
একসময় মিঠাপানির মাছের ভান্ডার হিসেবে পরিচিত কক্সবাজারের মাতামুহুরী নদী এখন পলি জমে ভরাট হওয়া এবং বিষ দিয়ে মাছ মারার কারণে হুমকির মুখে পড়েছে। পাহাড়ি ঢলে নেমে আসা বালু ও মাটিতে নদীর শতাধিক মাছের অভয়াশ্রম (কুম) ভরাট হয়ে যাওয়ায় এবং বিষ প্রয়োগের কারণে ৯৫ প্রজাতির মাছের এই বিচরণক্ষেত্রটি এখন প্রায় মৎস্যশূন্য হতে চলেছে।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৭৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদীতে ৯৫ প্রজাতির মিঠাপানির সুস্বাদু মাছের অস্তিত্ব রয়েছে। ২০২২ সালে মৎস্য গবেষক ড. মোহাম্মদ আরশাদ-উল-আলমের পরিচালিত “মাতামুহুরী নদীর মৎস্যবৈচিত্র্য” শীর্ষক ওই গবেষণায় দেখা যায়, ৯৫ প্রজাতির মাছের মধ্যে ৮৯টি দেশীয় এবং ৬টি বিদেশি প্রজাতি। গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়, আইইউসিএন-এর হুমকিগ্রস্ত তালিকাভুক্ত ২৪ প্রজাতির মাছ এই নদীতে রয়েছে।
কিন্তু এই সমৃদ্ধ মৎস্যভান্ডার এখন স্থানীয়দের জন্য কেবলই স্মৃতি। চকরিয়ার কাকারা ইউনিয়নের বাসিন্দা শাহাদাত হোছাইন বলেন, “আগে নদীতে ঝাঁক ধরে প্রচুর চিংড়িসহ বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় মাছ ধরতে পারতাম। বর্তমানে সারাদিন জাল টেনেও এক কেজি মাছ পাওয়া যায় না। অনেক মাছ ইতোমধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে।”
একই অবস্থা পেশাদার জেলেদেরও। ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের জেলে সুশান্ত কুমার দাশ ও মনোজ কুমার দাশ জানান, আগে শীত মৌসুমে তারা নদীতে মাছ শিকার করে সংসার চালাতেন। কিন্তু এখন নদীতে আগের মতো মাছ না পাওয়ায় তাদের মতো পাড়ার ২০-৩০ জন জেলের জীবন-জীবিকা বন্ধ হওয়ার পথে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর পেছনে মূল কারণ দুটি—নদীর অভয়াশ্রম ভরাট হয়ে যাওয়া এবং বিষ প্রয়োগে মাছ নিধন। একসময় আলীকদম, লামা ও চকরিয়ার বিভিন্ন পয়েন্টে, যেমন—সিতার কুম, মিজ্জিরির কুম, ঘুণিয়ার কুমসহ শতাধিক গভীর স্থান বা ‘কুম’ ছিল, যা মাছের নিরাপদ প্রজনন ও বিচরণের ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করত। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে নির্বিচারে পাহাড় কাটার ফলে বর্ষায় পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে নেমে আসা পলি ও বালুতে এসব অভয়াশ্রম ভরাট হয়ে গেছে।
চকরিয়া উপজেলা পরিবেশ সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মাহমুদ বলেন, “অপরিকল্পিত উন্নয়নের জন্য পাহাড় কাটার কারণে নদীর গভীরতা কমে গেছে। আগে যেখানে শতাধিক কুম ছিল, এখন সেখানে চর ছাড়া আর কিছুই দেখা যায় না। একসময় যে নদীতে শত শত জেলে জীবিকা নির্বাহ করত, সেটি এখন মাছশূন্য।”
এর সঙ্গে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে বিষ প্রয়োগের ঘটনা। স্থানীয়রা জানান, প্রতি বছর শুষ্ক মৌসুমে রাতের আঁধারে একটি লোভী চক্র নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে বিষ ঢেলে দেয়। বিষক্রিয়ায় ভেসে ওঠা মাছ সংগ্রহ করে ভোরের আগেই তারা পালিয়ে যায়। পরে স্থানীয় শিশু-কিশোররা মশারির জাল দিয়ে অবশিষ্ট আধমরা ও মরা মাছ সংগ্রহ করে, যা স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ।
এ বিষয়ে চকরিয়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. আনোয়ারুল আমিন বলেন, “মাতামুহুরী নদীতে বিষ প্রয়োগের ঘটনা সত্য। কিন্তু দীর্ঘ এই নদীতে রাতের আঁধারে কারা, কোথায় বিষ প্রয়োগ করছে, তা শনাক্ত করা কঠিন। আমরা প্রতিবছর নদীতে মাছের পোনা অবমুক্ত করলেও বিষ প্রয়োগের কারণে তা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “এই অপতৎপরতা বন্ধে নদীর তীরবর্তী স্থানীয় বাসিন্দাদের সচেতন ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। এলাকাবাসী সজাগ থাকলে কেউ বিষ দিয়ে মাছ নিধন করতে পারবে না এবং মাতামুহুরী আবারও দেশীয় মাছে ভরে উঠবে।”