শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

নতুন চ্যালেঞ্জ রপ্তানি খাতে

| প্রকাশিতঃ ২৮ জুলাই ২০২৪ | ২:৫০ অপরাহ্ন


ঢাকা : কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে দেশের রপ্তানি খাত, বিশেষ করে পোশাক রপ্তানি খাতে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে, যা ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে। তারা জানাচ্ছেন, আন্দোলনের সহিংসতা নিয়ে বিদেশি গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর এবং ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের ভাবমূর্তি সংকটে পড়েছে। এর ফলে নতুন সমস্যার মুখে পড়েছে রপ্তানি খাত।

করোনা মহামারীর পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে বাংলাদেশের রপ্তানি খাত ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, এবং এখনো সেই ধকল মোকাবিলা করছে। বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পণ্যের মূল্য প্রতিনিয়ত কমছে, কিন্তু রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) ‘অসত্য তথ্যের’ কারণে এ বিষয়ে সঠিক তথ্য প্রকাশ পায়নি।

চলতি মাসের শুরুতে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়ে ইপিবির রপ্তানি তথ্যে গলদ থাকার কথা জানায়। পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নতুন হিসাব অনুযায়ী রপ্তানি আয়ের প্রকৃত তথ্য প্রকাশ করে। তাতে দেখা যায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই-মে) পণ্য রপ্তানি থেকে ৪০.৭৩ বিলিয়ন ডলার আয় হয়েছে। পূর্বের তথ্যে উল্লেখ ছিল ৫১.৫৪ বিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ নতুন হিসাব অনুযায়ী আয় কমে গেছে ১০.৮১ বিলিয়ন ডলার।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, বিগত দশ বছরে ইপিবি ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড পণ্যের এইচএস কোডের একাধিক এন্ট্রি, কাপড়ের দর এবং স্যাম্পল আইটেমও রপ্তানি দেখিয়েছে। এছাড়া ইপিজেড থেকে দেশের ভেতরে বিক্রিকে রপ্তানি হিসেবে দেখানো হয়েছে। এসব কারণে বিগত দশ বছরে প্রায় ৬৪.৬৬ বিলিয়ন ডলার বেশি রপ্তানি হিসাব দেখানো হয়েছে।

ব্যবসায়ীরা জানান, কোভিড-১৯ এর পর ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হলে রপ্তানি খাত সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। বর্তমানে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সহিংসতার কারণে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পণ্যের ভাবমূর্তি সংকটে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে পোশাক রপ্তানি খাত আবারও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

নতুন এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় রপ্তানিতে প্রণোদনা বহাল রাখার পাশাপাশি বন্দর কর্তৃপক্ষের সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব আরোপ করছেন ব্যবসায়ীরা। বাংলাদেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৮৫ শতাংশই তৈরি পোশাক; বিশ্ব বাজারে এসব পণ্যের দরপতন চলছে।

পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি এস এম মান্নান কচি বলেন, কোভিড-১৯ ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবের পর এখন কোটা সংস্কার আন্দোলনের কারণে বিশ্ববাজারে আমাদের পণ্যের দরপতন ও অর্ডার কমে যাচ্ছে। গত দুই ঈদে আমাদের ১০-১২টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, অনেক শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছে। এখন আবার নতুন ধাক্কা সামলাতে হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, কোভিড-১৯ ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রপ্তানি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, এখন কোটা আন্দোলনের সহিংসতা ও ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় আমাদের ইমেজ ক্ষুণ্ন হয়েছে। এতে আমাদের রপ্তানি খাত নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি মো. হাতেম বলেন, কোভিড-১৯ ও ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে বাংলাদেশ রপ্তানি খাতের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। এ সময়ে ইপিবির সঠিক তথ্য না দেওয়ার কারণে রপ্তানি আদেশ ও পণ্যের দর কমেছে। এখন কোটা আন্দোলনের কারণে আমাদের রপ্তানি খাত আরও কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়েছে।

তিনি জানান, আন্দোলনের সময় চার দিন কারখানা বন্ধ থাকার কারণে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। বন্দর কর্তৃপক্ষ মাল খালাস করতে না পারার কারণে জরিমানা দাবি করছে, যা ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন সমস্যা তৈরি করেছে।
বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি আরও বলেন, বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা জানায়, ফর্মালিটিজ সম্পন্ন না হলে মাল খালাস করা যাবে না। তবে এ পরিস্থিতি ব্যবসাবান্ধব নয়। জরিমানা ছাড়াই মাল খালাসের নির্দেশনা পাওয়া উচিত ছিল।

এস এম মান্নান কচি বলেন, বহির্বিশ্বে আমাদের ইমেজ ক্ষুণ্ন হয়েছে, যার কারণে রপ্তানি খাত নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। সরকারের উচিত প্রণোদনা পুনর্বহাল রেখে রপ্তানি খাতকে সহায়তা করা।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, গত কয়েকদিনে প্রতিদিন প্রায় এক বিলিয়ন ডলার ক্ষতি হয়েছে বাংলাদেশের। এটি বাংলাদেশের জন্য একটি বিরাট ক্ষতি। কারণ বাংলাদেশ ইতোমধ্যে অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা করছে।

তিনি বলেন, সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্ন ঘটলে মূল্যস্ফীতি বাড়বে, যা ইতোমধ্যে উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।

তার ভবিষ্যদ্বাণীর পেছনে একটি শক্ত ভিত্তি রয়েছে। কারণ বাংলাদেশের বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে নয় দশমিক সাত তিন শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা ১২ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ এবং সরকারের সাত দশমিক পাঁচ শতাংশের চেয়ে বেশি।

আহসান এইচ মনসুর সতর্ক করে বলেন, সাম্প্রতিক এই সংকটের কারণে বাংলাদেশ রপ্তানি আদেশ হারাতে পারে।
আরেক প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন এই সংকটকে দেশের দ্বৈত বিপদ হিসেবে অভিহিত করেছেন। যথাক্রমে- বাস্তব জীবনের লকডাউন এবং ভার্চুয়াল লকডাউন।

তিনি বলেন, এর প্রভাব করোনা মহামারির চেয়েও মারাত্মক হবে। কারণ মহামারিতে মানুষের ব্যবসা সচল ছিল। এছাড়া মহামারির সময় অনলাইনে পেমেন্ট করা যেত। সেখানে চলতি সপ্তাহে ইন্টারনেট বিভ্রাটের কারণে সবকিছু বন্ধ ছিল।
জাহিদ হোসেন বলেন, এসব কিছু বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা কমাবে এবং দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করবে।

তিনি বলেন, ইন্টারনেট বন্ধের সিদ্ধান্ত অর্থনীতির জন্য আত্মঘাতী ছিল। এই ধাক্কা কতটা প্রবল হবে এবং কতদিন তার প্রভাব থাকবে সেটাই এখন দেখার বিষয়।