রবিবার, ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ৫ মাঘ ১৪৩২

বোর্ডের নির্দেশে যোগ দিতে গিয়ে স্কুল থেকে বিতাড়িত প্রধান শিক্ষক, ভিডিও ভাইরাল

একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ১৮ জানুয়ারী ২০২৬ | ১০:৩৭ অপরাহ্ন


শিক্ষা বোর্ডের নির্দেশনার চিঠি নিয়ে দীর্ঘ বিরতির পর কর্মস্থলে যোগ দিতে গিয়ে চরম হেনস্তার শিকার হয়েছেন চট্টগ্রাম নগরের টাইগারপাস বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মোজাম্মেল হক। রবিবার (১৮ জানুয়ারি) দুপুরে বিদ্যালয়ে প্রবেশ করতে গেলে তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে বের করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।

এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এতে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের একটি কক্ষে পরিচালনা কমিটির সভাপতি হারুন অর রশিদ ও প্রধান শিক্ষক মো. মোজাম্মেল হকের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হচ্ছে। একপর্যায়ে পেছন থেকে কয়েকজন ব্যক্তি এসে মোজাম্মেল হককে ধাক্কা দিতে থাকেন এবং হট্টগোলের মধ্যে তাকে জোরপূর্বক বিদ্যালয়ের বাইরে বের করে দেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মো. মোজাম্মেল হক ২০১১ সাল থেকে ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তার স্ত্রী আমেনা বেগমও একই বিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষক ছিলেন। ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় তারা পদত্যাগ করেন।

বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের দাবি, তারা স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছিলেন। তবে মো. মোজাম্মেল হকের দাবি, তাকে জোর করে পদত্যাগ করানো হয়েছিল। পরবর্তীতে তিনি শিক্ষা বোর্ডের আপিল ও আরবিট্রেশন কমিটিতে আবেদন করেন। সেই আবেদনের প্রেক্ষিতে পুনরায় যোগদানের চিঠি নিয়ে রবিবার তিনি স্কুলে গেলে এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে।

হেনস্তার শিকার প্রধান শিক্ষক মো. মোজাম্মেল হক বলেন, যারা আমাকে হেনস্তা করেছে তাদের সন্তানরা একসময় এই বিদ্যালয়ে পড়ত। ৫ আগস্টের পর যারা ‘মব’ করেছিল, তারাই আজকের ঘটনার সময় উপস্থিত ছিল। আমি বোর্ডের চিঠি পেয়ে সেখানে গিয়েছিলাম। তারা আমাকে যোগদান করতে দেবে না, এটা আমি জানতাম। তবে শারীরিক লাঞ্ছনার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। আমার সঙ্গে বহিরাগত কেউ ছিল না, যারা ছিলেন তারা অভিভাবক। আমি বিষয়টি বোর্ডকে জানাব এবং নিজের নিরাপত্তার জন্য থানায় সাধারণ ডায়েরি করব।

অন্যদিকে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছেন বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সদস্যরা। কমিটির সভাপতি হারুন অর রশিদ বলেন, ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট মোজাম্মেল হক ও তার স্ত্রী স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন। তার বিরুদ্ধে তদন্ত করে আর্থিক দুর্নীতির সত্যতা পাওয়া গেছে। অডিট রিপোর্টে দেখা গেছে, তিনি প্রায় এক কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন।

হারুন অর রশিদ আরও অভিযোগ করেন, মোজাম্মেল হক তার স্ত্রীর নামে বিদ্যালয়ের জায়গায় মাছ চাষের কথা বলে জমি দখল করেছেন এবং অস্তিত্বহীন এক নারীর নামে শিক্ষকদের আবাসন বরাদ্দ দিয়েছেন। এছাড়া এসএসসি পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রশংসাপত্র বাবদ টাকা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তদন্ত ও অডিট রিপোর্ট থাকার পরও মন্ত্রণালয় বা বোর্ড ব্যবস্থা না নেওয়ায় শিক্ষার্থীরা আজ প্রতিবাদ করেছে।

শিক্ষা বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, মোজাম্মেল হকের বিরুদ্ধে আনীত ২৩টি অভিযোগের তদন্ত করেছিলেন জেলা প্রশাসনের তৎকালীন জ্যেষ্ঠ সহকারী কমিশনার রাকিবুল ইসলাম। ২০২৫ সালের ২৩ এপ্রিল জমা দেওয়া সেই প্রতিবেদনে অভিযোগগুলোর প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া যায় এবং বিস্তারিত তদন্তের জন্য আর্থিক অডিটের সুপারিশ করা হয়।

এত অভিযোগ থাকার পরও কেন তাকে পুনর্বহালের নির্দেশ দেওয়া হলো—এমন প্রশ্নের জবাবে চট্টগ্রাম মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের সচিব এ কে এম সামছু উদ্দিন আজাদ বলেন, আপিল ও আরবিট্রেশন কমিটির ৪৯তম সভায় মো. মোজাম্মেল হক ও তার স্ত্রীর পক্ষে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্ট মাসের পরিপত্র অনুযায়ী, কোনো শিক্ষক বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় কার্যক্রম ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হয়। তা না হলে ১৮০ দিন পর তারা স্বপদে পুনর্বহাল হন এবং বেতন-ভাতা প্রাপ্য হন। এই আইনি বাধ্যবাধকতার আলোকেই তাদের যোগদানের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এটি আদালতের রায়ের মতো, এই সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করতে হলে হাইকোর্টে যেতে হবে। তিনি যোগ দিতে গিয়ে বাধার মুখে পড়েছেন বলে আমরা শুনেছি।