
জুতা পায়ে কারখানায় হাঁটাচলা, খালি গা থেকে ঝরছে ঘাম, সেই ঘাম মিশে যাচ্ছে ময়দার তালে—চট্টগ্রামের আনোয়ারার বেকারিগুলোতে এভাবেই তৈরি হচ্ছে প্রতিদিনের পাউরুটি, কেক আর বিস্কুট। এসব খাদ্যপণ্য উপজেলার দুই হাজারের বেশি দোকানে সরবরাহ করা হলেও অস্বাস্থ্যকর ও অনুমোদনহীন এই কারখানাগুলো বন্ধে প্রশাসনের ভূমিকা কেবল ‘নামমাত্র’ জরিমানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
মঙ্গলবার সরেজমিনে উপজেলার কালাবিবির দিঘি এলাকার ‘ঢাকা বেকারি’তে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে এক ভয়াবহ চিত্র। কারখানার স্যাঁতসেঁতে মেঝেতে যত্রতত্র পড়ে আছে ইঁদুর ও তেলাপোকার বিষ্ঠা। খোলা তেলভর্তি ড্রামের ওপর ভনভন করছে মাছি। এর মধ্যেই শ্রমিকরা খালি গায়ে, ঘর্মাক্ত শরীরে ময়দা মাখছেন। কেউ আবার ধূমপানরত অবস্থাতেই হাত লাগাচ্ছেন পাউরুটি প্যাকেট করার কাজে।
এই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের ছবি ও তথ্য সংগ্রহ করে ফেরার পথে ‘ঢাকা বেকারি’র মালিক বোরহান উদ্দিন সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য প্রতিবেদককে অনৈতিক প্রস্তাব দেন বলেও অভিযোগ উঠেছে, যা এই অবৈধ ব্যবসার পেছনের ঔদ্ধত্যকে সামনে নিয়ে আসে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, শুধু ঢাকা বেকারি নয়, উপজেলার বৈরাগ এলাকার ‘আর রহমান বেকারি’ ও বটতলী এলাকার ‘বিসমিল্লাহ বেকারি’সহ প্রায় ২৫টি বেকারির অধিকাংশেরই একই অবস্থা। এসব কারখানার বিএসটিআই, পরিবেশ বা ফায়ার সার্ভিসের মতো কোনো জরুরি অনুমোদন নেই, তবুও তারা অবৈধভাবে বিএসটিআইয়ের মনোগ্রাম ব্যবহার করে পণ্য বাজারজাত করছে।
এই অস্বাস্থ্যকর খাবারের পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তার উদাহরণ মিলেছে বটতলী এলাকার বাসিন্দা নার্গিস আক্তারের অভিযোগে। তিনি বলেন, “বিসমিল্লাহ বেকারি থেকে কেক কিনে খাওয়ানোর পর আমার বাচ্চা ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়। পাঁচদিন হাসপাতালে থাকার পরও সে এখনো পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠেনি।”
এই স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়ে সতর্ক করে আনোয়ারা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. মাহতাব উদ্দীন চৌধুরী বলেন, “ভেজাল ও নোংরা পরিবেশে তৈরি খাবার শিশুদের জন্য সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এর ফলে ডায়রিয়ার পাশাপাশি যে কেউ কিডনি, লিভারসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হতে পারেন।”
স্থানীয় বাসিন্দা মো. ফখরুল ইসলাম বলেন, “প্রশাসন মাঝে মাঝে অভিযান চালিয়ে সামান্য কিছু জরিমানা করে চলে যায়। এতে মালিকরা নিয়ম মানার কোনো প্রয়োজনই মনে করেন না। ফলে তাদের অবৈধ ব্যবসা বহাল তবিয়তেই চলছে।”
এসব গুরুতর অভিযোগ এবং প্রশাসনিক উদাসীনতার বিষয়ে জানতে চাইলে আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাহমিনা আকতার বিষয়টি এড়িয়ে যান।