শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

শেখ হাসিনার লকারের ৮৩২ ভরি স্বর্ণ নিয়ে দুদকের ব্যাখ্যা, মালিকানায় বোন ও মেয়ে

একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ২৭ নভেম্বর ২০২৫ | ৯:৫১ পূর্বাহ্ন


ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নামে থাকা ব্যাংক লকার থেকে উদ্ধার হওয়া বিপুল পরিমাণ স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে নতুন তথ্য দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সংস্থাটি দাবি করেছে, অগ্রণী ব্যাংকের লকারে পাওয়া ৮৩২ দশমিক ৫১ ভরি স্বর্ণালঙ্কারের পুরোটাই শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত নয়। এর একটি অংশের মালিকানায় রয়েছেন তার বোন শেখ রেহানা এবং কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুল।

দুদকের মহাপরিচালক মো. আখতার হোসেন বুধবার সাংবাদিকদের জানান, লকার নম্বর ৭৫১-এ পাওয়া গেছে ৪২২ দশমিক ২৬ ভরি সোনা। এই লকারটি শেখ হাসিনা এবং তার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের যৌথ নামে নিবন্ধিত। অন্যদিকে লকার নম্বর ৭৫৩-এ পাওয়া গেছে ৪১০ দশমিক ২৫ ভরি স্বর্ণালঙ্কার, যা শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহানার যৌথ নামে খোলা ছিল।

তবে উদ্ধার হওয়া এই স্বর্ণের পরিমাণের সঙ্গে শেখ হাসিনার ঘোষিত সম্পদের বড় ব্যবধান পাওয়া গেছে। ২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে দাখিল করা হলফনামায় শেখ হাসিনা নিজের নামে মাত্র ১৩ দশমিক ২৫ লাখ টাকার স্বর্ণালঙ্কার ঘোষণা করেছিলেন। অথচ লকার থেকে উদ্ধার হওয়া স্বর্ণের বাজারমূল্য এর চেয়ে বহুগুণ বেশি।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, ২০০৭ সালের সম্পদ বিবরণীতে শেখ হাসিনা তিনটি লকারের কথা উল্লেখ করেছিলেন। এর মধ্যে দুটি অগ্রণী ব্যাংকে এবং একটি পূবালী ব্যাংকে। সম্প্রতি পূবালী ব্যাংকের লকারটি খুলে সেখানে শুধু একটি খালি পাটের বস্তা পাওয়া গেছে।

ঘোষিত সম্পদের সঙ্গে বাস্তব উদ্ধারের এই বিপুল অমিল নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। যৌথ মালিকানার লকারে ব্যক্তিগত সম্পদ কীভাবে এবং কত বছর ধরে মজুদ ছিল এবং এসব সম্পদের প্রকৃত উৎস কী—তা নিয়ে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে।

মালিকানা নির্ধারণের বিষয়ে দুদকের মহাপরিচালক জানান, উদ্ধার করা স্বর্ণালঙ্কারের অনেকগুলোতে নির্দিষ্ট চিহ্ন বা মার্কিং রয়েছে, যা মালিকানা নির্দেশ করে। কিছু অলঙ্কার শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত, আবার কিছু তার মেয়ে এবং বোনের নামে চিহ্নিত। ফরেনসিক যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রকৃত মালিক নির্ধারণ, সম্পদ ঘোষণার সঙ্গে মিল পরীক্ষা এবং কর ও আয়কর সংক্রান্ত নথি পর্যালোচনা করে প্রতিটি সামগ্রী আলাদাভাবে যাচাই করা হবে।

এদিকে অলঙ্কারের গায়ে থাকা তথাকথিত চিহ্ন বা মার্কিং সিস্টেম তদন্তকে আরও জটিল করে তুলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, এই চিহ্নগুলো কখন বসানো হয়েছে এবং ব্যাংক কর্তৃপক্ষ কোন নথির ভিত্তিতে যৌথ মালিকানা অনুমোদন করেছে, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। এছাড়া এত বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ কর, সম্পদ বিবরণী ও মানিলন্ডারিং নীতিমালার আওতায় সঠিকভাবে রিপোর্ট করা হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা।

অর্থনীতি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই ঘটনা কেবল রাজনৈতিক সম্পদের বিষয় নয়, বরং ব্যাংকিং ব্যবস্থার তদারকি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। কেওয়াইসি, লকার মনিটরিং এবং উচ্চমূল্যের সম্পদ সংরক্ষণের স্বচ্ছতায় ঘাটতি ছিল বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, এত বড় সম্পদ বছরের পর বছর নজরদারির বাইরে থাকা অস্বাভাবিক এবং এটি ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দুর্বলতা নির্দেশ করে।

বিরোধী মতের বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ঘটনা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ক্ষমতার অপব্যবহার করে কীভাবে রাজনৈতিক পরিবারের সম্পদ গোপন রাখা হয়েছে। সম্পদ ঘোষণার ব্যবস্থায় থাকা ফাঁকফোকর এবং রাজনৈতিক পদে থাকা ব্যক্তিদের বিশেষ সুবিধাভোগী আর্থিক কাঠামোর বিষয়টিও এখন সামনে এসেছে।