সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬, ৬ মাঘ ১৪৩২

শতাধিক সাপ, অর্ধশত বন্যপ্রাণীর জীবন বাঁচিয়েছেন খাগড়াছড়ির হৃদয়

জাকির হোসেন | প্রকাশিতঃ ২ মে ২০২৫ | ১১:২৮ অপরাহ্ন


সাপ বা অচেনা বন্যপ্রাণী দেখলেই যেখানে বেশিরভাগ মানুষ ভয় পেয়ে মেরে ফেলেন, সেখানে ব্যতিক্রম খাগড়াছড়ির দীঘিনালার তরুণ হৃদয় বড়ুয়া। লোকালয়ে চলে আসা বা বিপদে পড়া সাপ ও বিভিন্ন বন্যপ্রাণী উদ্ধার করে তাদের জীবন বাঁচানো এবং নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরিয়ে দেওয়াকেই ব্রত হিসেবে নিয়েছেন তিনি।

প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় এসব প্রাণীর অবদানের কথা ভেবেই এই কাজে নেমেছেন বলে জানান হৃদয়। ২০২০ সাল থেকে তিনি নিজ উদ্যোগে এই উদ্ধারকাজ শুরু করেন। পরে ২০২১ সালে ‘স্নেক রেসকিউ টিম বাংলাদেশ’-এর সদস্য হিসেবে যুক্ত হয়ে আরও পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করছেন।

এ পর্যন্ত প্রায় ১০৫টি বিভিন্ন প্রজাতির বিষধর ও নির্বিষ সাপ এবং অর্ধশতাধিক বন্যপ্রাণী উদ্ধার করেছেন হৃদয়। এর মধ্যে রয়েছে লাল গলা ডোরা সাপ, ছোট কৃষ্ণ কালাচ, শঙ্খিনী, পদ্ম গোখরা, হেলে, ঘরগিন্নি, দুধরাজ, ইন্দো-চীন অঞ্চলের দাঁরাশ ও উদয়কাল সাপের মতো নানা প্রজাতি। প্রাণীর মধ্যে রয়েছে লজ্জাবতী বানর, বন মোরগ, ময়না, টিয়া ইত্যাদি।

হৃদয় বলেন, “সাপ দেখলেই মানুষ ভয় পায়, মেরে ফেলে। এটা আমার কাছে খারাপ লাগত। এরা নিরীহ প্রাণী। সৃষ্টিকর্তা সকল প্রাণীকেই পৃথিবীর মঙ্গলের জন্যই সৃষ্টি করেছেন। সকল প্রাণীই পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে। এই ধারণা থেকেই আমি এই চ্যালেঞ্জিং কাজটি বেছে নিই।”

তিনি আরও জানান, দেশের বেশিরভাগ সাপই নির্বিষ। তাই অকারণে সাপ না মেরে তাকে খবর দিলে তিনি উদ্ধার করে নিয়ে আসবেন।

শুরুর দিকে প্রতিবেশীরা হৃদয়ের এই কাজকে ভালোভাবে না নিলেও এখন সবাই তাকে উৎসাহ দেন। দীঘিনালা ও আশেপাশের এলাকার মানুষ এখন অনেক সচেতন; সাপ বা বন্যপ্রাণী লোকালয়ে দেখলে মেরে না ফেলে হৃদয়ের সাহায্য নেন। খবর পেলেই ছুটে যান হৃদয়। উদ্ধারের পর কোনো প্রাণী আহত থাকলে নিজ দায়িত্বে সেবা দিয়ে সুস্থ করে তোলেন। পরে খাগড়াছড়ি বন বিভাগের মেরুং ও নাড়াইছড়ি রেঞ্জ কর্মকর্তাদের সহায়তায় উদ্ধার করা প্রাণীগুলোকে জনবসতি থেকে দূরে নিরাপদ বনে অবমুক্ত করেন।

স্থানীয় বাসিন্দা মনির হোসেন বলেন, “হৃদয় চার-পাঁচ বছর ধরে বিভিন্ন বিষধর সাপ ও বন্যপ্রাণী উদ্ধার করে বনে অবমুক্ত করছে। সাপ ও বন্যপ্রাণী না থাকলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাবে। হৃদয় বিপদগ্রস্ত সাপ ও বন্যপ্রাণী উদ্ধার করে পরিবেশ রক্ষায় ভূমিকা পালন করছে। অন্যান্য তরুণদেরও হৃদয়ের মতো পরিবেশ রক্ষায় এগিয়ে আসা উচিত।”

স্নাতক শেষ করে হৃদয় বড়ুয়া এখন গ্রাফিক্স ডিজাইনার ও কম্পিউটার প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করেন। তবে সাপ ও বন্যপ্রাণী উদ্ধার তার নেশা ও ভালোবাসার জায়গা। প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষায় তার এই মানবিক উদ্যোগ স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মের কাছেও অনুপ্রেরণার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।