
স্বামী প্রবাসে থাকেন। তাঁর কষ্টে অর্জিত টাকায় কেনা গহনা নিজের কাছে রাখা নিরাপদ মনে করেননি সোনিয়া আক্তার। তাই স্বামীর অগোচরেই সেই গহনা রেখেছিলেন বাবার জরাজীর্ণ ঘরে। সোনিয়া ভেবেছিলেন, এমন জরাজীর্ণ ঘরে স্বর্ণালঙ্কার থাকতে পারে, তা চোর ভাববে না। কিন্তু সেই বিশ্বাসই কাল হলো। চুরি হলো সব গহনা।
ঘটনার পর স্বামীর সন্দেহের তীরে বিদ্ধ হলেন সোনিয়া—প্রশ্ন উঠল পরকীয়া নাকি অসুস্থ বাবাকে বাঁচাতে গহনা বিক্রি করে নাটক সাজানো হয়েছে? অবশেষে মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সেই চুরির রহস্য উদঘাটন করে সোনিয়ার কান্নার অবসান ঘটাল পুলিশ। উদ্ধার করা হলো চুরি যাওয়া স্বর্ণালংকার, নগদ টাকা ও মুঠোফোন।
গত বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) দিবাগত রাতে আনোয়ারা উপজেলার চাতরী ইউনিয়নের ডুমুরিয়া গ্রামের আলী হোসেনের বাড়িতে এই দুর্ধর্ষ চুরির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে মো. তৌফিকুল ইসলাম ওরফে হৃদয় (২২) নামের এক যুবককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
গ্রেপ্তার তৌফিকুল বাঁশখালী উপজেলার খানখানাবাদ ইউনিয়নের প্রেমাশিয়া গ্রামের মৃত নুরুল আমিনের ছেলে, তবে তিনি ভাসমান জীবনযাপন করতেন এবং পেশাদার চোর ও ছিনতাইকারী হিসেবে পরিচিত।
পুলিশ ও ভুক্তভোগী পরিবার সূত্রে জানা যায়, সোনিয়া আক্তার (২৭) পাঁচ বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে সেজো। তাঁর বড় বোনের বিয়ে হলেও স্বামীর সংসার করা হয়ে ওঠেনি, তিনি বাবার বাড়িতেই থাকেন। মেঝো বোন স্বামীর বাড়িতে কষ্টে দিনাতিপাত করছেন এবং ছোট ভাইবোনেরা পড়াশোনা করছেন।
সোনিয়ার স্বামী বিয়ের সময় তাঁকে এক ভরি আট আনা ওজনের নেকলেস, আট আনা ওজনের চেইন ও ১১ আনা ওজনের দুই জোড়া কানের দুল দিয়েছিলেন। দেশের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে এবং বাবার বাড়ি জরাজীর্ণ হওয়ায় কেউ সন্দেহ করবে না ভেবে সোনিয়া স্বামীর অগোচরে গহনাগুলো বাবার আলমারিতে রেখেছিলেন।
গত ১৪ জানুয়ারি দিবাগত রাত ২টা থেকে সাড়ে ৩টার মধ্যে চোরেরা ঘরের স্টিলের আলমারি ভেঙে সব তছনছ করে দেয়। চোরেরা নিয়ে যায় সোনিয়ার স্বামীর দেওয়া সব স্বর্ণালংকার, নগদ ১২ হাজার টাকা এবং একটি ভিভো স্মার্টফোন। চুরির বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর প্রবাস থেকে স্বামী সন্দেহ প্রকাশ করেন। তিনি সোনিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন এবং মানসিকভাবে চাপ দিতে থাকেন। এদিকে সোনিয়ার বাবা আলী হোসেন মৃত্যুশয্যায়। অসুস্থ বাবাকে নিয়েই থানায় হাজির হন সোনিয়া। বাদী হন মৃত্যুপথযাত্রী বাবা আলী হোসেন।
মামলা দায়েরের পর আনোয়ারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জুনায়েত চৌধুরীর নির্দেশে তদন্তে নামেন উপ-পরিদর্শক (এসআই) শিমুল চন্দ্র দাস। তিনি জানান, মামলাটি ছিল সম্পূর্ণ ক্লুলেস। তবে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা এবং গোপন সংবাদের ভিত্তিতে মাত্র ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে তদন্তকারী দল রহস্য উদঘাটন করতে সক্ষম হয়। শনিবার (১৭ জানুয়ারি) রাতে উপজেলার বৈরাগ ইউনিয়নের মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে তৌফিকুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়।
অভিযানে তৌফিকুলের কাছ থেকে এক ভরি ওজনের নেকলেস, একটি আট আনা ওজনের চেইন, দুই জোড়া কানের দুল, নগদ সাড়ে সাত হাজার টাকা ও চুরি হওয়া স্মার্টফোনটি উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকৃত মালামালের আনুমানিক মূল্য প্রায় সাড়ে ৫ লাখ টাকা।
আনোয়ারা থানার ওসি জুনায়েত চৌধুরী জানান, চুরির অভিযোগ পাওয়ার পরপরই পুলিশ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত শুরু করে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে মালামাল উদ্ধার এবং আসামিকে গ্রেপ্তারের মাধ্যমে ভুক্তভোগী পরিবারের স্বস্তি ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়েছে।
গ্রেপ্তার তৌফিকুল ইসলামকে মাদকাসক্ত ও পেশাদার অপরাধী হিসেবে উল্লেখ করে তিনি জানান, তাকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। এই উদ্ধারের মধ্য দিয়ে কেবল মালামালই ফেরত আসেনি, বরং স্বামীর সংসারে সন্দেহের মুখে পড়া এক গৃহবধূর সম্মানও রক্ষা পেল।