
কুয়ালালামপুর (মালয়েশিয়া) থেকে ফিরে : রাশিয়ার রোস্তভ-অন-ডন শহরের এক প্রান্তে, গাড়ির গ্যারেজ আর হার্ডওয়্যার দোকানের পাশে ছোট্ট একটি ভবন। আপাতদৃষ্টিতে নিতান্তই সাধারণ। কিন্তু রাশিয়ার কাস্টমস ডেটা বা শুল্ক বিভাগের নথিপত্র ঘাঁটলে চোখ কপালে ওঠার জোগাড়। এই সাধারণ ঠিকানায় নিবন্ধিত একটি কোম্পানিই গত দুই বছরে প্রায় ৫ লাখ টন কয়লা বিদেশে রপ্তানি করেছে! নথিপত্রে লেখা ‘রাশিয়ান কয়লা’, কিন্তু অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের দাবি—এই কয়লা আসলে আসছে ইউক্রেনের দখলকৃত দোনেৎস্ক ও লুহানস্ক অঞ্চলের খনি থেকে। আর এর নেপথ্যে রয়েছেন ক্ষমতাচ্যুত ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ইানুকোভিচের ছেলে ওলেক্সান্ডার ইানুকোভিচ।
মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে অনুষ্ঠিত ১৪তম গ্লোবাল ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম কনফারেন্সে (জিআইজেসি২৫) ‘চেজিং অলিগার্কস অ্যাক্রস বর্ডারস’ বা ‘সীমানা পেরিয়ে অলিগার্কদের পিছু ধাওয়া’ শীর্ষক সেশনে উঠে আসে এমন রোমাঞ্চকর সব অনুসন্ধানের গল্প। সেশনে রাশিয়ার ‘আইস্টোরিজ’-এর মারিয়া জোলোবোভা, আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানী সাংবাদিক কনসোর্টিয়াম (আইসিআইজে)-এর জেলেনা কোসিক, ভেনেজুয়েলার ‘আরমান্দো ডট ইনফো’-এর জোসেফ পোলিসজুক এবং ইন্দোনেশিয়ার ‘নারাসি’-এর আকওয়াম ফিয়াজমি হানিফান নিজেদের অভিজ্ঞতার ঝুড়ি মেলে ধরেন।
শুরুটা হয় একটি স্প্রেডশিট দিয়ে
বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা অলিগার্ক বা প্রভাবশালী ধনকুবেরদের গোপন সম্পদের খোঁজ কীভাবে পাওয়া যায়? আইসিআইজে-এর জেলেনা কোসিক জানালেন, প্রতিটি অনুসন্ধানের শুরুটা হয় খুব সাদামাটাভাবে—একজন ব্যক্তি এবং একটি স্প্রেডশিট বা এক্সেল ফাইল দিয়ে।
তিনি বলেন, “আমরা যার বিষয়েই অনুসন্ধান করি না কেন, শুরুটা এভাবেই হওয়া উচিত।” জন্ম তারিখ, ঠিকানা, পাসপোর্ট নম্বর, নামের বিভিন্ন বানান, আত্মীয়-স্বজন, ব্যবসায়িক অংশীদার এবং অফশোর কোম্পানির নাম—সবকিছুই সেই স্প্রেডশিটে লিপিবদ্ধ করা হয়। প্রতিটি তথ্য যাচাই-বাছাই করে ফিল্টার ও ক্রস-রেফারেন্স করার মাধ্যমে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে অলিগার্কদের গোপন সাম্রাজ্যের মানচিত্র।
কোসিকের দল আইসিআইজে-এর ‘ডেটাশেয়ার’ টুল ব্যবহার করে হাজার হাজার নথিপত্র স্ক্যান করে সেগুলোকে ‘সার্চেবল’ বা অনুসন্ধানযোগ্য করে তোলে। তিনি বলেন, আদালতের নথিপত্র অনেক সময় তথ্যের ‘সোনার খনি’ হয়ে উঠতে পারে। এ ছাড়া ‘ওপেনকর্পোরেটস’, ‘ওপেনস্যাংশনস’ এবং বিভিন্ন দেশের ভূমি নিবন্ধন অফিস বা ক্যাডাস্ট্র থেকে পাওয়া তথ্য মিলিয়ে দেখা হয়।
রাশিয়ার কয়লা বাণিজ্যের গোপন সুড়ঙ্গ
আইস্টোরিজের মারিয়া জোলোবোভা দেখান, কীভাবে কাস্টমস ডেটা বা শুল্ক বিভাগের তথ্য বিশ্লেষণ করে বড় বড় দুর্নীতি ধরা যায়। তিনি রাশিয়ার কয়লা রপ্তানির ডেটা বিশ্লেষণ করার সময় খেয়াল করেন, একটি অপরিচিত কোম্পানি হঠাৎ করেই ২০২৩ সাল থেকে বড় রপ্তানিকারক হয়ে উঠেছে।
কোম্পানিটির করপোরেট রেকর্ড ঘেঁটে দেখা যায়, তারা এমন সব প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়েছে যেগুলো ইউক্রেনের দখলকৃত অঞ্চল এবং ইানুকোভিচ পরিবারের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু আসল মালিক কারা? এর উত্তর খুঁজতে মারিয়া রাশিয়ার ব্যাংক, মোবাইল অপারেটর এবং ট্যাক্সি সেবার ফাঁস হওয়া ডেটাবেস ব্যবহার করেন। তিনি দেখেন, টেলিগ্রাম বটের মাধ্যমে পাওয়া তথ্যে দেখা যাচ্ছে, নামমাত্র মালিকরা আসলে ইানুকোভিচের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির কর্মচারী।
ভেনেজুয়েলার ‘বলিবার্জ’ এবং দুধের কেলেঙ্কারি
ভেনেজুয়েলার সাংবাদিক জোসেফ পোলিসজুক শোনান ‘বলিবার্জ’ বা সরকারি আনুকূল্যে ধনী হওয়া ব্যবসায়ীদের গল্প। সাবেক প্রেসিডেন্ট হুগো চাভেজের আমল থেকে বর্তমান মাদুরো সরকার পর্যন্ত—এই ব্যবসায়ীরা কীভাবে ফুলেফেঁপে উঠেছেন, তার লোমহর্ষক বর্ণনা দেন তিনি।
পোলিসজুকের দল সরকারি খাদ্য সরবরাহকারী এক ব্যবসায়ীর ওপর অনুসন্ধান চালায়। তারা ল্যাবরেটরি টেস্টে প্রমাণ করে যে, সরকার গরিব মানুষকে যে গুঁড়ো দুধ দিচ্ছে, তার ৪১ গ্লাস দুধের পুষ্টিগুণ সাধারণ এক গ্লাস দুধের সমান! এই অনুসন্ধানের জেরে তাদের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা হয় এবং অনেক সাংবাদিক দেশ ছাড়তে বাধ্য হন।
আরেকটি অনুসন্ধানে তারা দেখান, ভেনেজুয়েলার ফার্স্ট লেডির পরিবার কীভাবে তাদের এক সাবেক সহপাঠীর নাম ব্যবহার করে পুরো একটি রাস্তার ১৪টি বাড়ি কিনে নিয়েছে। সরকারি নথিপত্র না থাকলে সাংবাদিকদের নিজেদেরই ডেটাবেস তৈরি করার পরামর্শ দেন পোলিসজুক।
ইন্দোনেশিয়া: ফুটবল ক্লাব যখন লন্ড্রি
অলিগার্করা কেবল খনি বা ব্যাংকেই টাকা খাটান না, তাদের টাকা এখন কফি শপ, রেস্তোরাঁ, এমনকি ফুটবল ক্লাবেও ঘুরছে। ইন্দোনেশিয়ার সাংবাদিক আকওয়াম ফিয়াজমি হানিফান দেখান, কীভাবে ফুটবল ক্লাবগুলো এখন কালো টাকা সাদা করার বা ‘মানি লন্ডারিং’-এর মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
তিনি দেশটির আইন মন্ত্রণালয়ের ‘এএইচইউ’ ডেটাবেস ব্যবহার করে দেখান, একটি পেশাদার ফুটবল ক্লাবের মালিকানার জটিল কাঠামোর পেছনে আসলে লুকিয়ে আছে খনিজ সম্পদ আহরণকারী শিল্পের প্রভাবশালীদের হাত। তিনি বলেন, “ফুটবল ক্লাবকে সামনে রেখে তারা আসলে নিজেদের স্বার্থের সংঘাত এবং সন্দেহজনক ব্যবসাগুলো আড়াল করে।”
ফোনের মাধ্যমে অনুসন্ধানের জন্য তিনি ‘গেটকন্টাক্ট’ এবং ‘ওসিন্ট ইন্ডাস্ট্রিজ’-এর মতো টুলের কথা উল্লেখ করেন, যা দিয়ে বোঝা যায় কার নম্বর অন্যারা কী নামে সেভ করে রেখেছে বা ওই নম্বরে কোন কোন সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট খোলা আছে।
সাংবাদিকদের জন্য পরামর্শ
আলোচকরা সবাই একমত যে, অলিগার্কদের পিছু নিতে হলে ধৈর্য এবং কৌশলের বিকল্প নেই। তাদের মূল পরামর্শগুলো হলো:
১. নিজস্ব ডেটাবেস: বাইরের টুলের ওপর নির্ভর করার আগে নিজের স্প্রেডশিটে তথ্য গুছিয়ে নিন।
২. উভয় উৎসের ব্যবহার: বৈশ্বিক (যেমন: অফশোর লিকস) এবং স্থানীয় (যেমন: ভূমি অফিস) উভয় ধরনের নথিপত্র ব্যবহার করুন।
৩. নিজের সম্পদ তৈরি: সরকার তথ্য না দিলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা তথ্য জোড়া দিয়ে নিজস্ব ডেটাবেস তৈরি করুন।
৪. সতর্কতা ও সহযোগিতা: ফাঁস হওয়া তথ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে আইনি ঝুঁকির কথা মাথায় রাখুন এবং প্রয়োজনে অন্য দেশের সাংবাদিকদের সহায়তা নিন।
কুয়ালালামপুরের এই সেশনটি প্রমাণ করল, দুর্নীতিবাজরা যত চতুরই হোক না কেন, স্প্রেডশিট আর অদম্য সাহসের জোরে সাংবাদিকরা তাদের গোপন দুনিয়ার হদিস ঠিকই বের করে ফেলেন।