
ঢাকা : বদলি-পদায়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে স্থবিরতার কারণে শিক্ষা প্রশাসনে বর্তমানে অস্থিরতা বিরাজ করছে। এর ফলে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষায় গতিশীলতা ব্যাহত হচ্ছে। মাঠ পর্যায়ে শিক্ষার তদারকি কার্যক্রম দুর্বল হয়ে পড়েছে, কারণ দেড় শতাধিক উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার পদ শূন্য রয়েছে।
বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারকে কাঠামোর বাইরে রাখার জন্য জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের সুপারিশের প্রতিক্রিয়ায় বিসিএস জেনারেল এডুকেশন অ্যাসোসিয়েশন ১৫ দফা দাবি জানিয়েছে এবং এ বিষয়ে সুস্পষ্ট অগ্রগতি না হলে ৩১ ডিসেম্বর নতুন কর্মসূচি ঘোষণার হুমকি দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে শিক্ষা ক্যাডারে আরও অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
প্রায় ১৬ হাজার কর্মকর্তা নিয়ে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার সবচেয়ে বড় ক্যাডার। তাদের অধিকাংশই সরকারি কলেজে কর্মরত এবং বিভিন্ন শিক্ষা দপ্তরেও পদায়ন পেয়ে থাকেন।
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি), যা শিক্ষা ভবন হিসেবে পরিচিত, সারা দেশের সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে। এই অধিদপ্তরের অধীনে পাঁচ লক্ষাধিক শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর মাউশির মহাপরিচালক পদত্যাগ করলে পরিচালক (কলেজ ও প্রশাসন) অধ্যাপক এ বি এম রেজাউল করীমকে প্রথমে অতিরিক্ত এবং পরে চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়। তবে, তিনি গত সরকারের আমলে সুবিধাভোগী হওয়ায় অন্যান্য কর্মকর্তারা তার আদেশ মানতে দ্বিধা বোধ করছেন। তিনিও শীঘ্রই অবসরে যাবেন।
মাউশির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রায় তিন মাস ধরে মহাপরিচালকের পদ শূন্য থাকায় বদলি-পদায়ন থমকে আছে। অনেক সরকারি স্কুলেই প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য এবং দেড় শতাধিক উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার পদও খালি। সহকারি উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করলেও চলতি দায়িত্ব বা পদোন্নতি না হওয়ায় মাঠ পর্যায়ের কাজকর্মে গতি আসছে না। স্কুল-কলেজের মনিটরিং ব্যবস্থাও দুর্বল হয়ে পড়েছে। মাউশিতে এখনও অনেক আওয়ামীপন্থী কর্মকর্তা বহাল তবিয়তে থাকায় শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের মধ্যে অস্থিরতা বিরাজ করছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, মাউশি মহাপরিচালকের পদটি গ্রেড-১ (সচিব) পদমর্যাদার এবং এই পদে নিয়োগের জন্য সরকারপ্রধানের অনুমোদন প্রয়োজন। এই পদের জন্য ব্যাপক লবিং চলছে এবং রাজনৈতিক আনুকূল্য পেতে বিভিন্ন পর্যায়ে দেনদরবারও চলছে। এমনকি ছাত্রজীবনে ছাত্রদল সমর্থক রাজনীতির অভিজ্ঞতার প্রমাণও তুলে ধরা হচ্ছে।
মাউশির মহাপরিচালক পদে আলোচনায় আছেন অধ্যাপক মো. আবদুস সবুর, অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দীন আল মাহমুদ সোহেল, অধ্যাপক মো. তৌহিদ আহম্মেদ এবং অধ্যাপক ড. রুহুল কাদীর। তাদের মধ্যে কারো কারো বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ এবং কারো কারো বিরুদ্ধে পূর্বেকার রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে।
বিসিএস জেনারেল এডুকেশন অ্যাসোসিয়েশনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অধ্যাপক মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম জানান, তারা শিক্ষা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে জ্যেষ্ঠ ও যোগ্য কর্মকর্তাদের পদায়ন এবং বদলি-পদায়নের ক্ষেত্রে নীতিমালার বাস্তবায়ন চান।
পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ) এবং শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরেও (ইইডি) একই ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে। ডিআইএর পরিচালক দুর্নীতির অভিযোগে বদলি হয়েছেন এবং ইইডির প্রধান প্রকৌশলীর পদও দীর্ঘদিন ধরে শূন্য।
পাবলিক পরীক্ষা গ্রহণকারী ১১টি শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানও শীঘ্রই অবসরে যাচ্ছেন, ফলে সেখানেও নতুন নিয়োগ নিয়ে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন প্রকল্পের কেনাকাটা আটকে যাওয়ায় প্রকল্পের কাজও স্থবির হয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডে (এনসিটিবি) নতুন কর্মকর্তারা দায়িত্ব নিলেও বই ছাপা নিয়ে সংকট সৃষ্টি হয়েছে এবং ফেব্রুয়ারি-মার্চের আগে শিক্ষার্থীদের হাতে সব বই পৌঁছানো সম্ভব হবে না।
সব মিলিয়ে শিক্ষা প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে স্থবিরতা ও অস্থিরতা বিরাজ করছে, যা শিক্ষা কার্যক্রমকে ব্যাহত করছে।