
একুশে প্রতিবেদক : দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শ্রীলংকা ও পাকিস্তান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশ এখনও উচ্চ মূল্যস্ফীতির ভারে জর্জরিত। এই আর্থিক পরিস্থিতির পেছনে বিভিন্ন কারণ কাজ করছে, যা দেশের মানুষের জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত করছে।
প্রায় দুই বছর আগে শ্রীলংকায় গণবিক্ষোভের মুখে গোতাবায়া রাজাপাকসে সরকারের পতন ঘটে। এই ঘটনাটি দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে ভেঙ্গে দেয় এবং অর্থনৈতিক সংকট আরও তীব্র হয়। তখন শ্রীলংকায় দেউলিয়াত্বের মাত্রা ছিল নজিরবিহীন। জিনিসপত্রের দাম বেড়ে মূল্যস্ফীতির হার প্রায় ৭০ শতাংশে পৌঁছেছিল। ডলার সংকটের কারণে দেশটি নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা করতে বাধ্য হয়, এবং তিন মাস ধরে মূল্যস্ফীতির হার ঋণাত্মক পর্যায়ে থাকে।
সেপ্টেম্বর মাস থেকে শুরু করে নভেম্বর মাস পর্যন্ত শ্রীলংকায় মূল্যস্ফীতি নয়, বরং মূল্যসংকোচনের ধারায় রয়েছে। অর্থাৎ পণ্যের দাম কমছে না, বরং উল্টো কমে যাচ্ছে। নভেম্বর মাসে শ্রীলংকায় মূল্যস্ফীতির হার ছিল -২.১০ শতাংশ, যা দেশের জন্য একটি ইতিবাচক সূচক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পাকিস্তানও দীর্ঘ সময় ধরে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে পড়েছে। রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা না থাকলেও, চলতি বছরে অর্থনীতি বেশ ভালোভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে পাকিস্তান বড় সাফল্য অর্জন করেছে। নভেম্বর মাসে পাকিস্তানের মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৪.৯০ শতাংশ, যা সাড়ে ছয় বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। গত বছরের এপ্রিল মাসে পাকিস্তানের মূল্যস্ফীতি ৩৮ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গিয়েছিল, তাই এটি একটি উল্লেখযোগ্য উন্নতি।
শ্রীলংকা ও পাকিস্তান সফল হলেও, বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি ক্রমবর্ধমান হচ্ছে এবং দেশের মানুষ এর চাপে কষ্ট পাচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, নভেম্বর মাসে দেশের মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১১.৩৮ শতাংশে পৌঁছেছে। অক্টোবরে এই হার ছিল ১০.৮৭ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার প্রায় ১৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে, গোটা দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি এখন সর্বোচ্চে রয়েছে।
৫ আগস্টের গণবিক্ষোভের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছেড়ে দেন এবং টানা দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরাও দেশ ছাড়েন। গণবিক্ষোভের পর জনগণের প্রত্যাশা ছিল যে দেশের ভোগ্যপণ্যের বাজারে চাঁদাবাজি বন্ধ হবে এবং জিনিসপত্রের দাম কমবে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে এই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। চাঁদাবাজরা পালিয়ে গেলেও পণ্যের দাম কমেনি, বরং বাজারে অস্থিতিশীলতা বৃদ্ধি পেয়ে দাম বাড়ছে এবং মূল্যস্ফীতির হার আরও ঊর্ধ্বগামী হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক গত দুই অর্থবছর ধরে সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি প্রণয়ন করে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। রেপো রেট ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে। ব্যাংকের ঋণের সুদহারও ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৫ শতাংশে পৌঁছে। এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে চাহিদা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হলেও মূল্যস্ফীতি কমেনি।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দেশের উচ্চ মূল্যস্ফীতির মূল কারণ সরবরাহ ঘাটতি ও বাজার অব্যবস্থাপনা। শুধুমাত্র চাহিদা নিয়ন্ত্রণ বা সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি কমানো সম্ভব নয়। জিনিসপত্রের দাম কমাতে উৎপাদন ও আমদানি বাড়ানো প্রয়োজন। অন্যথায় আগামী দুই-তিন মাসে পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে পারে।
বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, “বিরাজমান মূল্যস্ফীতি সরবরাহের ঘাটতি থেকে উদ্ভূত। সরবরাহ ব্যবস্থা দ্রুত স্বাভাবিক করতে উদ্যোগ নিতে হবে। চাহিদা নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যাংক সুদহার বাড়িয়েছে, কিন্তু এর সুফল বাজারে দেখা যাচ্ছে না।”
তিনি আরও বলেন, “পুরনো চাঁদাবাজরা পালিয়ে গেলেও নতুন চাঁদাবাজের জন্ম হয়েছে। সরকার কঠোর হতে পারেনি। বাজারের সিন্ডিকেট এখনো ভাঙা যায়নি। এগুলো ঠিক না হলে বাজারে শৃঙ্খলা ফেরানো কঠিন। সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে এবং দ্রুত আমদানি বাড়িয়ে পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।”
অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, “সরকারের গৃহীত পদক্ষেপে মূল্যস্ফীতি কমার কোনো লক্ষণ দৃশ্যমান নয়। সরবরাহ ব্যবস্থা ঠিক করতে কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। ভোক্তা অধিকার দিয়ে বাজারে অভিযান চালিয়ে বাজার ব্যবস্থা ঠিক করা সম্ভব নয়। সরকারের সব পণ্যের সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে এবং চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. মো. হাবিবুর রহমান জানান, “মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যাংকের পক্ষ থেকে সব সম্ভাব্য পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এখন আর সুদহার বৃদ্ধির সুযোগ নেই। বাজারে চাহিদার তুলনায় পণ্যের সরবরাহ কম। সরবরাহ বাড়ানোর কার্যকর উদ্যোগ দরকার।”
বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ১১.৬৬ শতাংশ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ওই মাসে হার ১০.৪৯ শতাংশে নেমে আসে বলে দাবি করা হয়। সেপ্টেম্বর মাসে এই হার কমে ৯.৯২ শতাংশে আসে। কিন্তু অক্টোবর মাসে আবার তা বাড়ে ১০.৮৭ শতাংশ এবং নভেম্বর মাসে ১১.৩৮ শতাংশে পৌঁছে যায়।
খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার নভেম্বর মাসে ১৩.৮০ শতাংশ, যা অক্টোবর মাসের ১২.৬৬ শতাংশ থেকে বেড়ে। গ্রামাঞ্চলের মূল্যস্ফীতি নভেম্বর মাসে ১১.৫৩ শতাংশ, শহরাঞ্চলে ১১.৩৭ শতাংশ। শহর ও গ্রামাঞ্চলে খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভুত মূল্যস্ফীতি যথাক্রমে ১৪.৬৩ ও ৯.৩১ শতাংশে পৌঁছে।
শ্রীলংকা, মালদ্বীপ, ভুটান, নেপাল, পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি মূল্যস্ফীতির শিকার। শ্রীলংকায় বর্তমান মূল্যস্ফীতির হার ঋণাত্মক, মালদ্বীপে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন ১.১ শতাংশ, ভুটানে ১.৩৫ শতাংশ, নেপালে ৪.৮২ শতাংশ, পাকিস্তানে ৪.৯০ শতাংশ ও ভারতে ৬.২১ শতাংশ মূল্যস্ফীতি রয়েছে।
বর্তমানে সরকারের পক্ষ থেকে বাজার স্থিতিশীল করার জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। সরবরাহ বাড়ানোর জন্য আমদানি বাড়ানো, চাঁদাবাজি প্রতিরোধ, এবং বাজারে পণ্যের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা জরুরি। এছাড়াও, সরকারের কঠোর মনোভাব বাজারের সিন্ডিকেট ভাঙতে ও চাঁদাবাজি বন্ধ করতে সাহায্য করবে বলে আশা করা হচ্ছে।