
লবণ উৎপাদনের মৌসুম শুরু হলেও কক্সবাজারের চকরিয়ার উপকূলীয় অঞ্চলের বেশিরভাগ লবণ মাঠ এখনো খালি পড়ে আছে। গত মৌসুমের প্রায় চার লাখ মেট্রিক টন লবণ অবিক্রিত অবস্থায় মাঠে মজুদ থাকার পরও সরকার আবারও বিদেশ থেকে লবণ আমদানির প্রস্তুতি নিচ্ছে—এমন খবরে স্থানীয় ৪১ হাজার লবণ চাষি উদ্বেগ ও আতঙ্কে ভুগছেন। ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার আশঙ্কায় তারা বিপুল টাকা লগ্নি করে জমি বর্গা নিয়েও চাষে নামতে পারছেন না।
কক্সবাজার বিসিকের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি বা নভেম্বরের শুরুতে লবণ চাষ শুরু হয়। কিন্তু চকরিয়ার বেশিরভাগ মাঠ এখনো চাষাবাদের বাইরে রয়ে গেছে।
কক্সবাজার লবণ চাষি ও ব্যবসায়ী সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি এবং চকরিয়া মাতামুহুরী সাংগঠনিক উপজেলা বিএনপির সভাপতি জামিল ইব্রাহিম চৌধুরী অভিযোগ করে বলেন, “গত মৌসুমের চার লাখ মেট্রিক টনের বেশি লবণ এখনো মাঠে মজুদ রয়ে গেছে। সেখানে সরকার নতুন করে দেড় লাখ মেট্রিক টন লবণ আমদানির পরিকল্পনা নিয়েছে। এতে উৎপাদন মৌসুম শুরু হলেও ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার শঙ্কায় অনেক চাষি দুশ্চিন্তায় পড়ে গেছেন।”
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) সূত্রে জানা গেছে, গত মৌসুমে দেশে ২৬ লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টনের চাহিদার বিপরীতে লবণ উৎপাদন হয়েছিল ২২ লাখ ৫১ হাজার ৬৫১ মেট্রিক টন। চাহিদা পূরণে ঘাটতি থাকলেও মৌসুম শেষ হওয়ার ছয় মাস পরও ৪ লাখ ২০৩ টন লবণ অবিক্রিত অবস্থায় মাঠেই পড়ে রয়েছে বলে চাষিরা জানিয়েছেন।
চকরিয়া, পেকুয়া, কুতুবদিয়াসহ কক্সবাজারের সাত উপজেলা এবং চট্টগ্রামের বাঁশখালী ও পটিয়ার (আংশিক) প্রায় ৭০ হাজার একর জমিতে ৪১ হাজার ৩৫৫ জন চাষি লবণ চাষের সঙ্গে জড়িত। দেশের মোট লবণের ৮৭ শতাংশই কক্সবাজারে উৎপাদিত হয়।
কুতুবদিয়া উপজেলার বাসিন্দা সাংবাদিক আবুল কাশেম সাগর জানান, কুতুবদিয়ার চাষিরা আগেভাগে লবণ চাষে নেমেছেন, তবে গত বছরের তুলনায় লাগিয়ত (ভাড়া) ও শ্রমিক মজুরি বাড়ায় তারা এমনিতেই চাপে আছেন। এর মধ্যে লবণ আমদানির খবরে চাষিদের মাঝে নতুন আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
চকরিয়া উপজেলার লবণ চাষী ও ব্যবসায়ী নেতা মাওলানা শহিদুল ইসলাম বলেন, “মৌসুমের শুরুতে ‘আমদানি’র সিদ্ধান্তের কারণে বাজারে দেশীয় লবণের দাম অনেক কমে গেছে। এখন এক মণ লবণ বিক্রি হচ্ছে ২০০ থেকে ২৪০ টাকায়, যেখানে উৎপাদন খরচ পড়েছে ৩০০ টাকার বেশি। এতে চাষীরা আবারও ক্ষতির মুখে পড়ছেন। প্রতিবছর এই অবস্থা চলতে থাকলে দেশীয় লবণ শিল্প অচিরেই বিলুপ্ত হয়ে যাবে।”
কক্সবাজার লবণ চাষি ও ব্যবসায়ী সংগ্রাম পরিষদের নেতা এবং মাতামুহুরী উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সোয়াইবুল ইসলাম সবুজ অভিযোগ করে বলেন, “শিল্প-কারখানা ও কোম্পানিগুলোকে সুবিধা দিতে মন্ত্রণালয়ের কতিপয় কর্মকর্তারা যোগসাজশ করে প্রতিবছর বিদেশ থেকে লবণ আমদানি জিইয়ে রেখেছে। এই সিন্ডিকেট চক্রের কারসাজির কারণে দেশীয় চাষিরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন।”
তবে বিসিকের উপ-মহাব্যবস্থাপক (লবণ সেল প্রধান) সরোয়ার হোসেন সাংবাদিকদের বলেছেন, বর্তমানে দেশে যে পরিমাণ লবণ মজুদ রয়েছে, তা চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত চলবে। এরপর সংকট এড়াতে দেড় লাখ টন লবণ আমদানির প্রস্তাব শিল্প মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
এদিকে, কক্সবাজার লবণ শিল্পের উন্নয়ন কার্যালয় (বিসিক) এর উপমহাব্যবস্থাপক জাফর ইকবাল ভূঁইয়া বলেন, “বাজারে লবণের দাম কম থাকায় অনেক চাষি মাঠে নামেনি একথা সত্য। তবে এবার দাম স্থিতিশীল রাখতে সরকারিভাবে লবণ কেনার সিদ্ধান্ত নিচ্ছি। তার জন্য গোডাউন করার পরিকল্পনা রয়েছে। এবার সরকারিভাবে স্থানীয় চাষীদের কাছ থেকে লবণ কিনে সেটি গোডাউনে মজুদ করা হবে।”
তিনি স্বীকার করেন, মুক্তবাজার অর্থনীতিতে দাম নির্ধারণের সুযোগ না থাকায় প্রান্তিক চাষিরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।