
কুয়ালালামপুর (মালয়েশিয়া) থেকে: কুয়ালালামপুর কনভেনশন সেন্টারের আধুনিক স্থাপত্যের ভেতরে যখন বিশ্বের অনুসন্ধানী সাংবাদিকরা মিলিত হন, তখন বাইরের ঝকঝকে শহরের ঠিক বিপরীতে ফুটে ওঠে পৃথিবীর অন্ধকারাচ্ছন্ন এক চালচিত্র।
মালয়েশিয়ায় চলমান চতুর্দশ গ্লোবাল ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম কনফারেন্সে (জিআইজেসি২৫) এবার প্রযুক্তি, সাহসিকতা এবং মানবিকতা এক সুতোয় গাঁথা পড়েছে। একদিকে গ্লোবাল সাউথ বা উন্নয়নশীল বিশ্বে প্রযুক্তির মোড়কে সাধারণ মানুষের ওপর নজরদারির ভয়াবহতা, অন্যদিকে চরম প্রতিকূলতার মুখে দাঁড়িয়ে সত্য প্রকাশের অদম্য লড়াই—এই দুইয়ের মিশেলেই চলছে এবারের সম্মেলনের তুমুল আলোচনা।
নৃতাত্ত্বিক সাংবাদিকতা: খবরের গভীরে ডুব
তাৎক্ষণিক সংবাদের ভিড়ে হারিয়ে না গিয়ে কীভাবে খবরের গভীরে যাওয়া যায়, তা নিয়ে সম্মেলনের শুরুর দিকেই, শুক্রবার (২১ নভেম্বর) বিকেলে আলোচনা হয় ‘এথনোগ্রাফিক জার্নালিজম’ বা নৃতাত্ত্বিক সাংবাদিকতা বিষয়ক সেশনে।
ডেনমার্কের সাংবাদিক অ্যান ক্রিস্টিন হারম্যান গ্রিনল্যান্ডে ডেনিশ ঔপনিবেশিকতার প্রভাব নিয়ে তার কাজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তিনি জানান, নৃতাত্ত্বিক সাংবাদিকতা হলো কোনো জনগোষ্ঠীর সঙ্গে দীর্ঘ সময় মিশে থেকে তাদের ভেতরকার গল্প তুলে আনা। এটি কেবল একটি উদ্ধৃতি বা তথ্য সংগ্রহের বিষয় নয়, বরং এটি একটি জনগোষ্ঠীর জীবনধারা, সংস্কৃতি এবং তাদের ওপর ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার প্রভাব বোঝার চেষ্টা।
কলম্বিয়ার মারিয়া পাউলা মুর্সিয়া হুয়ের্তাস তাদের নিউজরুম ‘মুটান্তে’-এর অনন্য পদ্ধতির কথা জানান। তারা কেবল সংবাদ প্রকাশ করেই দায়িত্ব শেষ করেন না, বরং শ্রোতাদের মতামত শুনে এবং বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করে একটি সমাধানের পথ খোঁজার চেষ্টা করেন।
এল সালভাদরের সাংবাদিক হুয়ান হোসে মার্তিনেজ ডি’অবুিসন মনে করেন, এই পদ্ধতিতে কাজ করতে হলে সাংবাদিকদের নির্দিষ্ট তাত্ত্বিক কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে এগোতে হয় এবং দীর্ঘ সময় ধরে তথ্য সংগ্রহ করতে হয়, যা সাংবাদিকতাকে আরও সহানুভূতিশীল ও মানবিক করে তোলে।
সোর্সের সুরক্ষা: ডিজিটাল বর্ম ও মানসিক আশ্রয়
নৃতাত্ত্বিক আলোচনার পরদিন, শনিবার (২২ নভেম্বর) দুপুরে উঠে আসে বর্তমান বৈরি পরিবেশে সাংবাদিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি। সোর্স বা হুইসেলব্লোয়ারদের সুরক্ষা দেওয়া এখন সাংবাদিকদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সম্মেলনের এই বিশেষ সেশনে গ্রানিটের প্রতিষ্ঠাতা রুনা স্যান্ডভিক এবং দ্য সিগন্যালস নেটওয়ার্কের ডেলফাইন হালগান্ড-মিশ্র ডিজিটাল ও মানসিক—উভয় ধরনের সুরক্ষার ওপর জোর দেন।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, সোর্স সুরক্ষার জন্য কেবল এনক্রিপ্টেড অ্যাপ ব্যবহার করাই যথেষ্ট নয়। সোর্সের সঙ্গে দেখা করার সময় ফোন বন্ধ রাখা, সীমান্ত পার হওয়ার সময় স্পর্শকাতর অ্যাপ মুছে ফেলা এবং সংবেদনশীল তথ্যের জন্য ‘ভেরাক্রিপ্ট’-এর মতো টুল ব্যবহার করা জরুরি।
তবে কেবল প্রযুক্তিগত সুরক্ষা নয়, সোর্সের মানসিক অবস্থার দিকেও নজর দেওয়া একজন সাংবাদিকের নৈতিক দায়িত্ব। অনেক সময় হুইসেলব্লোয়াররা মানসিকভাবে এতটাই বিপর্যস্ত থাকেন যে তাদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা দেয়। তাই তাদের সঙ্গে কথা বলার সময় সহমর্মিতা দেখানো এবং তারা মানসিকভাবে সুস্থ আছেন কি না, তা যাচাই করার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।
ভবিষ্যতে সাংবাদিকদের পরিচয় গোপন রেখে তথ্য সংগ্রহের সুবিধার্থে ‘অর্গানাইজড ক্রাইম অ্যান্ড করাপশন রিপোর্টিং প্রজেক্ট’ (ওসিসিআরপি) এবং ‘সিগন্যালস নেটওয়ার্ক’ যৌথভাবে ‘ডিজিটাল প্রেস পাস’ চালুর পরিকল্পনা করছে বলেও জানানো হয়।
উন্নয়নের নামে নজরদারির ডিজিটাল ফাঁদ
সুরক্ষা বলয় নিয়ে আলোচনার ঠিক পরেই, শনিবার বিকেলে সম্মেলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সেশনে উঠে আসে পাকিস্তান ও আফ্রিকার সাব-সাহারা অঞ্চলের দেশগুলোর উদাহরণ, যেখানে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ‘ডিজিটাল আইডি’ বা বায়োমেট্রিক প্রযুক্তির প্রসারকে সাধারণত আধুনিকায়ন হিসেবে দেখা হয়, কিন্তু এর পেছনের গল্পটা সব সময় সুখকর নয়। পাকিস্তানে একটি সিম কার্ড কিনতেও এখন ডিজিটাল আইডির প্রয়োজন হয়, যা নাগরিকদের বাধ্য করছে ব্যক্তিগত তথ্য সরকারের হাতে তুলে দিতে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের অ্যালগরিদমিক অ্যাকাউন্টেবিলিটি ল্যাবের প্রধান উপদেষ্টা হাজিরা মরিয়ম সেশনে উপস্থিত সাংবাদিকদের উদ্দেশে একটি মৌলিক প্রশ্ন ছুড়ে দেন। তিনি বলেন, আমাদের সব সময় প্রশ্ন করা উচিত যে এই প্রযুক্তি আসলে কাকে ক্ষমতায়ন করছে? এটি কি সাধারণ মানুষের উপকারে আসছে, নাকি সরকারের নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হচ্ছে?
অনুসন্ধানী সাংবাদিকরা প্রমাণ পেয়েছেন যে, দুর্নীতি কমানোর দোহাই দিয়ে সরকারগুলো ফেশিয়াল রিকগনিশন বা বায়োমেট্রিক ভোটার নিবন্ধনের মতো যে প্রযুক্তি কিনছে, তার আড়ালে চলছে তথ্য চুরি ও বড় ধরনের দুর্নীতি।
লাইটহাউস রিপোর্টসের সাংবাদিক বিট্রিজ রামালহো দা সিলভা মোজাম্বিকের একটি ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেন। সেখানে ভোটার নিবন্ধন ব্যবস্থাকে এমনভাবে কারচুপি করা হয়েছে যাতে ক্ষমতাসীন দল সুবিধা পায়। বিরোধী দলের ভোটারদের নিবন্ধন প্রক্রিয়া কঠিন করে তোলা হয়েছে, যার সঙ্গে নির্বাচনী সহিংসতার সরাসরি যোগসূত্র পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে কঙ্গোতে আইডি কার্ড তৈরির জন্য বরাদ্দকৃত কোটি কোটি ডলার ভুয়া কোম্পানির মাধ্যমে পাচার করে শপিং মল তৈরি করা হয়েছে, অথচ নব্বইয়ের দশকের পর দেশটিতে আজও কোনো জাতীয় আইডি ব্যবস্থা চালু হয়নি। উগান্ডাতেও চীনা কোম্পানির তৈরি আইডি কার্ড সিস্টেম এখন নাগরিকদের ওপর নজরদারির হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।
দারাজ মিডিয়ার হালা নুয়াদ নাসরেদিন পরামর্শ দেন, এই অস্বচ্ছ খাত নিয়ে কাজ করতে হলে সাংবাদিকদের ‘বায়োমেট্রিক আপডেট’-এর মতো ওয়েবসাইটগুলোতে নজর রাখতে হবে এবং ‘লুশা’ (Lusha) বা ‘রকেট রিচ’ (Rocket Reach)-এর মতো টুল ব্যবহার করে লিঙ্কডইনে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির সাবেক কর্মীদের খুঁজে বের করতে হবে। এ ছাড়া ‘সায়ারি’ (Sayari) বা ‘৫২ডব্লিউএমবি’ (52WMB)-এর মতো এক্সপোর্ট ডেটাবেস ব্যবহার করে এই প্রযুক্তি বাণিজ্যের গোপন তথ্য বের করা সম্ভব।
অন্ধকারের বুক চিরে আলোর ঝিলিক: গ্লোবাল শাইনিং লাইট অ্যাওয়ার্ড
টানা দুই দিনের গভীর আলোচনার পর, রোববার (২৩ নভেম্বর) সম্মেলনের এক আবেগঘন সন্ধ্যায় ঘোষণা করা হয় মর্যাদাপূর্ণ ‘গ্লোবাল শাইনিং লাইট অ্যাওয়ার্ড’। উন্নয়নশীল বা ক্রান্তিকালীন দেশগুলোতে চরম ঝুঁকি ও হুমকির মুখে থেকে করা অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের জন্য এই পুরস্কার দেওয়া হয়। এবারের আসরে ৪১০টি আবেদনের মধ্য থেকে মেক্সিকো, পেরু, মিশর এবং নাইজেরিয়ার সাহসী সাংবাদিকদের পুরস্কৃত করা হয়েছে।
বড় মিডিয়া ক্যাটাগরিতে পুরস্কার জিতেছে মেক্সিকোর ‘নতিসিয়াস তেলেমুন্দো’ এবং ‘এল ক্লিপ’-এর যৌথ অনুসন্ধান ‘কার্গো ট্রেলার্স: ট্র্যাপ ফর মাইগ্রেন্টস’। সাত মাস ধরে চলা এই অনুসন্ধানে তারা দেখিয়েছে কীভাবে পণ্যবাহী ট্রাকে করে অভিবাসী পাচার করা হচ্ছে। গত পাঁচ বছরে এভাবে ১৯ হাজার মানুষকে পরিবহন করা হয়েছে, যার মধ্যে অন্তত ১১১ জন শ্বাসরোধে বা দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। তারা প্রথমবারের মতো এই বিষয়ে একটি ডেটাবেস তৈরি করেছেন।
পেরুর ‘মঙ্গাবে লাতাম’ তাদের ‘ডেথ ফ্লাইট’ প্রতিবেদনের জন্য পুরস্কৃত হয়েছে। স্যাটেলাইট ইমেজ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তারা অ্যামাজন জঙ্গলে ৬৭টি অবৈধ নারকো-এয়ারস্ট্রিপ বা মাদক পাচারের বিমানঘাঁটি শনাক্ত করেছে, যা আদিবাসী নেতাদের হত্যার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
ছোট ও মাঝারি মিডিয়া ক্যাটাগরিতে মিশরের ‘মাসরাউই’ পুরস্কৃত হয়েছে তাদের চাঞ্চল্যকর ‘দ্য রাশিয়ান ট্র্যাপ’ প্রতিবেদনের জন্য। তারা দেখিয়েছে, কীভাবে মিথ্যা প্রলোভন দিয়ে মিশরের তরুণদের রাশিয়ার হয়ে ইউক্রেন যুদ্ধে পাঠানো হচ্ছে। সাংবাদিকরা প্রমাণ করেছেন যে, দালালরা অর্থের লোভ দেখিয়ে এবং রাশিয়ার নাগরিকত্ব দেওয়ার কথা বলে এই তরুণদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
এ ছাড়া নাইজেরিয়ার আলোচিত টিবি জশুয়া কাল্ট বা ধর্মীয় ভণ্ডামির মুখোশ উন্মোচন করার জন্য বিবিসি আফ্রিকা আই এবং ওপেন ডেমোক্রেসি বিশেষ সম্মাননা পেয়েছে। তিন বছরের অনুসন্ধানে তারা প্রমাণ করেছে, হাজার হাজার অনুসারীর ভক্তির পাত্র এই ধর্মগুরু আসলে ছিলেন একজন নির্যাতনকারী।
কুয়ালালামপুরের এই সম্মেলন আবারও প্রমাণ করল যে, প্রযুক্তি ও স্বৈরতান্ত্রিক চাপের মুখেও সত্য প্রকাশে সাংবাদিকরা অবিচল। তাদের এই লড়াইয়ে প্রয়োজন নতুন কৌশল, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং অদম্য সাহস।