রবিবার, ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ৫ মাঘ ১৪৩২

ঢাকায় লাখো মানুষের ‘মার্চ ফর গাজা’: ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি ও ইসরায়েলি আগ্রাসনের প্রতিবাদ

একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ১২ এপ্রিল ২০২৫ | ১১:৫৫ অপরাহ্ন


গাজায় চলমান ইসরায়েলি আগ্রাসন ও বর্বরোচিত হামলার প্রতিবাদে এবং ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতি সংহতি জানাতে শনিবার (১২ এপ্রিল) ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে লাখো মানুষের ঢল নামে। ‘প্যালেস্টাইন সলিডারিটি মুভমেন্ট বাংলাদেশ’ এর ব্যানারে আয়োজিত ‘মার্চ ফর গাজা’ শীর্ষক এই গণসমাবেশে অংশগ্রহণকারীরা বাংলাদেশ ও ফিলিস্তিনের পতাকা হাতে ইসরায়েলি গণহত্যার বিচার এবং ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার দাবিতে সোচ্চার হন।

বিকেল ৩টায় কর্মসূচি শুরু হওয়ার কথা থাকলেও সকাল থেকেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জনসমাগম বাড়তে থাকে। দুপুরের আগেই পুরো উদ্যান জনসমুদ্রে পরিণত হয় এবং জনস্রোত রমনা পার্কসহ আশেপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। নারী, শিশু, বৃদ্ধ সহ সমাজের সর্বস্তরের মানুষ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা ভেদাভেদ ভুলে ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’, ‘গাজা উই আর উইথ ইউ’, ‘স্টপ জেনোসাইড ইন গাজা’ ইত্যাদি স্লোগানে প্রকম্পিত করে তোলেন উদ্যান এলাকা। হাতে হাতে ছিল ফিলিস্তিনের পতাকা এবং প্রতিবাদী প্ল্যাকার্ড।

বিকেল সোয়া ৩টার দিকে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে সমাবেশের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। সমাবেশে একটি ঘোষণাপত্র পাঠ করা হয়, যেখানে জায়নবাদী ইসরায়েলের গণহত্যার বিচার আন্তর্জাতিক আদালতে নিশ্চিত করা, গণহত্যা বন্ধে কার্যকর সম্মিলিত পদক্ষেপ গ্রহণ এবং ১৯৬৭ সালের সীমানা অনুযায়ী ফিলিস্তিনি ভূমি ফিরিয়ে দিতে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি জোরালো আহ্বান জানানো হয়। ঘোষণাপত্রটি পাঠ করেন আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান।

জনপ্রিয় ইসলামিক স্কলার ড. মিজানুর রহমান আজহারী সমাবেশে অংশ নিয়ে বলেন, “জনতার এই মহাসমুদ্র ফিলিস্তিন ও আল আকসার প্রতি আমাদের ভালোবাসার প্রকাশ… আমাদের প্রত্যেকের হৃদয়ে বাস করে একটি করে ফিলিস্তিন।”

সমাবেশের এক পর্যায়ে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব আবদুল মালেক ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা ও শান্তি কামনায় বিশেষ মোনাজাত পরিচালনা করেন। এ সময় ইসরায়েলি হামলায় নিহত ও আহতদের স্মরণ করে এবং ফিলিস্তিনিদের মুক্তি কামনায় লাখো মানুষ কান্নায় ভেঙে পড়েন।

কর্মসূচি চলাকালে বিভিন্ন সামাজিক ও ছাত্র সংগঠন ইসরায়েলি পণ্য বর্জনের আহ্বান জানিয়ে লিফলেট বিতরণ করে। এছাড়া, রামপুরা বনশ্রীর একদল যুবক সমাবেশে আগত মানুষের মাঝে বিনামূল্যে প্রায় ৫ হাজার বোতল পানি বিতরণ করে।

গণসমাবেশে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন, এনসিপি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, লেবার পার্টি, গণঅধিকার পরিষদ, এবি পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। এক পর্যায়ে বিভিন্ন দলের নেতাদের মঞ্চে হাতে হাত ধরে সংহতি প্রকাশ করতে দেখা যায়।

সমাবেশে সাইমুম শিল্পীগোষ্ঠীর একদল শিশু ‘আহত ফিলিস্তিনি’ সেজে অংশ নেয়, যা উপস্থিত সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। মাথায় ব্যান্ডেজ, হাতে-পায়ে পট্টি এবং প্রতীকী কফিন বহন করে তারা গাজার শিশুদের দুর্দশার চিত্র তুলে ধরে, যা অনেককে আবেগাপ্লুত করে।

জুলাই বিপ্লবে আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন কয়েকজন হুইলচেয়ারে করে সমাবেশে যোগ দেন। মাথায় ফিলিস্তিনের পতাকা বেঁধে আসা জরিফুল ইসলাম বলেন, “গাজার মানুষের পাশে দাঁড়াতে শরীর নয়, মন লাগে।”

বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজারো শিক্ষার্থীও মিছিল সহকারে এই গণসমাবেশে যোগ দিয়ে ফিলিস্তিনিদের প্রতি তাদের সমর্থন ব্যক্ত করেন।

এছাড়াও, কয়েকজন ছাত্র একটি অভিনব প্রতিবাদী প্রদর্শনীর আয়োজন করে। এতে নেতানিয়াহু ও ট্রাম্পের মুখোশ পরা দুজন ব্যক্তিকে রক্তমাখা অবস্থায় এবং আরব নেতাদের তাদের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করতে দেখা যায়, যা ফিলিস্তিনে গণহত্যায় পশ্চিমা বিশ্বের সমর্থন এবং আরব বিশ্বের নীরবতার প্রতীকী প্রতিবাদ হিসেবে তুলে ধরা হয়।

এই বিশাল গণসমাবেশ ফিলিস্তিনের জনগণের প্রতি বাংলাদেশের মানুষের গভীর সহানুভূতি এবং ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।