মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারি ২০২৬, ৭ মাঘ ১৪৩২

সাবেক ভূমিমন্ত্রীর অবিশ্বাস্য অর্থপাচারের রুট উন্মোচন করল সিআইডি

সাইফুজ্জামানের বিরুদ্ধে ১২০০ কোটি টাকা পাচারের মামলা, ২২৬ ফ্ল্যাটের হদিস
একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ১১:৩৬ অপরাহ্ন

সাইফুজ্জামান চৌধুরী
ক্ষমতার অলিন্দে থেকে কীভাবে গড়ে তোলা যায় বিপুল অর্থবিত্তের পাহাড়, তার এক অবিশ্বাস্য চিত্র যেন উন্মোচিত হলো। সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে প্রায় ১২০০ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। এই বিপুল অর্থ দিয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন এক বিশাল আবাসন সাম্রাজ্য— কিনেছেন ২২৬টি ফ্ল্যাট! এই চাঞ্চল্যকর তথ্যের ভিত্তিতে তাঁর বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা দায়ের করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

চট্টগ্রামের কোতোয়ালী থানায় বৃহস্পতিবার (৪ সেপ্টেম্বর) দায়ের করা এই মামলায় শুধু সাবেক মন্ত্রী সাইফুজ্জামানই নন, আসামি করা হয়েছে তার স্ত্রী রুকমীলা জামান এবং অজ্ঞাত আরও ৫-৭ জনকে। সিআইডির দীর্ঘ অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এক শ্বাসরুদ্ধকর অর্থপাচারের কাহিনী, যা হার মানাতে পারে যেকোনো থ্রিলার সিনেমার গল্পকেও।

সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার জসীম উদ্দিন খান জানান, সাইফুজ্জামান চৌধুরী ২০১৪ থেকে পর্যায়ক্রমে ভূমি প্রতিমন্ত্রী, মন্ত্রী এবং ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যানের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। অভিযোগ উঠেছে, এই ক্ষমতার অপব্যবহার করেই তিনি ২০১৬ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে দুবাইয়ের বুর্জ খলিফা, জাবাল আলী, পাম জুমেইরাহ-এর মতো সব অভিজাত এলাকায় কিনেছেন ২২৬টি ফ্ল্যাট। এর জন্য তিনি ব্যয় করেছেন প্রায় ৩৩ কোটি ৫৬ লাখ দিরহাম। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ হাজার কোটি টাকারও বেশি।

শুধু তাই নয়, তার স্ত্রী রুকমীলা জামানের নামেও দুবাইয়ে ২২ লাখ ৫০ হাজার দিরহাম মূল্যের দুটি বিলাসবহুল সম্পত্তির সন্ধান পেয়েছে সিআইডি।

তদন্তে আরও দেখা গেছে, সাইফুজ্জামান ও তার স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নামে দুবাই ইসলামিক ব্যাংক, জনতা ব্যাংক ও ফার্স্ট আবুধাবি ব্যাংকে চারটি অ্যাকাউন্টের সন্ধান মিলেছে। এসব হিসাবে প্রায় ৩১১ কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। অর্থপাচারের এই নেটওয়ার্ক সচল রাখতে তিনি দুবাইতে ‘জেবা ট্রেডিং’ এবং ‘র‍্যাপিড র‍্যাপ্টর’ নামে দুটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানও খোলেন।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, বাংলাদেশ ব্যাংকের রেকর্ড অনুযায়ী বিদেশে এই বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ, কোম্পানি খোলা বা সম্পত্তি কেনার জন্য সরকারের কোনো অনুমতিই নেননি সাইফুজ্জামান চৌধুরী। অর্থাৎ, সম্পূর্ণ অবৈধভাবে দেশের টাকা বিদেশে পাচার করে তিনি এই বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন বলে অভিযোগ সিআইডির।

এই মামলা দায়েরের মাধ্যমে একটি বড় ধরনের আর্থিক কেলেঙ্কারির তদন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলো। সিআইডি জানিয়েছে, এই চক্রের সঙ্গে জড়িত অন্যদের শনাক্ত করতে এবং পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনতে তাদের তদন্ত ও অভিযান অব্যাহত থাকবে। দেশের একজন সাবেক মন্ত্রীর বিরুদ্ধে বড় অংকের অর্থপাচারের অভিযোগ ওঠায় রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। এখন দেখার বিষয়, তদন্তের অগ্রগতির সাথে সাথে আর কোন নতুন তথ্য বেরিয়ে আসে এবং এই ঘটনার শেষ কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়।