সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

পেন্সিলের দাগে আটকে আড়াই বছর, বিচার চাইতে গিয়ে উল্টো ধমক খেলেন চিকিৎসক!

আদালতে জিতেও হারলেন ডা. ওবায়দুল- ‘নলেজে নেই’ এসিল্যান্ডের, নীরব অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক
জিন্নাত আয়ুব | প্রকাশিতঃ ১১ জুন ২০২৬ | ১:১৩ অপরাহ্ন


একটি পেন্সিলের দাগ। কোনো নম্বর নেই, কোনো নথি নেই, কোনো শুনানি নেই। অথচ এই অদৃশ্য দাগটুকুই যথেষ্ট- একজন মানুষের কেনা জমি আটকে রাখতে, তাঁকে আড়াই বছর ধরে দপ্তরের বারান্দায় ঘোরাতে এবং ন্যায়বিচার চাইতে গেলে উল্টো ধমক দিতে।

চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলা ভূমি অফিসে এই ‘পেন্সিল কারসাজি’র শিকার হয়েছেন একজন চিকিৎসক- ডা. ওবায়দুল হক। আদালতে মামলা জিতেছেন, কিন্তু জমির নামজারি হয়নি। দরখাস্ত দিতে গেছেন, নেওয়া হয়নি। শুনানির আবেদন করেছেন, পাল্টা ধমক খেয়েছেন। ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে এই গোলকধাঁধায় ঘুরপাক খাচ্ছেন তিনি।

আদালতে জিতলেন, তবু হারলেন

গল্পের শুরু জমির সীমানাপ্রাচীর নির্মাণকে কেন্দ্র করে। ডা. ওবায়দুল হক তাঁর নিজের কেনা জমিতে প্রাচীর তুলতে গেলে ছালেহা বেগম নামের এক নারী আদালতে নিষেধাজ্ঞার আবেদন করে মামলা দায়ের করেন। দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে মিস মামলা নং ৪৪/২০২৪-এ অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের রায় আসে ডা. ওবায়দুলের পক্ষে।

স্বাভাবিক নিয়মে এখানেই শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শেষ হলো না। বরং শুরু হলো নতুন এক প্রহসন।

আদালতের রায়ের পরও ছালেহা বেগম সরাসরি আনোয়ারা ভূমি অফিসে গিয়ে আরেকটি মিস মামলার আবেদন জমা দেন। ডা. ওবায়দুলের অভিযোগ, ভূমি অফিস সেই আবেদনের ওপর শুধু একটি পেন্সিল সংকেত দিয়ে ৪৪৩৯ খসড়া খতিয়ানের নামজারি আবেদন নং ৪০৭৭-এর ফাইলটি আটকে রেখেছে। আদালতের রায় ও মিস মামলার অনুলিপি যথাযথভাবে জমা দেওয়া সত্ত্বেও সেসব নথি সম্পূর্ণ এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।

নিয়ম আছে, মানার লোক নেই

ভূমি আইন স্পষ্ট। কোনো মিস মামলা রুজু হলে তার একটি সুনির্দিষ্ট নম্বর থাকতে হবে এবং দুই পক্ষকে ডেকে শুনানির মাধ্যমে দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে। বাদী উপস্থিত না থাকলে একতরফা শুনানি বা আবেদন খারিজের বিধানও রয়েছে।

কিন্তু আনোয়ারা ভূমি অফিসে এসব নিয়মের কোনোটিই মানা হয়নি বলছেন ভুক্তভোগী ডা. ওবায়দুল হক। তাঁর ভাষ্যমতে, কথিত নতুন আবেদনের কোনো নম্বর দেওয়া হয়নি। আড়াই বছরেও শুনানি হয়নি, আবেদন খারিজও হয়নি। ফাইলটি শুধু পেন্সিলের এক রহস্যময় দাগ নিয়ে পড়ে আছে।

দরখাস্ত নিতেও অস্বীকার, শুনানির আবেদনে ধমক

পরিস্থিতি সামাল দিতে ডা. ওবায়দুল হক সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর লিখিত দরখাস্ত জমা দিতে গেলে ভূমি অফিস সেই আবেদন গ্রহণ করতেও অস্বীকার করে।

ডা. ওবায়দুলের অভিযোগ, শুনানির আবেদন করলে কর্মকর্তারা ধমকের সুরে জানিয়ে দেন যে তাঁর কথায় কোনো শুনানি হবে না। তাঁর ভাষ্যমতে, আনোয়ারার সহকারী কমিশনার (ভূমি) দীপক ত্রিপুরা দায়সারাভাবে বলেন, বাদী ছালেহা বেগম মামলা করে আর আসেন না, তাই শুনানি করা সম্ভব হচ্ছে না। এই একটি বাক্য দিয়েই আড়াই বছর ধরে ঘোরানো হচ্ছে তাঁকে।

অথচ আইনে স্পষ্ট বলা আছে, বাদী না এলে একতরফা শুনানি বা আবেদন খারিজের ক্ষমতা অফিসের হাতেই রয়েছে। সেই ক্ষমতা প্রয়োগ না করে বছরের পর বছর নিষ্ক্রিয় বসে থাকা- এটি কার স্বার্থে, সেই প্রশ্ন এখন সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। ডা. ওবায়দুলের দাবি, এসিল্যান্ড আইনি সমাধানের বদলে আপস করে নেওয়ার ইঙ্গিতও দিয়েছেন।

দখলের অভিযোগও আছে

ডা. ওবায়দুল হকের অভিযোগ, প্রতিপক্ষ ছালেহা বেগম ও তাঁর লোকজন নিজেদের ন্যায্য হিস্যার চেয়ে বেশি জায়গা আগে থেকেই দখল করে রেখেছেন। সেই বাড়তি দখল নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্য নেই, কিন্তু একটি নির্দিষ্ট দাগ নিয়ে হয়রানিমূলক আবেদন দিয়ে তাঁর জমি আটকে রাখা হয়েছে।

চরম হতাশার মধ্যেও তিনি জানান, এসিল্যান্ড বরাবর দেওয়া দরখাস্তের কপি ভবিষ্যতের প্রমাণ হিসেবে সযত্নে সংরক্ষণ করবেন।

এসিল্যান্ড নীরব, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক নীরব

এই প্রতিবেদন তৈরির সময় একুশে পত্রিকার পক্ষ থেকে সহকারী কমিশনার (ভূমি) দীপক ত্রিপুরার কাছে তিনটি সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন পাঠানো হয়- আদালতের রায় ও বৈধ নামজারি আবেদন থাকার পরও কোনো নম্বর ছাড়া কথিত আবেদনের অজুহাতে ফাইল আড়াই বছর আটকে রাখার আইনি ভিত্তি কী; বাদী না আসার অজুহাতে প্রক্রিয়া ঝুলিয়ে রাখা সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালার লঙ্ঘন কিনা; এবং এই ‘পেন্সিল কারসাজি’র সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গতকাল ও আজ — দুই দিনে ফোন এবং হোয়াটসঅ্যাপে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি তাৎক্ষণিকভাবে কোনো জবাব দেননি।

বিষয়টি চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সাখাওয়াত জামিল সৈকতকেও হোয়াটসঅ্যাপে অবগত করা হয়। তিনি বার্তাটি দেখে কেবল নীরব থেকেছেন- কোনো মন্তব্য করেননি।

তবে শেষ মুহূর্তে সাড়া দিলেন এসিল্যান্ড

প্রতিবেদন প্রকাশের আগ মুহূর্তে সহকারী কমিশনার (ভূমি) দীপক ত্রিপুরা হোয়াটসঅ্যাপে ফোন করে বলেন, ‘বিষয়টি আমার নলেজে (জানা) নেই। ডা. ওবায়দুল হককে নিয়ে আপনি (প্রতিবেদক) আগামী রবিবার আমার অফিসে আসুন।’

আড়াই বছর নীরব থাকার পর প্রতিবেদকের প্রশ্নের মুখে এই সাড়া কতটা কার্যকর হবে- সেটাই এখন দেখার বিষয়।

একুশে পত্রিকার আগের প্রতিবেদন, পরিবর্তন শূন্য

আনোয়ারা ভূমি অফিসের এই পেন্সিল কারসাজি নিয়ে একুশে পত্রিকায় আগেও একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। তবু পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। কর্তৃপক্ষের দীর্ঘ নীরবতার কারণে সচেতন মহলে এখন একটাই প্রশ্ন: কার ইশারায়, কার স্বার্থে সাধারণ মানুষকে এভাবে দিনের পর দিন জিম্মি করে রাখা হচ্ছে এবং এই জবাবদিহিহীন দপ্তরকে জবাবদিহির আওতায় আনবেন কে?

## আনোয়ারা ভূমি অফিসের পেন্সিল-কারসাজি: কে লিখল, কার স্বার্থে?

## আনোয়ারা ভূমি অফিসে পেন্সিল-জাদু, এডিসিকেও তোয়াক্কা করেন না অপারেটর

## পেন্সিলের বিরুদ্ধে কলম: একটি প্রতিবেদন যেভাবে নাড়িয়ে দিল প্রশাসনকে