাহাজের কাটা অংশকে চিলের মতো চোঁ মেরে নিয়ে আসবে উপরে। হাতের কাজ থাকবে খুবই কম। সবকিছুই স্বয়ংক্রিয়ভাবে করা হবে।
কেআর শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডের এ কর্ণধার আরও বলেন, গ্রীন শিপইয়ার্ডে রয়েছে অত্যাধুনিক সব যন্ত্রপাতি। পুরো ইয়ার্ডের ফ্লোর ক্রংক্রিটের ঢালাই করা। রয়েছে পর্যাপ্ত নির্দেশনা, তথ্য প্রবাহ, নির্দিষ্ট ওয়াকওয়ে। আছে শ্রমিকদের সেইফটি গিয়ার, নিজস্ব অগ্নিনির্বাপণ ও আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থা। রয়েছে শ্রমিকদের বিশ্রামাগার, শৌচাগার, দোতলা বিশিষ্ট দাপ্তরিক ভবন, সুসজ্জিত খাওয়ার ঘর, হাসপাতাল, এ্যাম্বুলেন্স, জেনারেটর, পার্কিং জোন, চিকিৎসা উপকরণ, চিকিৎসক, নিরাপদ খাবার পানি, গোসলের ব্যবস্থাসহ আরও অনেক ব্যবস্থাপনা।
সোমবার (২৫ সেপ্টেম্বর) দুপুরে ইয়ার্ডটি ঘুরে দেখা যায়, সুসজ্জিত, পরিচ্ছন্ন-পরিপাটি বিশাল আয়তনের একটি শিপইয়ার্ড কেআর শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ড। চারিদিকে নানা জাতের সারি সারি সবুজ গাছপালা ইয়ার্ডটির সৌন্দর্য বাড়িয়েছে কয়েকগুণ। দর্শনার্থী, শ্রমিক, কর্মকর্তা এমনকি মালিককেও মাথায় হেলমেট, পায়ে গামবুট, গায়ে এপ্রোন ও আইডি কার্ড পরতে দেখা গেছে। সম্পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার পরই একজন দর্শনার্থীকে ভেতরে যেতে দেওয়া হচ্ছে। ইয়ার্ডের প্রতিটি বিভাগের সামনে পরিচিতি তথ্য তুলে ধরে হয়েছে। যেখানে সংশ্লিষ্ট বিভাগের কাজ সম্পর্কে বিস্তারিত উল্লেখ আছে। এছাড়াও ওয়াকওয়ে বজায় রেখে হাঁটতে বলা হচ্ছে সবাইকে। নিয়মশৃঙ্খলা দেখে মতে হতে পারে বিদেশের কোনো শিপইয়ার্ড এটি।
এই ইয়ার্ডের সামনে সমুদ্র তটে দাঁড়িয়ে আছে সাড়ে ৫ হাজার টনের একটি জাপানি জাহাজ। ৩১ বছরের পুরোনো জাহাজটি জাপানের একটি প্রতিষ্ঠান থেকে কিনে নিয়েছে কেআর শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ড। জাহাজের সামনে দাঁড়িয়ে আছে ১৫০ টনের দৈত্যাকার একটি ক্রেন ও কিছুটা ছোট আরও একটি ক্রেন। জাহাজের কাটা অংশগুলোকে ক্রেনের সাহায্যে তুলে এনে আলাদা পয়েন্টে রাখা হচ্ছে। এরপর মেশিনে চলছে ছোটখাটো কাটাকুটির কাজ। তারপর পরিবহন যোগে চলে যাচ্ছে ইস্পাত কারখানাগুলোতে।